আপাতত কুরুক্ষেত্রের অন্য নাম ভবানীপুর। হ্যাঁ, সেখানে প্রার্থী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। এমনিতে শুনতে ভালোই লাগছে, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মুখোমুখি হচ্ছেন। সংবাদমাধ্যমের কাছে বড় খবর। গতবার এই শুভেন্দু অধিকারীই হারিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে, এবারে ঘরে এসে চ্যালেঞ্জ করছেন। এটা বেশ মুচমুচে খবর। কিন্তু এই খবরের দু’টো দিক আছে। প্রথমটা হল- কী হতে পারে? আর দ্বিতীয়টা হল- তাঁরা যারা এই রাজ্যে শাসক দলের সমর্থকও নয়, অথচ যারা মনে করেন বিজেপি এক সাম্প্রদায়িক দল, এক ফাসিস্ট দল, যারা মনে করেন ভারতের সংবিধান গণতান্ত্রিক, প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিজেপির হাতে বিপন্ন, যারা মনে করেন দেশের অন্য আর পাঁচটা দলের তুলনায় বিজেপি অনেক অনেক বেশি বিপদজনক, এই ভবানীপুরে তাদের স্ট্যান্ড কী হওয়া উচিত? ভবানীপুরে তারা ঠিক কোন রাজনৈতিক অবস্থান নেবেন? আসুন দু’টো দিক থেকেই বিষয়টাকে আলোচনা করা যাক।
প্রথমে বোঝা যাক বিষয়টা কী? বিজেপি বাংলার মাঠে রাজনীতিতে নেমে প্রাথমিক কিছু ভুল করার পরে তাদের নিজধর্মে ফিরছে। হ্যাঁ, সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো সেটাই বলছে। বামেদের এক চুড়ান্ত ব্যর্থতার পরেই বিজেপি এ রাজ্যে এক বড় শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু তারা সেদিন তৃণমূল থেকে বেরিয়ে আসা বা তৃণমূল ভেঙে বার করে আনা নেতাদের উপরে নির্ভরশীল ছিল না। একেবারেই নয়। মুকুল রায় সেদিন ওয়ার রুম সামলাচ্ছিলেন, দলের আদর্শ, মত বা পদ্ধতি নিয়ে তাঁর কোনও কথা ছিল না আর তিনি সেই শুরু থেকেই ‘কিং মেকার’ হতেই পছন্দ করতেন, জানতেন রাজার আসন তার জন্য নয়, তিনি সেখানে বেমানান। কিন্তু ২০২১-এ জয়কে নিশ্চিত করার জন্যই বিজেপির দিল্লির নেতারা শুভেন্দুর উপরে নির্ভর করেছিলেন, আর তাঁর নেতৃত্বেই গোটা দলটা এ রাজ্যে বিজেপির কাঠামো ভেঙে একটা অন্য চেহারা নিচ্ছে দেখেও আটকাতে পারেননি, বা ভেবেছিলেন ক্ষমতা আসুক, দেখা যাবে। কিন্তু ফলাফল এক্কেবারে উলটো, ২০১৯-ই ছিল তাদের শিখর, তারপর থেকে তাদের ক্ষয় শুরু হয়েছে। হ্যাঁ, তারা বুঝতে পেরেছেন যে ২০১৯-এর পরে ধৈর্য ধরলে ২০২১-এ বাংলা দখল না হলেও ২০২৬-এ বাংলা থাকত তাদের হাতে। কিন্তু ভুল যা হবার তা তো হয়ে গিয়েছে। এবারের বিজেপি অনেক বেশি ক্যালকুলেটিভ, রাজ্যের সংগঠন শমীক ভট্টাচার্যের হাতে, দলের বিভিন্ন কমিটিতে আরএসএস ঘনিষ্ঠ আদি বিজেপির লোকজন। এবারে প্রার্থী ঘোষণার পালা, তাঁরা শুভেন্দু অধিকারীকে বাঘে চড়িয়ে দিলেন, নামলেই বাঘে খাবে।
গতবারে সন্মানের লড়াই ছিল, মুখ্যমন্ত্রী বনাম দল থেকে বের হয়ে যাওয়া শুভেন্দু অধিকারী। জিতেছিলেন কত ভোটে? ১৯৫৬ ভোটে। হ্যাঁ, সন্মানের লড়াইইয়ে এক ভোটে জিতলেও জয়। কিন্তু সেই মার্জিন তো একেবারেই সেফ মার্জিন নয়। সামান্য এক শতাংশের হেরফেরে এ আসনের হাতবদল হয়ে যেতে পারে। মানে শুভেন্দু অধিকারীকে দম লাগা কে হ্যাঁয়সা লড়তে হবে ওই নন্দীগ্রামে। কেন? কারণ এবারেও নন্দীগ্রাম তাঁর কাছে এক প্রেস্টিজের লড়াই। হারলে তৃণমূলের নেতা কর্মীরা বলবেন, বলেছিলাম, আলো নিভিয়ে জিতেছিল গতবারে। হ্যাঁ, এই ন্যারেটিভই মানুষ খাবে। ১৯৫৬ মার্জিনকে একটা সন্মানজনক মার্জিনে নিয়ে যেতে হবে, যে আসনে গত পাঁচ বছর ধরে ম্যান মার্কিং করে চলেছে তৃণমূল, গত ক’মাস ধরে যুবরাজের সেবাশ্রয়ের ভীড় কিন্তু ঘুরিয়ে দেবেই বলছি না, কিন্তু ঘুরিয়ে দিতেই পারে ফলাফল। দাঁড় করানো হয়েছে এমন একজনকে যাঁকে নার্ভের লড়াই লড়তে হচ্ছে না, পবিত্র কর স্থানীয় মানুষ। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারীর কাছে ইজ্জত কা সওয়াল হ্যায়। আবার ধরুন ভবানীপুর। বিধানসভা নির্বাচনে ২০২১-এ দাঁড়িয়েছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। জিতেছিলেন প্রায় ২৯ হাজার ভোটে, রুদ্রনীল ঘোষকে হারিয়েছিলেন। কংগ্রেস এই আসনে হাজার পাঁচেক ভোট পেয়েছিল। তার পরে এই আসনে বাই-ইলেকশনে দাঁড়ান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, জেতেন প্রায় ৫৯ হাজার ভোটে, হারান প্রিয়াঙ্কা টিব্রেওয়ালকে, সেবারে এই আসনে সিপিএম পেয়েছিল ৪ হাজার ভোট। মাথায় রাখুন প্রিয়াঙ্কা টিব্রেওয়াল মারওয়াড়ি সম্প্রদায়ের, ভবানীপুরে মারওয়াড়ি প্রচুর থাকেন। কাজেই এই আসন সেই অর্থে তৃণমূলের সেফ সিট, বিজেপিকে জিততে হলে ১০ শতাংশ স্যুইং দরকার, সেটাও তৃণমূল থেকে বিজেপিতে। যা অসম্ভব। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারীকে জি জান দিয়ে লড়তে হবে যাতে তিনি বিজেপির রুদ্রনীল ঘোষ বা প্রিয়াঙ্কা টিব্রেওয়ালের মার্জিনের তলায় না চলে যান। হ্যাঁ, ওনাকে এই আসনেও জান দিয়ে লড়তে হবে। তার মানে কী? তার মানে হল এই দু’টো আসনেই আটকে থাকবেন তিনি, দম ফেলার সময় পাবেন কী? কিন্তু উনি তো বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। ওনাকে তো রাজ্য জুড়ে প্রচারে থাকতে হবে। ওনার নিজের একটা গ্রুপ আছে, যাকে গোষ্ঠী বলে, তাদের জন্য প্রচারে নামতেই হবে। কিন্তু নামবেন কখন? হ্যাঁ, ওনাকে সম্ভবত মুর্গি করা হয়েছে, ওনাকে বাঘের পিঠে চড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, নামলে কিন্তু বাঘেই খাবে। দুষ্টু লোকজন বলছে এসবই নাকি বিজেপির নেতারা বসেই করেছেন, হ্যাঁ টু গেট রিড অফ দিস নুইসেন্স। জানি না কতটা ঠিক, কতটা ভুল, কিন্তু এটা জানি যে এবারে শুভেন্দু অধিকারী তাঁর জীবনের সবথেকে কঠিন লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে।
অন্যদিকে দেখুন গতবারে কাঠিবাজির শিকার, হ্যাঁ আমি বলছি না, দিলীপ ঘোষ নিজেই এই কথা বলেছিলেন, সেই দিলীপ ঘোষ কিন্তু অপেক্ষাকৃত ভালো আসন, খড়গপুরে প্রার্থী। যাঁরা দাবা খেলেন তাঁরা জানেন, প্রতিপক্ষের আক্রমণের মূল লক্ষ্য কুইনকে দরকার হলে ক্যাসল করতে হয়, দুর্গে রাখতে হয়, এখানে কোট আনকোট সবচেয়ে বড় নেতাকে সবচেয়ে রিস্কি জোনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। হ্যাঁ, এটা হচ্ছে প্রথম আলোচনা। এবারে আসুন দ্বিতীয় আলোচনাতে নামা যাক। হ্যাঁ, ভবানীপুরে কী করা উচিত, হোয়াট ইজ টু বি ডন? এমনি তে তো আমরা বলিই, কদিন আগেও বলেছিলাম, নো ভোট টু বিজেপি, হ্যাঁ বিজেপি কে ভোট দেবেন না, দেবেন না কারণ বিজেপি আর দশটা রাজনৈতিক দল নয়, বিজেপি আরএসএস-এর রাজনৈতিক শাখা, যে আরএসএস-এর ঘোষিত লক্ষ্যই হল হিন্দুরাষ্ট্র, যে আরএসএস এক্কেবারে শুরুতেই জানিয়েই দিয়েছে এই দেশে থাকবে তারাই যাদের কাছে এই দেশ পিতৃভূমি, যাদের কাছে এই দেশ কর্মভূমি, যাদের কাছে এই দেশ পূণ্য ভূমি। মানে খুব পরিস্কার, যদি আপনার পূণ্য উপাসনাভূমি হয় ভারতের বাইরে মক্কা, মদিনা বা কাবাতে, বা আপনার উপাসনাভূমি হয় বেথলেহেম বা ভ্যাটিক্যান সিটি, তাহলে আপনি ভারতীয় নন।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | বাংলার হাড্ডাহাড্ডি আসনগুলোতে এবারে কোনদিকে হাওয়া?
হ্যাঁ, আপনার পূণ্যভূমিও থাকতে হবে এদেশেই, যেমনটা আছে হিন্দুদের, বৌদ্ধদের বা জৈনদের। না পারসীরা নয়, যরুথ্রিস্টিয়ানরা নয়, আর নাস্তিকরা তো নয়ই। হ্যাঁ আরএসএস-এর নেতৃত্বে তাদের রাজনৈতিক শাখা বিজেপি এক ফাসিস্ট সংগঠন যারা আমাদের দেশের সংবিধানকে মেনে নেয়নি, যারা আমাদের দেশের জাতীয় পতাকাকে মেনে নেয়নি, সেই তারাই আজ বাংলা দখল করতে চায়। কাজেই নো ভোট টু বিজেপি। আর আমি চাই বা না চাই, আপনার পছন্দ হোক বা না হোক, তৃণমূল কংগ্রেস এই সময় পর্যন্ত এই রাজ্যে বিজেপিকে আটকানোর জন্য সবথেকে বড় শক্তি। সারা রাজ্যে তবুও বলবো, চাইলে তৃণমূলকে ভোট দিন, চাইলে বামেদের ভোট দিন, চাইলে কংগ্রেসকে ভোট দিন, চাইলে নোটাতে ভোট দিন কিন্তু ভবানীপুরে শ্লোগান খুব পরিস্কার, ভোট ফর মমতা। হ্যাঁ ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই ভোট দিন। এই আসনের লড়াইটা দুই রাজনৈতিক দলের লড়াই নয়, এই আসনের লড়াই দুজন ব্যক্তির নয়, এই আসনে লড়াই দুটো অবস্থানের প্রতিকী লড়াই, দুটো অবস্থানের মুখোমুখি লড়াই। ফাসিস্টদের বিরুদ্ধে ফাসিস্ট বিরোধীদের লড়াই, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতার লড়াই। হ্যাঁ, সেই লড়াইয়ে কোনও দ্বিধা দ্বন্দ্ব থাকার কথা নয়, এখানে শ্লোগান ভোট ফর