গত এক দশকে ভারতের রাজনৈতিক এবং সামাজিক মানচিত্রে বিশাল পরিবর্তন এসেছে, খোল নলচে বদলে গিয়েছে। নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার যে ‘নতুন ভারত’-এর স্বপ্ন ফেরি করছে, তার ভিত্তি মূলত পাঁচটা ন্যারেটিভের উপর দাঁড়িয়ে আছে। সরকারি বিজ্ঞাপনে, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করা এই ন্যারেটিভগুলো সাধারণ মানুষের মনে এক ধরণের ‘ইউফোরিয়া’ তৈরি করার চেষ্টা করে। কিন্তু যখন আমরা তথ্য, পরিসংখ্যান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর রিপোর্টগুলো দেখি, তখন এই উজ্জ্বল পর্দার আড়ালে থাকা ধসে পড়া অর্থনৈতিক অবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং কূটনৈতিক ব্যর্থতার এক কঙ্কালসার চেহারা বেরিয়ে আসে। আসুন সেই পাঁচটা বহুল প্রচারিত ‘মিথ’ বা গল্পকে ছিঁড়েকুটে দেখা যাক কেন এগুলো আসলে ডাহা মিথ্যে, ঢপবাজি।
প্রথম মিথ: ভারত এখন বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং সবার নাকি সমান উন্নতি হচ্ছে, ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’। মোদি সরকারের সবথেকে বড় সাফল্যের দাবি হল ভারতের জিডিপি (GDP) বৃদ্ধির হার। বারবার বলা হচ্ছে যে, ভারত এখন বিশ্বের ‘ফাস্টেস্ট গ্রোয়িং লার্জ ইকোনমি’। কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে যে ভয়াবহ বৈষম্য এবং দারিদ্র্য লুকিয়ে আছে, তা সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালের ‘ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ল্যাব’ (World Inequality Lab) এবং অক্সফাম (Oxfam)-এর রিপোর্টগুলো বিশ্লেষণ করলে এক অস্থির ছবি ফুটে ওঠে। সেখানে দেখা যাচ্ছে যে, ভারতের মোট জাতীয় আয়ের ৪০ শতাংশই কুক্ষিগত করে রেখেছে দেশের মাত্র এক শতাংশ মানুষ। এটাই সেই ‘বিলিয়নেয়ার রাজ’ যা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের থেকেও বেশি অসম বণ্টন ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত দেয়। মাথাপিছু আয় বা ‘পার ক্যাপিটা ইনকামে’র হিসাব এখানে সবথেকে বড় শুভঙ্করের ফাঁকি। যদি ভারতের সেই তিন থেকে চার শতাংশ অতি-ধনী মানুষের আকাশচুম্বী আয় বাদ দেওয়া যায়, তবে দেশের সাধারণ গরীব মানুষের মাথাপিছু আয় একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ভারতের নিচের দিকের ৫০ শতাংশ মানুষ, যারা এই বিশাল জনসংখ্যার অর্ধেক, তাঁদের হাতে দেশের মোট সম্পদের মাত্র তিন শতাংশ রয়েছে। যখন গুটিকয়েক মানুষের হাতে দেশের অধিকাংশ সম্পদ চলে যায়, তখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়, হচ্ছেও। বিশ্বজুড়ে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের গড় হার ৪৯ শতাংশ, সেখানে ভারতে এই হার মাত্র ১৫.৭ শতাংশে আটকে আছে এবং গত এক দশকে এর কোনও উল্লেখ্যযোগ্য উন্নতি হয়নি। এর অর্থ হল, মোদি সরকারের ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ স্লোগানটা কেবল বাকতাল্লা। জিডিপি বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু সেই বৃদ্ধির সুফল গরীব মানুষের পকেটে না ঢুকে তিন থেকে চার শতাংশ বড়লোকের সিন্দুকে গিয়ে জমা হচ্ছে। স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৬৩ মিলিয়ন বা ৬ কোটি ৩০ লক্ষ ভারতীয় দারিদ্র্যের অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। এই তথাকথিত দ্রুততম বৃদ্ধির ন্যারেটিভটা আসলে সেই তিন থেকে চার শতাংশ কর্পোরেট আর বিলিয়নেয়ারদের সাফল্যের গল্প, যা সাধারণ মানুষের অভাবের যন্ত্রণাকে বিদ্রূপ করে। এই ধরণের অর্থনৈতিক কাঠামো কেবল বৈষম্যই বাড়ায় না, বরং এটা এক ধরণের ‘পোভার্টি ট্র্যাপ’ বা দারিদ্র্যের ফাঁদ তৈরি করে, যেখান থেকে সাধারণ মানুষের পক্ষে বেরিয়ে আসা অসম্ভব হয়ে পড়ে। মধ্যবিত্ত শ্রেণী, যাকে অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হয়, ভারতে তাদের আয়ের ভাগও লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার অনুন্নত দেশগুলোর মতোই সংকীর্ণ। সুতরাং, ‘ফাস্টেস্ট গ্রোয়িং ইকোনমি’র এই ঢাক পেটানো আসলে এক ধরণের নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার রাজনীতি, যেখানে জিডিপি দেখিয়ে সাধারণ মানুষের শূন্য পকেটের সত্যটাকে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে।
দ্বিতীয় মিথ: ভারত এখন দুর্নীতিমুক্ত এবং ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের অবসান হয়েছে। মোদিজি যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন তাঁর প্রধান স্লোগান ছিল ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’। কিন্তু গত ১০ বছরে দুর্নীতির যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আমরা দেখলাম, তা ভারতের গণতন্ত্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন। দুর্নীতির ধরন বদলে এখন সেটা ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা ‘ফড়ে দালালদের-পুঁজিবাদ’-এ পরিণত হয়েছে, যেখানে সরকারি নীতি নির্ধারণ করা হয় নির্দিষ্ট কিছু কর্পোরেট হাউসকে সুবিধে দেওয়ার জন্য। এর সবথেকে বড় প্রমাণ হল ‘ইলেকটোরাল বন্ড’। ২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই নির্বাচনী বন্ড স্কিমকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে এবং একে বাতিল করে দিয়েছে। আদালত পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছিল যে, এই বন্ড ভোটারদের তথ্য জানার অধিকার (Right to Information) লঙ্ঘন করেছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর তহবিলে অস্বচ্ছতা তৈরি করেছে। কিন্তু তার আগেই, বিজেপি এই বন্ডের মাধ্যমে প্রায় ৭৮৮ মিলিয়ন ডলার বা কয়েক হাজার কোটি টাকা কামিয়ে নিয়েছে, যা অন্যান্য সব বিরোধী দলের মোট সংগ্রহের চেয়ে বহুগুণ বেশি। এই বন্ডের মাধ্যমে এমন অনেক কোম্পানি টাকা দিয়েছে, যাদের আয়ের কোনও উৎস নেই বা যারা লোকসানে চলছিল, যা থেকে সন্দেহ করা হয় যে, এগুলো আসলে শেল কোম্পানি বা কালো টাকা সাদা করার যন্ত্র। এমনকি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার (ED/CBI) তদন্ত চলছে, এমন কোম্পানিগুলোও বন্ডের মাধ্যমে বিপুল অর্থ দান করেছে, যা সরাসরি ‘কুইড-প্রো-কো’ বা সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে টাকা নেওয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। দেশের জল, জঙ্গল, নদী এবং পাহাড়ের অধিকার ক্রমশ নির্দিষ্ট কিছু কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে চলে যাচ্ছে। আদানি গোষ্ঠীর কথাই ধরা যাক; গত এক দশকে তাদের বন্দর পরিচালনার ক্ষমতা ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৪ শতাংশে পৌঁছেছে। একের পর এক বিমানবন্দর এবং বন্দর এই গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদালতও আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ২৫ কোটি ডলারের ঘুষ দেওয়ার অভিযোগ এনেছে, যা ভারতের মতো একটা দেশে দুর্নীতিমুক্ত হওয়ার দাবিকে বিশ্বজুড়ে উপহাসের পাত্র করে তুলেছে। আইন পালটে দেওয়া হচ্ছে, ২০২৩ সালের বন সংরক্ষণ আইন (FCA) সংশোধনীর মাধ্যমে বন কাকে বলা হবে তার ডেফিনেশনটাই পাল্টে দেওয়া হয়েছে, বাণিজ্যিক প্রকল্পের জন্য বনাঞ্চল ব্যবহারের নিয়ম অনেক শিথিল করা হয়েছে। এই সংশোধনীতে আদিবাসী এবং জঙ্গলবাসী মানুষের গ্রামসভার মতামত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা সরিয়েই দেওয়া হয়েছে, যার ফলে কর্পোরেটদের জন্য খনি বা কলকারখানা তৈরি করতে জঙ্গল দখল করা আরও সহজ হয়ে গিয়েছে। জঙ্গলকে এখন চিড়িয়াখানা বা সাফারি পার্কের মতো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, যা আসলে আদিবাসীদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার এক সুপরিকল্পিত নীল নকশা। সুতরাং, ভারত দুর্নীতিমুক্ত হচ্ছে—এই দাবিটা আসলে একটা বড় মিথ্যা; সত্য হল, এখন দুর্নীতি কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত এবং আইনি পোশাক পরে সাধারণ মানুষের প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | টাকা দিয়েই মোদি-শাহ কিনে নেবে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো?
তৃতীয় মিথ: ভারত এক সুপারপাওয়ার বা ‘বিশ্বগুরু’। দেশজুড়ে এমন একটা প্রচার চলছে যেন মোদিজি না থাকলে সারা পৃথিবী অচল হয়ে যেত। জি-২০ সামিটে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সেলফি তোলা বা বিদেশে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের সভায় ভাষণ দেওয়াকেই ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তব ভূ-রাজনীতিতে ভারতের অবস্থা এখন অত্যন্ত দুর্বল। ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ (Neighbourhood First) নীতি এখন কার্যত ব্যর্থ। মালদ্বীপের মতো ছোট্ট প্রতিবেশি দেশও আজ ভারতকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে তাদের মাটি থেকে ভারতীয় সেনা সরিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে গত দেড় দশক ধরে ভারত কেবল একটা রাজনৈতিক দল ও শেখ হাসিনার উপর বাজি ধরেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের অগাস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে হাসিনার পতনের পর সেখানে ভারতের কোনও প্রভাব অবশিষ্ট নেই, বরং ভারত-বিরোধী জনমত চরমে উঠেছে। নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং ভুটানের মতো দেশগুলোতে চীন তাদের পরিকাঠামো এবং ঋণের মাধ্যমে ভারতের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। ভারতের অবস্থা আজ এমন যে, তার ছোট প্রতিবেশিরাও এখন চীন এবং ভারতের মধ্যে ‘হেজিং’ বা দরাদরি করার সুযোগ পাচ্ছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলতে গেলে দেখা যায় যে, ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকে ভারতের সার্বভৌমত্ব এক বড় প্রশ্নের মুখে। সীমান্তে এখনও হাজার হাজার চীনা সৈন্য মোতায়েন রয়েছে এবং চীন অরুণাচল প্রদেশকে নিজেদের অংশ হিসেবে দাবি করে মানচিত্র প্রকাশ করছে। ভারত মুখে কড়া কথা বললেও কার্যত চীনকে তাদের আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে যেতেও পারেনি। উলটে বাণিজ্যিকভাবেও ভারত এখনো চীনের উপর প্রচণ্ড নির্ভরশীল। ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর শ্লোগান দিলেও ইলেকট্রনিক্স এবং ওষুধের কাঁচামালের জন্য ভারতকে এখনো বেইজিংয়ের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হয়। সুপারপাওয়ার হওয়ার দাবির মুখে সবথেকে বড় ধাক্কাটা এসেছে আমেরিকার তরফ থেকে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে আমেরিকা ভারতের উপর বিরাট ট্যারিফ চাপানোর ঘোষণা করেছে। ভারতের মূল রফতানি পণ্যগুলোর ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত করা হয়েছে। এই ট্যারিফ যুদ্ধের ফলে ভারতের রফতানি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভারতের মতো একটা বড় অর্থনীতির পক্ষে আমেরিকার এই চাপ অগ্রাহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। এই ক’দিন আগে আমেরিকা ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে তাদের রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে গেল, ভারত তার বিন্দুমাত্র নিন্দা করার সাহস দেখায়নি। যেখানে ব্রাজিল, চীন, রাশিয়া এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের কথা বলেছে, সেখানে ভারত আমেরিকার ভয়ে নাম ধরে সমালোচনা করতেও ভয় পেয়েছে। এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বিশ্বগুরু তো দূর অস্ত, ভারত এখন আমেরিকার একটা বাধ্য সহযোগী দেশ হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করছে, যা কোনওভাবেই একটা সুপারপাওয়ারের লক্ষণ হতে পারে না।
চতুর্থ মিথ: হিন্দুত্ব মানেই দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ। মোদি জামানার সবথেকে বিষাক্ত প্রচার হল, হিন্দুত্ব এবং দেশপ্রেমকে এক করে দেখা। বিজেপি এবং আরএসএস (RSS) সুপরিকল্পিতভাবে এমন এক ন্যারেটিভ তৈরি করেছে যেখানে হিন্দু ধর্মের প্রতি উগ্র আনুগত্যই নাকি দেশপ্রেমের একমাত্র প্রমাণপত্র। এর বাইরে যারা অন্য ভাবনায় বিশ্বাসী, তাদের ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’ বা ‘দেশবিরোধী’ বলে তকমা দেওয়া হয়। জাতীয়তাবাদের এই সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদী সংস্করণ আসলে ভারতের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যকে ভেঙে চুরমার করছে। ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে ‘হেট স্পিচ’ বা ঘৃণ্য বক্তব্যের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় ৭৪.৪ শতাংশ বেড়েছে। এই ধরণের বক্তব্যের মূল লক্ষ্য হল ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলিম এবং খ্রিস্টানদের ‘শত্রু’ বা ‘বহিরাগত’ হিসেবে চিহ্নিত করা। মজার বিষয় হল, এই ঘৃণ্য বক্তব্যের উৎস আর কেউ নয়, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিজেপির শীর্ষ স্তরের নেতারা। নির্বাচনের প্রচারে মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলা বা তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার কথা বলা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই উস্কানিমূলক রাজনীতির কারণে দেশজুড়ে এক ভয়াবহ মেরুকরণ তৈরি হয়েছে।
পঞ্চম মিথ: সব সমস্যার মূল জওহরলাল নেহরু। মোদি সরকারের একটা অদ্ভুত এবং হাস্যকর দিক হল, তাদের নেহরু-ভীতি। নেহেরু, গান্ধীর ভূত তাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। স্বাধীনতার ৬০ বছর পার হয়ে গেলেও এবং নেহরুর মৃত্যুর অনেক দশক পরেও নরেন্দ্র মোদি এখনও তাঁর প্রতিটা ব্যর্থতার জন্য ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীকেই দায়ী করেন। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বা জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় মোদিজি এমনভাবে কথা বলেন, যেন তিনি আজও নেহরুর সরাসরি প্রতিপক্ষ এবং নেহরু এখনও ক্ষমতায় আছেন। ২০২৫ সালের শেষে ‘বন্দেমাতরম’ গানটির ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে পার্লামেন্টে যে বিতর্ক হয়েছিল, সেখানেও মোদিজি ১৯৩৭ সালের ইতিহাস টেনে এনে নেহরুকে আক্রমণ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, নেহরু মুসলিম লিগকে তোষণ করতে গিয়ে ‘বন্দেমাতরম’ গানটাকে ‘টুকরো টুকরো’ করেছিলেন এবং দেশভাগের ভিত তৈরি করেছিলেন। ইতিহাসকে এই বিকৃতভাবে উপস্থাপন করার একটাই উদ্দেশ্য—বর্তমান প্রজন্মের কাছে নেহরুর ভাবমূর্তিকে কলঙ্কিত করা এবং নিজের তথাকথিত ‘শক্তিশালী’ ইমেজকে বড় করে দেখানো। মোদিজি নেহরুর অবদানকে অস্বীকার এবং বিকৃত করার জন্য একধরণের মানসিক হীনম্মন্যতায় ভুগছেন। অথচ বাস্তব হল, নেহরু যে আধুনিক ভারতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন, মোদি সরকার আজ সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকেই (যেমন আইআইটি, ইসরো বা বড় বড় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা) বিক্রি করে দিচ্ছে অথবা সেগুলোর স্বায়ত্তশাসন নষ্ট করছে। নিজের অযোগ্যতা ঢাকতে মৃত মানুষকে আক্রমণ করা আসলে এক ধরণের পলায়নবাদী রাজনীতি। নেহরুর উপর সমস্ত দোষ চাপানোর এই মিথ্যা গল্পটা এখন সাধারণ মানুষের কাছেও এক বিনোদনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আসলে মোদি সরকারের আদর্শগত দেউলিয়াপনাকেই প্রমাণ করে।
মোদি জামানার এই পাঁচটা ন্যারেটিভ আসলে সত্যের চেয়ে প্রচারের উপর বেশি নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে। জিডিপির সংখ্যা যেমন সাধারণ মানুষের ক্ষুধা মেটাতে পারে না, তেমনি ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার গর্জন আমেরিকার ট্যারিফ বা চীনের আগ্রাসন রুখতে পারছে না। দুর্নীতি আজ আর কোনও লুকানো বিষয় নয়, বরং নির্বাচনী বন্ডের মাধ্যমে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। হিন্দুত্বকে দেশপ্রেমের নাম দিয়ে আসলে সমাজের গভীরে ঘৃণার বীজ পোঁতা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ধ্বংস করে দেবে। আর সব ব্যর্থতার জন্য নেহরুকে দায়ী করা কেবল একধরণের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। প্রচারের এই বিশাল ইমারত একদিন ভেঙে পড়বেই, কিন্তু তার আগে দেশটার যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে, তা পুনরুদ্ধার করাই এখন সবথেকে বড় লড়াই। সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের কর্তব্য হল, বিজ্ঞাপন আর বাস্তবতার এই ফারাকটা বোঝা এবং প্রকৃত তথ্য দিয়ে ক্ষমতার এই মিথ্যে আস্ফালনকে রুখে দেওয়া।
দেখুন আরও খবর:








