কলকাতা: বকরি ঈদে কুরবানি এবং রাজ্যের নতুন বিজ্ঞপ্তি ঘিরে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার শুনানি শেষ হল কলকাতা হাইকোর্টে (Calcutta High Court)। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল (Sujay Paul) এবং বিচারপতি পার্থসারথী সেনের (Parthasarathi Sen) ডিভিশন বেঞ্চ বৃহস্পতিবার রায়দান স্থগিত রাখে। মামলাকে কেন্দ্র করে আদালতে ধর্মীয় অধিকার, প্রশাসনিক পরিকাঠামো, পশুবলি এবং রাজ্যের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিস্তর সওয়াল-জবাব হয়।
মামলাকারীদের অন্যতম দেবযানী দাশগুপ্ত আদালতে দাবি জানান, ধর্মীয় কারণে কোনও প্রাণীর বলি বা কুরবানি সম্পূর্ণ বন্ধ করা হোক। তাঁর বক্তব্য, বকরি ঈদে সমস্ত ধরনের কুরবানি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে আইনজীবী ইমতিয়াজ আহমেদ প্রশ্ন তোলেন রাজ্যের বাস্তব পরিকাঠামো নিয়ে। তাঁর বক্তব্য, কুরবানির জন্য যে বাধ্যতামূলক শংসাপত্রের কথা বলা হয়েছে, তা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা কোথায়? তিনি বলেন, “কসাইখানা কোথায়? মানুষ কুরবানির জন্য যাবে কোথায়? রাজ্য নিজেই জানে এই ব্যবস্থা বাস্তবে কার্যকর করা সম্ভব নয়।” পাশাপাশি ১৪ বছরের বেশি বয়সী গরু কুরবানির নিয়ম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানের হয়ে গুপতচরবৃত্তি, কলকাতা থেকে গ্রেফতার এক
আদালতে সওয়াল করেন আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য এবং শামিম আহমেদও। তাঁদের বক্তব্য, ১৯৫০ সালের আইন মূলত কৃষিকাজ ও দুধ উৎপাদনের স্বার্থে তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে কৃষিক্ষেত্রে গরুর ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। তাঁরা দাবি করেন, আইন কার্যকর করার আগে যে গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছিল, সেখানে কলকাতা, কালিম্পং এবং পুরসভা এলাকাতেই নির্দিষ্ট কসাইখানার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ পুরসভাতেই পর্যাপ্ত পরিকাঠামো নেই বলে অভিযোগ তোলেন তাঁরা। আইনজীবীদের আরও বক্তব্য, নতুন রাজ্য সরকার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে যে মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং এক জন পশু চিকিৎসক শংসাপত্র দেবেন। সেই সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে ১৫ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগও রাখা হয়েছে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটিকেই “অবাস্তব” বলে দাবি করেন তাঁরা। এক টাকার জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প পেপারের বাধ্যবাধকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয় আদালতে।
মামলাকারী মেঘনাদ দত্ত আদালতে ২০১৭ সালের কলকাতা হাইকোর্টের একটি নির্দেশের প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর দাবি, বিচারপতি নিশিথা মাত্রে বেআইনি পশুর হাট বন্ধ এবং নির্দিষ্ট জায়গায় কুরবানি বা বলির নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশ কার্যকর করতেই বর্তমান বিজ্ঞপ্তি বলে দাবি করেন তিনি। এদিকে আইনজীবী সাদান ফারাজ আদালতে বলেন, যে কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সাধারণত সুস্থ পশুকেই বলি দেওয়া হয়। ফলে কুরবানিকে ঘিরে অযথা আতঙ্ক তৈরির প্রয়োজন নেই বলেও মত তাঁর।
কলকাতা পুরসভার পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে আইনজীবী নিলৎপল চট্টোপাধ্যায় জানান, রাজ্যের তরফে যে বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে, তা কলকাতা হাইকোর্টের আগের নির্দেশ মেনেই করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, “কেউ হাইকোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধে রিভিউ চায়নি, শুধুমাত্র বিজ্ঞপ্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।” তিনি আরও বলেন, এটি সম্পূর্ণ রাজ্যের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং জনস্বার্থ মামলায় তা চ্যালেঞ্জ করা কতটা গ্রহণযোগ্য, সেই প্রশ্নও রয়েছে। পুরসভার দাবি, প্রতি বছরই এই ধরনের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয় এবং বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ মানুষকে জানানো হয়। কলকাতা পুরসভার নির্দিষ্ট স্লটার হাউস, পর্যাপ্ত কর্মী এবং পশু চিকিৎসকের ব্যবস্থাও রয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ১৯৫০ সালের আইনের আওতায় ইতিমধ্যেই ৬১০টি ঘটনায় পদক্ষেপ করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
দেখুন আরও খবর:







