যখনই একটা বড়সড় পলিটিক্যাল ইভেন্ট হয়, তখনই মাথার ভেতরে সেই পোকাটা লাফ মেরে ওঠে, হু স্ট্যান্ডস টু গেইন? তাইলে মামু, লাভ কার? গতকাল আমরা দেখলাম এক অভূতপূর্ব দৃশ্য, জাজেরা অবিভাদন জানাচ্ছেন, সুপ্রিম কোর্টের বাইরে মমতাকে দেখার জন্য আম জনতা নয় কালো কোট পরা উকিলবাবুদের ঢল আর সেখানে চিৎকার শেরনী আয়া, ছেড়ো মত। বাঘিনী এসেছে ডিস্টার্ব কোরওনা। আর রাজ্য জুড়ে মানুষের এক জব্বর পার্সেপশন, দিদি গেছে আমাদের হয়রানির বিরুদ্ধে লড়তে, দিদিই পারে, দিদি ইংরিজিতে ফাটিয়ে বললো মাইরি, ইত্যাদি ইত্যদি। এখন ওকালতি জানা ন্যারা বাগচি বা বিকাশ উকিল বা আরও কয়েকজন বলতেই পারেন ইংরিজিটা ঠিক ভালো নয়, শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) যখন ইংরিজি নিয়ে কথা বলছেন তখন এনাদের তো হক আছে বলতেই হবে, বা ধরুন বহু টেকনিক্যাল পয়েন্ট তুলতেই পারেন, উনিই কি সওয়াল করলেন নাকি উনি পিটিশনার ছিলেন ইত্যাদি বা তারচেয়েও বড় প্রশ্ন এসব করে হল টা কী? কিন্তু ওই যে হাতে লেগে না বাউন্ডারি পার করে আবার ভেতরে আসা বলে গোল হয়েছে কি না বিতর্ক চলতে থাকলেও, সেই মুহুর্তে গোল তো হয়েই গেছে। হ্যাঁ পারসেপশন ম্যাটারস, মানুষ যা বুঝেছে তা বুঝেছে। আর সেখান থেকেই প্রশ্ন হল মাত্র তিন মাস পরে রাজ্য বিধানসভার ভোটে এই ঘটনা কতটা প্রভাব ফেলবে? কী হবে রাজ্য বিধান সভায়? এর আগেই এসে গেছে ইন্ডিয়া টুডের মুড অফ দ্য নেশন। ওনাদের হিসেব বলছে ২০২৪ এ ২৯ টা আসন পেয়েছিল তৃণমূল, একটা কংগ্রেস আর ১২ টা বিজেপি, ওনাদের ট্র্যাকার জানাচ্ছিল আগস্ট ২০২৫ এ তৃণোমূলের গ্রাফ নাকি ৩১ এ উঠে গিয়েছিল, বিজেপি নাকি নেমে গিয়েছিল ১১ তে আর কংগ্রেসের সবেধন নীলমণি আসনটাও নাকি চলে গিয়েছিল। আর তার পরে এই জানুয়ারি মাসে ওনাদের সমীক্ষা বলছে ২৮ টা আসন পাবে তৃণমূল, ১৪ টা পাবে বিজেপি, কংগ্রেস শূন্য। হ্যাঁ ওনারা সমীক্ষা লোকসভা আসন ধরেই করেন, তাতে তৃণমূলের একটা আসন কমছে, দুটো আসন বাড়ছে তৃণমূলের আর কংগ্রেসেরও একটা আসন কমে শূণ্য হচ্ছে। কিন্তু কেবল এটাই নয় ওনারা একটা ভোটের হিসেবও দিয়েছেন, এন ডি এ ৪২% ভোট পাবে আর ইন্ডিয়া জোট নাকি ৫৪% ভোট পাবে।
যদিও এটা খুব পরিস্কার যে এখানে ইন্ডিয়া জোট হবে না, সিপিএম হুমায়ুন কবীর জোট হতেই পারে, মন বোঝাবুঝি হলে কিন্তু অন্তত সিপিএম তৃণমূল কংগ্রেস জোট তো হবে না। হ্যাঁ এখনও তৃণমূল কংগ্রেস জাতীয় কংগ্রেস জোট তো হতেই পারে। ওনাদের এই হিসেব কোন কোন ভোটকে ধরে তা জানা নেই। কিন্তু এটা পরিস্কার যে ইন্ডিয়া টুডে – সি ভোটারের সমীক্ষায় একটা ট্রেন্ড খুব পরিস্কার সেটা হল এবারেও নবান্ন বিজেপির দখলে আসছেনা, বাংলা এবারেও অধরা থেকে যাবে। হ্যাঁ ইন্ডিয়া টুডের মুড অফ দ্য নেশন এটাই বলছে। যদি একটা লোকসভা আসনে গড়ে ৭ টা বিধানসভা আসন ধরে নিই তাহলে ২০২৬ এর নির্বাচনে ইন্ডিয়া টুডের মুড অফ বেঙ্গল বলছে ১৯৬ টা আসন পাবে তৃণমূল আর বিজেপি পাবে ৯৮ টা আসন। এই পর্যন্ত ঠিকই আছে, কিন্তু এবারে শুরু হবে সমস্যাটা। এখনও নির্বাচন শুরু হতে সময় আছে তিন মাস তো বটেই, ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ ঘোষণা হবে, এপ্রিল জুড়ে ভোট হবে। তার আগে এই মুড অফ দ্য নেশন আসলে নির্বাচনের সুর টা বেঁধে দিল, হ্যাঁ সেই তৃতীয় সুর, ষষ্ঠ সুর গুপী চললো অনেক দূর। এবারে আরও অনেক কিছু হবে যা গড়াতে থাকা বলকে অ্যাক্সিলারেট করবে, মানে গতি যোগাবে। গতকাল রাতে মেদিনীপুরের এক কমরেড, যোগাযোগ আছে হোয়াটস অ্যাপে, লিখলো, ভোটের রেজাল্ট বেরিয়ে গেল। হ্যাঁ বহু বিজেপি, বাম কট্টর সমর্থকরা মুখ ফুটেই বলছেন যে দিদিমণি মাস্টার স্ট্রোক দিয়ে দিলেন, আমি বলিকি এটাকে মাস্টার স্ট্রোক বলে রাখবেন না এরপরেও আরও অনেক স্ট্রোক বাকি আছে। অনেকে বলেন বাংলাতে নাকি সব কমিটেড ভোটার, এক্কেবারে কমিটেড, ভোটের বহু আগেই ভোট হয়ে যায়। কথাটা ঠিক আবার ভুল। কমিটেড মানে এমন নয় যে সেই ভোট আর কোথাও পড়বে না, তা না হলে ভাবুন না যে সিপিএম বা বামেরা ৪০/৪২% ভোট তো পেতই তারা আজ ৭% এ ঠেকেছে। মানে ওই সময়ের জন্য ওই বিরাট সংখ্যক ভোটারেরা কমিটেড ছিল বামেদের কাছে, কিন্তু তারা শিবির পাল্টেছে, বিজেপির কমিটেড ভোটার? কত হবে খুব বেশি হলে ১১/১২/১৩% বাকিটা কারা? এখন কমিটেড, কিন্তু সময় সুযোগ আর কারণ থাকলেই তারাও ধাঁ হবে কিচ্ছুটি না বলে। এক্কেবারে সেরকমই তৃণমূলের ভোট বলে যা বলা হয় তা এই মুহূর্তে তৃণমূলের কমিটেড ভোট, কিন্তু সে কমিটমেন্ট ব্যাঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট নয়, উবে যেতেই পারে মুহূর্তে। তাহলে? তাহলে আমাদের রাজ্যের ভোটের প্যাটার্নটাকে বুঝতে হবে। আমাদের রাজ্যে মানুষ একটা দীর্ঘ সময় ধরে কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে, স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে গ্রামে গঞ্জে ডিস্টিক্ট বোর্ডে রেশন থেকে কেরোসিনের বিলি বন্দোবস্তের মালিকদের সঙ্গে থেকেছে। দুম করে কোনও একদিকে ঝুলে যায় নি। বামেরা লড়েছে, নানান লড়াই, সেই লড়াই এ গরীব মানুষদেরকে কাছে পেয়েছে, প্রান্তিক মানুষ, সংখ্যালঘু মানুষ ধীরে ধীরে বামেদের দিকে এসেছে আর ৬৭ /৬৮ থেকে তারা ধীরে ধীরে বামেদের ভোট দেওয়া শুরু করেছে আর শেষমেষ সেই ৫২ র পরে কংগ্রেসকে এক্কেবারে সরিয়ে ২৫ বছর পরে এসেছে বামেরা। খেয়াল করে দেখুন তারপর থেকে বামেরা আছে কিন্তু নেই, ক্ষয়েছে, সমর্থন খুইয়েছে, কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূলের নানান আন্দোলন দেখেছি আমরা, বন্ধ, অবরোধ, লাঠি গুলি।
