গৌতম ভট্টাচার্য: কাপ-ভাগ্য কী হয়েছে সবার জানা। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটের হেড কোয়ার্টার কি ফের বদলাল? তার লোকেশন প্রথমে এবং দীর্ঘ অনেক দশক ধরে ছিল মুম্বই। বিষেণ বেদির তীব্রতম উদ্যোগে সত্তর দশকের শেষে স্থানান্তরিত হয়ে সেই যে দিল্লিতে গেছিল পুরোটা ফেরেনি। কর্ণাটক দ্রাবিড়-কুম্বলের সময়ে হালকা মাথা গলিয়েছিল। কিন্তু কোহলিরাজের দাপটে মসনদ রাজধানী এবং আরও বেশি করে উত্তর ভারতে থেকে যায়।
আধুনিক সময়ে মনে হচ্ছে অন্তত সাদা বলের হেডকোয়ার্টার গুজরাতে স্থানান্তরিত ।
বিশ্বসেরা এমন তিন ক্রিকেটার গুজরাট তৈরি করেছে চাপের মুখে ,বিপর্যয়ের মুখে যাঁদের সেরাটা শ্রেষ্ঠ অলংকার হয়ে ঠিকরে বেরোয়। এঁদের মধ্যে একজনকে নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই— জাসপ্রিত বুমরা। যাঁর নেওয়া চার উইকেট মাঠে বসে বোধহয় এই প্রথম দেখলেন কপিল দেব। শুনলে অবাক লাগবে দু’জনের দেখা হয়েছে আজ পর্যন্ত মাত্র একবার। তাও কোনো বিজ্ঞপনী শুটিংয়ে।
যা হোক ,বুমরা সম্পর্কে কাল প্রথম কুড়ি ওভারের বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক যোগিন্দর শর্মা যা বলছিলেন তা নিয়ে তর্কের অবকাশ নেই।
” বিশ্বক্রিকেটের সবচেয়ে বড় হিরে। “এদিনও প্রথম বলে উইকেট এমন টিমের বিপক্ষে যাদের সামনে একমাত্র তাঁর রিপোর্ট মাঝারি মাপের। মাঝারি মানে ক্যাটকেটে মাঝারি নয়। বুমরাচিত নয়। আর তাদেরই কিনা বিশ্বকাপ ফাইনালে এমন পটকালেন যে ভাষ্যকারদের আলোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়তে হল, এ কি বোলিংয়ে সাদা বলের ব্র্যাডম্যান ?
আরও খবর : তৃতীয় টি-২০ বিশ্বকাপ জিতে ৩ ‘বিরল’ রেকর্ড গড়ল ভারত! দেখে নিন একনজরে
ইতিহাস বলবে বুমরার বাকি দুই গুজু সতীর্থ ১৯ নভেম্বরের সেই অভিশপ্ত রাত্তিরে টিমে থাকতে পারেননি চোটের জন্য। অক্ষর প্যাটেল এবং হার্দিক পান্ডিয়া। এঁদের অলরাউন্ড দক্ষতা গোটা টুর্নামেন্ট যেভাবে সূর্যকুমার যাদবকে টেনে নিয়ে গেল, তাতে এঁদের সাহায্য পেলে রোহিত শর্মার কাপ ডাবল হয়। বিশেষ করে অক্ষয়কে যেন ছুড়ে দিয়ে গেল এবারের বিশ্বকাপ । লৌহমানবের পাড়ার ‘বাপু ‘ তিনি। নাদিয়াদে বল্লবভাই প্যাটেলের আটশো মিটার দূরে তাঁর বাড়ি। যে নাদিয়াদ এবারের বিশ্বকাপে আচমকা ক্রিকেটতীর্থ হয়ে গিয়েছে। রবীন্দ্র জাদেজাকে আপাতত তিনি পাস্ট টেন্সে পাঠিয়ে দিয়েছেন। গত বিশ্বকাপে কোহলির সঙ্গে ম্যাচ জেতানো পার্টনারশিপ করেছিলেন। আজ পাওয়ার প্লে-তে করা দুরন্ত বোলিংয়ে আবার হেডলাইন। বুমরার ইয়র্কারের মতো অক্ষয়ের আন্ডারকাটারও পেটেন্ট পেল বলে।
নিছক স্কোরবোর্ড সনজু স্যামসন এবং অভিষেক শর্মাকে এগিয়ে দেবে। কে ভেবেছিল পাওয়ার প্লে-র শেষে ভারতের রান দেখাবে বিনা উইকেটে ৯২। মোটামুটি তখনই ট্রেন্ড বোঝা হয়ে যায় যে ফিন অ্যালেন -টিম সেইফার্ট না বাঁচালে নিউজিল্যান্ড কাপহীন ফেরত যাচ্ছে। তখন বোঝা যায়নি দুটো খুব গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসের প্রয়োজন এর পরেও থেকে যাবে। যার একটা শেষে খেললেন শিবম দুবে। ৮ বলে ২৬। যাঁর ছয় মারার দক্ষতা এবং ফিনিশিং মিলে মাইকেল বিভানকে মনে পড়ে। বিভান ছয় না মারলেও ওয়ানডেতে যেভাবে স্কোরিং রেট এগিয়ে নিয়ে যেতেন সেটা অকল্পনীয় মনে হত। দুবেও তাই। একজন চারে। একজন ছয়ে।
কিন্তু আমার কাছে আরো বেশি কৃতিত্ব ঈশান কিষাণের। ২৫ বলে ৫৪ এমন ভঙ্গিতে যেন ভাইপোর সঙ্গে ক্রিকেট খেলছি। ওকে শেখাচ্ছি ক্রিকেটটা। কে বলবে গতকাল বিকেলে খবর পেয়েছেন তাঁর মাসতুতো দিদি শিলিগুড়ির কাছে গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন। তাঁর মাবাবা খেলা দেখতে এসে আবার আমেদাবাদ থেকে ফেরত গিয়েছেন। সেই শক দূরে সরিয়ে রেখে কী ইনিংস ! তার পর তিনটে ক্যাচ। যার একটা পঁচিশ মিটার ঝাঁপিয়ে পড়ে সামনে ধরা। কিপারের পক্ষে আউটফিলডে দাঁড়ানো যে কঠিন তাঁকে দেখলে কে বলবে ? তার চেয়েও কঠিন অবশ্য বোর্ডের চুক্তি থেকে বাতিল হয়ে গিয়ে, উশৃঙ্খল চিহ্নিত হয়ে গিয়ে এমন প্রত্যাবর্তন ! সিনেমার ফাস্ট হাফ আর ক্লাইম্যাক্স। দুটো ভিন্ন পৃথিবী।
স্টেডিয়াম লাগোয়া সবরমতী তটে নব ইতিহাসের স্থাপত্য শোভা পাচ্ছিল ভারতীয় ইনিংস শেষেই। বোঝ যাচ্ছিল আজ আর বিলাপের কাহিনী নেই। ঘন্টাদেড়েকের মধ্যে সেই স্থাপত্যের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হল এই যা।
অভিশপ্ত ১৯ নভেম্বরের চিতা নিভিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট উঠে এল নতুন তারিখ যা তিরাশির ২৫ জুনের মতোই চিরস্মরণীয় থাকা উচিত। ছাব্বিশের ৮ মার্চ।
অপয়া মাঠের বদনাম ঘুচিয়ে আমেদাবাদে ভারতীয়দের বিশ্বকাপ হাতে তোলার খবর জীবিত এবং মৃত দু’ধরণের ক্রিকেট অনুরাগীদেরই জানা হয়ে গিয়েছে ! কিন্তু একটা বিতর্কের নিষ্পত্তি হওয়া বাকি। ইতিহাস ছুঁয়ে ইতিহাসকে যারা হারাল , গৌতম গম্ভীরের সেই ইন্ডিয়ান টিম কি সর্বকালের সেরা টি টোয়েন্টি দল? গ্রেটেস্ট অফ অল টাইম। যে অভিব্যক্তিকে ইদানীং ‘ গোট ‘ বলার রেওয়াজ হয়েছে।
মনে রাখবেন দুহাজার তেইশের পর টি টোয়েন্টির এই নতুন ভারত না কোনও সিরিজ হেরেছে। না কোনও টুর্নামেন্ট। টস হারার পরেও শিশিরসিক্ত মাঠের প্রতিরোধ অগ্রাহ্য করে যারা বিশ্বকাপ তুলল তাদের মতো ধারাবাহিকতা বিশ্বের কোনও টি টোয়েন্টি ইউনিট কখনো দেখায়নি।
খুব সচেতনভাবেই সূর্যকুমার যাদব না লিখে জিজি-র নাম লিখলাম। রাহুল দ্রাবিড় তৈরি করেছিলেন ঠিক কথা। কিন্তু সেই কাঠামোকে সুপারস্ট্রাকচারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন গম্ভীর। এমন সিক্স হিটিং টিম বানিয়েছেন যে বিশ্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ছাড়া পাশে রাখার মতো কেউ নেই। আর এমন অকুতোভয় এরা যে পরপর ব্যাটসম্যান এসে সেটটেট হওয়ার তোয়াক্কা না করে মারতে শুরু করে দেয়। ফাস্ট গিয়ার বলে কোনো শব্দ নেই। গাড়ি হয় থার্ড গিয়ারে চলছে। নয়তো ফোর্থ।
কামব্যাকের কথা বলছি। গম্ভীরের নিজেরও তো বিশাল কামব্যাক। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজ হারা এবং রোকোর ওয়ানডে সাফল্যের পর তিনি হয়ে গেছিলেন ইন্টারনেটে সবচেয়ে ধিকৃত মানুষ। আর এখন বিশ্বকাপ রেকর্ড শুধু চিন্তা করুন। প্লেয়ার হিসেবে দুটো বিশ্বকাপ জয় । কোচ হিসেবে একে এক। ধারেকাছে কেউ নেই।
নিউজিল্যান্ড যথেষ্ট তৈরি হয়ে নেমেছিল। স্ট্রাটেজি নিয়েছিল গায়ে বল করবে না। জোফরা আর্চারের অভিজ্ঞতার পর গাতিয়ে না করে স্লোয়ার করবে। স্টাম্পের বাইরে ট্রামলাইন ঘেঁষে ইয়র্কার দেবে। আর ইয়র্কার না দিয়ে লো ফুলটস বেশি করবে। ভেবেছিল ভারতের ব্যাটিং মেশিন এইভাবে যদি স্বাভাবিক মোমেন্টাম তোলা থেকে বাধাপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু ওই যে লিখলাম গম্ভীর এমন সিক্স হিটিং লাইন আপ বানিয়েছেন যে টুর্নামেন্টে প্রথম টিম হিসেবে তারা ১০০ ছক্কা মেরেছে। তাদের আটকাবে কী করে?
আর ভাগ্যও যেন সঙ্গে ছিল। ওয়াংখেড়েতে সঞ্জু স্যামসনের যে ক্যাচ হ্যারি ব্রুক ফেলেন তা পাড়ার হারুও দশ বছর বয়েসে ফেলেনি। তাজ্জব মিস। স্যামসন করে যান সেমি ফাইনাল জেতানো ৮৯। আজও ১৮ বলে দ্রুততম পঞ্চাশ করা অভিষেক তৃতীয় ওভারে ক্যাচ তুলেছিলেন। ক্যাচ যায় ডিপ স্কোয়ার লেগে। ঠিক যেখানে ট্র্যাভিস হেড দুর্দান্ত ক্যাচ ধরেছিলেন রোহিত শর্মার। ভারতের ইনিংস মোমেন্টাম তখনই শেষ হয়ে যায়। সেই ১৯ নভেম্বর।
আজ এক মাঠ এক জায়গা। ট্রাভিস হেডের চেয়ে অনেক ভালো ফিল্ডার গ্লেন ফিলিপ্স। কিন্তু ক্যাচটা পেলেন না। পেলে? ২৫৫ হয়?
জানি না। বুদ্ধিতে সব কিছুর ব্যাখ্যা হয় না। তাই গম্ভীরের তুকতাক নিয়ে তর্ক করার রাত্তির অন্তত আজ নয়। কী বলেন?
দেখুন অন্য খবর :







