বেহালাতে সেই ৮৭/৮৮ নাগাদ একবার মানুষ দেখেছিল জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব জিন্দাবাদ লেখার বদলে “জনগনত্রান্তিক” বিপ্লব জিন্দাবাদ কথাটা লেখা হয়েছিল, সেই ঠাকুরপুকুর থেকে তারাতলা পর্যন্ত বানানে একই ভুল। পরে ঠিকও করা হয়, জানা গিয়েছিল, যিনি লিখছেন তাঁকে যে লেখা দেওয়া হয়েছিল, তাতেই ভুল ছিল, আর তাই সেই ভুল ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। হ্যাঁ বামেদের বিশেষ করে সিপিএম এর মত এক রেজিমেন্টেড দলের একটা মনোলিথিক গঠন আছে, কেরালা তিরুবনন্তপুরমের থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে মফস্বলের এক সিপিএম নেতা যা বলবেন, বাংলার বনগাঁ সীমান্তের এক সিপিএম নেতা তাই বলবেন, রাজস্থানে ঝুনুঝুনু শহরে এক এবং এক মাত্র সিপিএম নেতা যা বলবেন উত্তরপ্রদেশে বেনারসে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের উল্টোদিকের দলের দপ্তরে বসে থাকা এক নেতা হুবহু তাই বলবেন। দলের মধ্যে আকচা আকচি হাজার থাকলেও, ওপরে বয়ান একই থাকতো। একেবারে প্রকাশ্যে বয়ানের দুটো ধারা এলো জ্যোতি বসুর ঐতিহাসিক ভুল বলার পর থেকে। সেটাও অবশ্য দলের পলিটিক্যাল লাইন ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু মমতার ব্যাপারে সিপিএম এর বয়ান সেই কবে থেকেই এক্কেবারে একই জায়গাতেই ছিল, নাটুকে, ড্রামাবাজ, স্টান্টবাজি, লোকদেখানো, ভড়ং ইত্যাদি বিশেষণগুলো বরাদ্দ থাকতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) জন্যই, ওপর থেকে নীচে, মানে যে কজন নেতা কর্মী আছেন এখনও দলে তাঁদের এ নিয়ে কোনও দ্বিমত ছিল না, বাংলার মধ্যেও না, বাংলার বাইরেও না। হ্যাঁ ওই বেনারসে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের উল্টোদিকে সিপিএম অফিসে বসেই কথা বলতে গিয়ে শুনেছি, উও তো নওটঙ্কি করতিঁ হ্যাঁয়। কিন্তু সেই মমতার প্রশংসা শুনলাম সিপিএম পলিটব্যুরো নেতার মুখে, সেটাই বিষয় আজকে, সিপিএম পলিটব্যুরো সদস্যও বলছেন মমতা লড়ছেন এসআইআর এর বিরুদ্ধে।
সিপিএম এর কাছে মমতা ছিল এক পোটেনশিয়াল থ্রেট, এক জলজ্যান্ত বিপদ আর তাঁরা সেটা বুঝতেও পেরেছিলেন, সোমেন মিত্র, সুব্রত মুখার্জি, প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি বা প্রণব মুখার্জিরা সিপিএম এর কাছে বিপদ নয়, এনাদের সঙ্গে দলের বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ ছিল, হ্যান্ডশেক, গলাগলিও ছিল, কিন্তু মমতার সঙ্গে এই বোঝাপড়া একদিনের জন্যও হয় নি। আর্ক রাইভ্যাল যাকে বলে তাই। আর সিপিএম এর তীব্র বিরোধিতা মমতাকে এক এবং একমাত্র বিরোধী দলনেত্রী হিসবেও তৈরি করেছে, সেদিন সিপিএম সেই আক্রমণ সোমেন মিত্র বা সুব্রত মুখার্জিকে করলে মমতার এই ইমেজ গড়ে উঠতো না। অবশ্য বিরোধিতা না করেই বা কী উপায় ছিল, প্রত্যেক ইস্যুতে মমতা মাঠে, রাস্তায়, বন্ধ, বিক্ষোভ, অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে হাতাহাতি, রাইটার্সে ধর্ণা থেকে রেড রোডের সমাবেশ, সামনে মমতা। এবং শেষমেষ সেই মমতার হাতেই সিপিএম এর রাজ্যপাট চলে যাওয়া, কেবল তাই নয় আজ এমন এক অবস্থায় পৌঁছানো যেখান থেকে দাঁড়িয়ে এবারে আমরা ক্ষমতায় আসবো বললে রামগরুড়ের ছানাও ফিক করে হেসে ফেলছে, আগে শূন্যের গেরো তো কাতাও, তারপরে ওসব ভেবো। আর এরকম এক অসম্ভব হিউমিলিয়েশন, রাজ্যপাট হারানর যন্ত্রণা, ইঁট চুন সুরকির দখলদারি থেকে উচ্ছেদ, এক সর্বব্যপি সিপিএমকে এখন ৭/৮ টা লোকাল কমিটির লোক এনে, জেলা কমিটির নেতাদের সামনে রেখে নিজেদের একটা পার্টি অফিস বাঁচানোর জন্য মিছিল, সমাবেশ করতে হচ্ছে, সব মমতার জন্য, এই বটমলাইন কর্মীদের মাথায়, কাজেই এই মূহুর্তে বিপ্লব এসে কড়া নাড়লেও তাঁরা বলবেন আগে মমতাকে শেষ করে তারপর বিপ্লবের কথা ভাববো। তো সে হেন সিপিএম মমতার সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জানিয়েছিলেন এটা নাটক, সব ড্রামাবাজী, তো সিপিএম এর সঙ্গে আছেন কিন্তু নেই, সিপি আই এম এল সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, সিপিএম সবেতে নাটক দেখে আমরা মনে করি উনি ওনার কাজটাই করেছেন, ঠিক কাজ। তো এই নকশালেরা নাকি একটু মমতার দিকে ঝুঁকেই থাকে, এতাও সিপিএম এর বয়ান। সেই আসরে এবারে সিপিএম এর পলিটব্যুরো নেতা, হ্যাঁ ক্ষমতা হারিয়ে এক্কেবারে শূণ্য হয়ে যাননি, খানিকটা হলেও দান ধরে রেখেছেন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার, তিনি কিন্তু এক কথায় প্রশংসা করলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের, সমর্থনও করলেন। সিপিএম এর এক পলিটব্যুরো সদস্য কমরেড সেলিম বললেন, নাটক, আরেকজন কমরেড মানিক সরকার বললেন এস আই আর এর বিরুদ্ধে এক সঠিক পদক্ষেপ। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেষ করেছিলাম যে সিপিএম এর রাজ্য সম্পাদিক সেলিম সাহেব মমতার সুপ্রিম কোর্টে সোয়াল কে নাটক বললেন আর ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিপিএম নেতা মানিক সরকার মানুষের জন্য লড়াই বললেন। আপনাদের কী মনে হয়? মমতা নাটক করছেন না মানুষের জন্য লড়াই? শুনুন মানুষজন কী বলছেন।
আরও পড়ুন: Aajke | রাহুল গান্ধী চাইছেন সিপিএম বাংলাতে শূন্য হয়ে যাক
সিপিএম মমতার ব্যাপারে অ্যালার্জেটিক হলেও বামফ্রন্টের শরিক দলের অনেক নেতাই কিন্তু মমতাকে খুব পছন্দ করতেন, গীতা মুখার্জী, সি পি আই এর সাংসদ, এক প্রবাদপ্রতিম নেত্রী বলেই ফেলেছিলেন যে ওর মত একজন কেন আমাদের দলের নেত্রী হলো না, দেখলেই জড়িয়ে ধরতেন, একসঙ্গে মহিলা সংরক্ষণ বিল নিয়ে কাজ করেছেন, ফরোয়ার্ড ব্লক নেতা অশোক ঘোষ বা আর এস পি নেতা ক্ষিতি গোস্বামীর মত নেতাদেরও বহুবার মমতার প্রশংসা করতে শোনা গেছে। আসলে মমতার এই স্ট্রিট ফাইটার ইমেজ কোথাও এক বামপন্থী আন্দোলনের কথা মনে করায়, সেই জন্যই বহু বাম নেতা অনেক সময়েই মমতার বিভিন্ন লড়াইকে সমর্থন করেছেন, আজ সেই তালিকাতে সিপিএম পলিটব্যুরো নেতা কমরেড মানিক সরকারের নাম যোগ হল।