কলকাতার বস্তি, শহর মফস্বলের গরীব মানুষজনেরা তৃণমূলের দিকে গেছে। তারপরে জমির আন্দোলনের এক পর্যায়ে গ্রামের গরীব মানুষ, সংখ্যালঘু মানুষের ভোট গেছে তৃণমূলের দিকে। ৩৪ বছর পরে ২০১১ তে পরিবর্তন। তৃণমূল এসেছে। তারমানে ১) বাংলাতে পরিবর্তন হতে প্রচুর সময় লাগে। ২) ভোটাররা কমিটেড থাকে এক বিরাট সময় ধরে। ৩) ক্ষমতা হারানোর পরে সেই দল বাংলার রাজনীতিতে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। ৪) যতক্ষণ না রাজ্য জুড়ে একটা হাওয়া তৈরি হয় যে ক্ষমতাশীন দল হারছেই, ততক্ষণ পর্যন্ত কমিটেড ভোটারেরা শাসক দলের সঙ্গেই থাকে। ৫) বাংলার রাজনীতিতে লোকসভার নির্বাচনে পিছিয়ে পড়ার পরেই একমাত্র বিধানসভায় শাসক দল হেরেছে। জরুরি অবস্থা জুড়ে শহর গ্রাম জুড়ে কংগ্রেস দলের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে ঠেকেছিল, ৭৭ এ লোকসভা নির্বাচনে যেই তারা গোহারান হারলো, সেদিনেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল ভবিষ্যৎ, বিধানসভাতে কংগ্রেস হেরে ভুত হয়েছিল। খেয়াল করে দেখুন ২০০৯ এর কথা, লোকসভাতে বামেরা দক্ষিণবঙ্গে মুছে গিয়েছিল, তৃণমূল জোট পেয়েছিল ২৬ টা আসন, বিজেপি ১ টা আর বামেরা ১৫ টা। ২০১১ তে বিধানসভাতে সেই হারের ছবিই আমরা দেখেছিলাম। কেন এমনটা হয়? ধরুন কেরালা। ২০১৯ এর লোকসভাতে বামেরা হেরেছিল, ৭ টা আসন খুইয়ে ১ টাতে জিতেছিল, কংগ্রেস জিতেছিল বাকি ১৯ টা আসন। ২০২১ এ বিধানসভাতে কিন্তু বামেরা ৯৯ টা আসন পেয়েছিল, কংগ্রেস মাত্র ৪১ টা।
ধরুন ২০২৪ এ মহারাষ্ট্রে লোকসভা নির্বাচনে ইন্ডিয়া জোট ৩০ তা আসন পেয়েছিল, এন ডি এ ১৭ টা। কিন্তু বিধানসভা ২০২৪ এর নির্বাচনে কমাস পরেই বিজেপির নেতৃত্বে মহায়ুতি ২৩৫, মহারাষ্ট্র বিকাশ আগাড়ি মাত্র ৫০ টা আসন পেয়েছিল। হ্যাঁ বহু রাজ্যে এমন হয়। আমাদের রাজ্যে লোকসভাতে খুব ভালো ফল করার পরে বিধানসভার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে, এমন নজির নেই। সেই হিসেবে ২০২৪ এর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের জেতা ২৯ টা আসনই বলে দেয়, দু বছর পরে তার বিরাট পরিবর্তন হবার কোনও সম্ভাবনা এখনও পর্যন্ত নেই। কিন্তু ইন্ডিয়া টুডের মুড অফ দ্য নেশন এ তৃণমূলের কিছুটা কম ভোট পাবার কথা বলা আছে, যদিও ওনারা লোকসভার আসনগুলো, তার ফ্যাক্টরগুলো ধরেই সমীক্ষা করেছেন, তবুও মোটের ওপরে বিজেপির ২/৩% ভোট বাড়ার কথা বলেছেন, তৃণমূলের ১% হলেও ভোট কমার কথা বলেছেন। ওনাদের হিসেব বাংলার ক্ষেত্রে অন্তত একবারও মেলেনি, ২০২১ তো যা তা হয়েছিল, তবুও ওনাদের এই হিসেব সাধারণ ভাবে তৃণমূল আবার ক্ষমতায় আসছে এটাকে তুলে ধরছে। হ্যাঁ এই যে তৃণমূল জিতছে, এই প্রচার, এই পার্সেপশন, এই সমীক্ষার ফলাফলই তৃণমূলকে নির্বাচন আসতে আসতে আরও খানিকটা এগিয়ে দেবে। এই ধরণের খানিকটা বিশ্বাসযোগ্য সমীক্ষা আর সাধারণ মানুষের পার্সেপশনের কথা বলছি, যখন সেখানেই একটা ধারণা তৈরি হয় যে তৃণমূল জিতবে, জিতছে, তখন সেটা জয়ের ধারণাকে অ্যাকসিলারেট করে, ফলে মোমেন্টাম আরও বাড়তে থাকে, যত নির্বাচন কাছে আসে, ততই সেটা বাড়ে। হ্যাঁ নির্বাচনের এখনও তিন মাস বাকি, তৃণমূল জিতছে এই ধারণাটা ছড়াচ্ছে। গতকাল এই ধারণাটাই আরও বড় করে সারা বাংলাতে ছড়িয়ে গেল, তৃণমূল সমর্থক কর্মীরা উচ্ছসিত। এতে কী হবে? বাংলার রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লক্ষ লক্ষ পেটের লড়াই, নানান স্বার্থ দলীয় আনুগত্যকে ধরে রাখে। হ্যাঁ ছোট ব্যবসায়ী থেকে করে কম্মে খাওয়া মানুষ যখন বোঝে আসছে সেই তৃণমূল, তখন তারা কমিটেড থেকে যায়। যেমনটা তারা থেকেছিল আগের বা তারও আগের জামানাতে। এই ফিনমেনা গোটা ভারতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। রাজনীতি এখানে পেটের ভাত, আয়ের রাস্তা কে নিশ্চিত রাখার উপায়। আসবেই সিপিএম তাই কেবল অটোর ওপরে ঝান্ডা নয়, মিছিলেও চলো, ভোটও দাও, ভোট দেওয়াও। আসবে না? ঝান্ডা টা রাখো, রাতের বেলায় যারা আসতে পারে তাদের কাছে আনুগত্য বেচে দাও। কত মানুষ? লক্ষ লক্ষ মানুষ, বিভিন্ন পেশার মানুষ, বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ। সবটাই কি তাই? না তা তো হয় না, কিন্তু ডিসিসিভ এক অংশ হল এই ভোতার যারা জিততে পারে এমন দলের সঙ্গেই থাকে। এবং মাথায় রাখুন বাংলার নির্বাচনের হাওয়া খুব দ্রুত বাঁক নেয় না, কিন্তু বাঁক নিলে তাকে আটকানোও যায় না। ২০১৯ এ একটা ছোট্ট সময়ের জন্য হালকা উলটো হাওয়া বয়েছিল বটে, তবে তা জোর পাবার আগেই ২০২১ এ ধুয়ে মুছে গিয়েছিল। আর গতকা যে মমতা ম্যাজিক দেখলেন, সেই মমতা ম্যাজিক এখন থেকে এপিসোডে এপিসডে আসবে, আম জনতার ধারণা আরও গাঢ় হবে, মধ্যে হঠাৎ কোনও বড় সড় ঘটনা না ঘটলে, রাজনীতির চাকা এভাবেই গড়ালে বিজেপির পক্ষে গতবারের আসন ধরে রাখাও কঠিন হবে। আর সিপিএম? একটা বা দু টো পেলে বাজী ফাটবে, চার পাঁচটা পেলে বিজয়োৎসব।