মমতা। কেন? কারণ ভবানীপুরের লড়াই এই মুহূর্তে এই রাজ্যে বিজেপি বনাম বিজেপি বিরোধীদের লড়াই, যেখানে বিজেপির ক্যান্ডিডেট শুভেন্দু অধিকারী, যিনি এই বসন্তেই দোল উৎসবের সময়ে এই ভবানীপুরে দাঁড়িয়েই বলেছেন, “নাস্তিকতা, সেকুলারিজমকে নিপাত যেতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা চলবে না। দেশের নাম হিন্দুস্থান। এখানে হিন্দুরা রাজত্ব করবেন! হিন্দু-বিরোধীরা ধ্বংস হবেন!” হ্যাঁ এত স্পষ্ট উচ্চারণ আমরা এ রাজ্যে দিলীপ ঘোষের মুখে, শমীক ভট্টাচার্যের মুখেও শুনিনি। হ্যাঁ, উনি আসলে ভবানীপুরের হিন্দু ভোটের মেরুকরণের জন্যই এই বিষ ছড়াচ্ছেন, ছড়াচ্ছেন সব জেনেই, সব বুঝেই। কদিন আগে ওই রামনবমীর সময়ে দু’কোটি হিন্দুদের রাস্তায় নামানোর কথা বলেছিলেন এই শুভেন্দু অধিকারী।
আসলে এ রাজ্যে কাঁথির খোকাবাবুর সমস্যা কি একটা, হাজারো সমস্যা তো আছে, মমতা যে পথে চলছেন, সেই পথ তো দেখিয়েছেন রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, রামমোহন, আরও অনেকে। তারপরে এই আর্য, ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্ম ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও বাংলার প্রতিবাদী ধর্ম প্রচারকরা আছেন, চৈতন্য থেকে লালন থেকে গুরুচাঁদ ঠাকুর। এই মনিষীদের সর্ব ধর্ম সমন্বয় বা ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এই বাংলাতে বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ব বা রামকেন্দ্রিক হিন্দুত্বকে বেড়ে উঠতে দিচ্ছে না। এখানেই তো শেষ নয়, এরও উপরে রবি ঠাকুর, নজরুল। মানবতাবাদ আর হিন্দু মুসলমান সম্প্রীতির যে পাঠ তাঁরা দিয়ে গিয়েছেন তা ওই রিপাবলিক উচ্চিংড়ের কর্কশ চিৎকারে মুছে যাবে তেমন তো নয়। এবং শুভেন্দুর সমস্যা বাড়াতে এক দীর্ঘ বাম আন্দোলনের ইতিহাস এই ভূমিতে ওনাদের রাজ্যজোড়া গ্রান্ড প্ল্যানের বীজ ছড়াতেই দিচ্ছে না। আর এসব ছেড়ে দিয়েই যদি কেবল ধর্মই দেখেন, সেখানেও ডাডার যাবতীয় পরিকল্পনায় গ্যামাস্কসিন ছিটিয়ে দিয়ে গিয়েছে বাংলার প্রাচীন সময় থেকে বারো মাসে তেরো উৎসবের আবহ। আমাদের শুভেন্দু ডাডার দু’কোটি হিন্দুদের রামনবমীতে রাস্তায় নামানোর ঘোষণা মাঠে মারা গিয়েছে। কেন? তার অন্যতম কারণ হল রামনবমী বাংলার উৎসব নয়, কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানো যায় না। ঠিক এই দিনে আমাদের উৎসব হল অন্নপূর্ণা পুজো, অন্নকূট উৎসব। বাংলায় সেই পুজো চালু করে দিলেন অন্নদা মঙ্গল, তাঁর চন্ডীপাঠে লিখলেন, “যে জন করয়ে অন্নপূর্ণা উপাসনা। / বিধি হরি হর তার করয়ে মাননা।। / ইহলোকে নানা ভোগ করে সেই জন। / পরলোকে মোক্ষ পায় শিবের লিখন।।“ তারপর থেকে এই চৈত্র মাসের শুক্ল অষ্টমীতে অন্নপূর্ণা পুজো শুরু হল। আসলে কৃত্তিবাসী রামায়ণে অকাল বোধনের বর্ণনার পরেই আমাদের বাংলাতে অকালবোধনে আশ্বিন মাসে দুর্গাপুজো চালু হয়।
যে কথা বলছিলাম, আমাদের বাংলাতে রামনবমী ছিল না, কিছুদিন আগে পর্যন্তও হিন্দি ভাষী মানুষজন হনুমান সেজে গদা হাতে ঘুরতেন, আমরা আমোদ পেতাম যা এখন এক দাঙ্গার আবহ নিয়েই হাজির সারা দেশে, বিশেষ করে এই বাংলাতে। এখন রামনবমী মানেই দাঙ্গা, রামনবমী মানেই মিছিলে পাথর ছোঁড়া আর হাঙ্গামা, আর সেসব আসলে এক হিন্দু মেরুকরণের চেষ্টা, আর সেটা কেবল এক নির্বাচনের ব্যাপার নয়, একদল জিতবে, একদল হারবে, কিন্তু বিজেপি যা করছে, যা করতে চাইছে তা আসলে এক সামাজিক পরিবর্তন, যে সামাজিক পরিবর্তন বাংলার নবজাগরণের বিরুদ্ধে, নজরুল, রবি ঠাকুরের চিন্তার বিরুদ্ধে, চৈতন্য চিন্তা বা ভক্তি আন্দোলনের বিরুদ্ধে। আমাদের চড়ক থেকে গাজন, কেবল হিন্দুর উৎসব নয়, মুর্শিদাবাদের কান্দি মহকুমায় গাজন উপলক্ষে কান্দি শহর পরিক্রমা করানো হয় রুদ্রদেব জ্ঞানে পূজিত প্রাচীন বুদ্ধ বিগ্রহকে। সেই বিগ্রহ কে ছুঁয়ে প্রার্থনা জানায় হিন্দু মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের বাঙালিরা। এই ঐতিহ্য বহুদিনের। কত দিনের? আমরা জ্ঞান হওয়া ইস্তক এমন বহু কান্ড দেখে আসছি। আমাদের গ্রাম বাংলার মায়েরা অনায়াসে পির বাবার দরগা থেকে জলপোড়া এনে অসুস্থ ছেলের কপালে মাখিয়ে দেন। আমাদের মা বোনেরা মানত করেন এমন অসংখ্য দরগায়। সিন্নি প্রসাদ নিয়ে ঘরে ফেরেন। আমরা এই বাংলায় কোনও দাঁত মুখ খ্যাঁচানো হনুমান চাই না, আমরা চাই আমাদের সন্তান থাকুক দুধে ভাতে। আর ঠিক তাই এ বাংলাতে সাম্প্রদায়িক আগুন লাগানোর, ভরপুর চেষ্টা হচ্ছে কিন্তু তা খুব কার্যকরী হচ্ছে না, তিনটে লাশ হাতে পাবার পরেও সেই চুড়ান্ত লড়াই হচ্ছে না কারণ সেখানেও হিন্দু মুসলমানের রক্ত মিশেছে এক জায়গাতেই। কারণ ওই যে আমাদের চেতনায় রবীন্দ্রনাথ, হৃদয়ে নজরুল। আমরা এই বাংলার ধর্ম, ধর্মের অনুষঙ্গকে নয়, ধর্মের ঝান্ডা, রং আর শ্লোগানকে নয়, এই মাটিকেই পূণ্যভূমি বলি, আমাদের ঠাকুর বলে গিয়েছেন, ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল–পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।’ আজ সেই লড়াইয়ের এক কেন্দ্রবিন্দু হল ভবানীপুর, না সেখানে দল নয়, ব্যক্তি নয়, এক সাম্প্রদায়িক ফাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছেন মানুষ, সেটাই দেখলাম সেদিন, শুভেন্দু যাচ্ছেন হুড খোলা গাড়িতে, পাশ থেকে কিছু মানুষজন চিৎকার করছিলেন ‘জয় বাংলা’ বলে, শুভেন্দু মেজাজ হারালেন, অকথ্য গালিগালাজ করলেন, সিকিউরিটিকে সামলাতে হল, নাহলে তিনিই নেমে পড়তেন হাতাহাতিতে। আসলে উনি বেজায় টেনশনে আছেন, টেনশন আম আর ছালা দুটোই হারানোর।
দেখুন আরও খবর:








