ছোটা-মোটা ভাই, মানে আমাদের অমিত শাহজি তো ইলেকশন মোডেই থাকেন ৩৬৫ ইন্টু ২৪ ঘন্টা। তো তিনি এখান বাংলা নিয়েই ব্যস্ত, তো সেই প্রচার করতে এসে বলেছেন যে, ২০২১-এ ৩৮ শতাংশ ভোট ছিল বিজেপির, সেটাকে ৪৫ শতাংশ করে তুলতে হবে। বেশি নয় ৭ শতাংশ বাড়াতে হবে, আর সেটা হলেই তকতা পলট, পালটে যাবে বাংলা। এক্কেবারে হিসেবটা মনে পড়ছে না, কিন্তু বেশ মনে আছে ‘কোনি’ ছবিতে এরকম একটা হিসেব দিয়েছেন সাঁতার বোর্ডের এক কর্মকর্তা, বলেছিলেন, “মাত্র ২৮ সেকেন্ডের গ্যাপ ছিল, ওটা আরেকটু খাটলেই হয়ে যাবে”। ক্ষিদ্দা, মানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একটু কেশে এবং হেসে জানান দিয়ে বলেছিলেন, ওই ৮ সেকেন্ডের মধ্যে আরও ১৮ জন প্রতিযোগী আছে। হ্যাঁ, অনেক সময়েই শুনতে কম লাগে, মাত্র ৭ শতাংশ ভোটের তফাৎ। কিন্তু এমনিতে ৭ শতাংশ ভোট এক বিরাট ব্যাপার। ৭ কোটি ভোটারের ৭ শতাংশ, মানে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ। ছোটা মোটা ভাই সে হিসেব কি জানেন না? খুব জানেন। আসলে তিনি ভোকাল টনিক দিচ্ছেন, এর আগের বার যেমন ‘অবকি বার দো’শ পার’ বলেছিলেন, এবারে বললে লোক হাসবে, তাই এবারে একটু বদলে পার্সেন্টেজের আড়ালে একই কথা বলতে চাইলেন, ৩৮ শতাংশ ভোটকে বাড়িয়ে ৪৫ শতাংশ করে ফেলতে হবে, এটাই রাজ্য বিজেপির কাছে দেওয়া টাস্ক। তার জন্য কত হাজার ছোট সভা করতে হবে, কতবার মোদিজি আসবেন, কত শ’কোটি খরচ করা হবে, কত লক্ষ কারিয়াকর্তারা মাঠে নামবেন, কত কোটি টাকার বিজ্ঞাপন চলবে সমাজ মাধ্যমে। এসব প্রায় ফাইনাল। টার্গেট ৪৫ শতাংশ ভোট, বলেছেন অমিত শাহ। সেটাই বিষয় আজকে, ৩৮ শতাংশ ভোট ছিল, ২০২৬-এ জিততে হলে বিজেপির চাই ৪৫ শতাংশ ভোট। সম্ভব?
বিহারে ২০২০-তে ৩৭ শতাংশ ভোট ছিল এনডিএ-র, ২০২৫-এ সেটা ৯ শতাংশ বেড়ে ৪৬ শতাংশ হয়ে গিয়েছে। ২০১৬-তে এই বাংলাতেই বিজেপির ভোট শেয়ার ছিল ১০.১৬ শতাংশ, আর ২০২১-এ এই বাংলাতেই বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির সেই ভোট বেড়ে হয়েছিল ৩৮ শতাংশ, মানে ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি। তো ৫ বছরে ২৮ শতাংশ বেড়ে যেতে পারলে, এবারে গত বিধানসভার চেয়ে ৭ শতাংশ ভোট বাড়ানো কি অসম্ভব? ভোট বাড়ার হিসেব যদি আমরা দেখি, তাহলে তা বিভিন্ন রাজ্যে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকমের, কোনও নির্দিষ্ট ফরমুলা ফলো করেনি। মানে ৭ শতাংশ ভোট বাড়া অসম্ভব, এমন নয়। কিন্তু ভোট বাড়ার পিছনে সলিড রিজন, যথেষ্ট কারণ থাকাটা খুব জরুরি। এটা ওই মুনমুন সেনের সেই বিজ্ঞাপনের মতো, ‘আমি তো এমনি এমনি খাই’-এর ব্যাপার নয়। ভোট বাড়ে বা কমে, কিন্তু তা এমনি এমনি কিন্তু হয় না। তার পিছনে যথেষ্ট কারণ থাকে। ধরুন এই বাংলাতে ১০ শতাংশ ভোট পাওয়া বিজেপি এক লাফে ৩৮ শতাংশ ভোট কীভাবে পেল? কারণটা দেখা যাক।
আরও পড়ুন: Aajke | হিরো বন গয়া হুমায়ুন কবীর
আসল কারণটা সেই ২০১৬ সালের বিরোধী ভোটের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। সেবারে তৃণমূল পেয়েছিল ৪৪.৯ শতাংশ ভোট, বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট যাতে কংগ্রেসও ছিল, তারা পেয়েছিল ৩৯ শতাংশ ভোট, বিজেপি ১০.৭ শতাংশ ভোট। এবারে ২০২১-এ রেজাল্টটা দেখলেই বোঝা যাবে যে, বিরোধীদের ভোট এক্কেবারে উলটে গিয়েছে, মানে তৃণমূল তাদের ভোট বাড়িয়ে ৪৮ শতাংশ পেয়েছিল, বিজেপি ১০.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৮ শতাংশ হল আর ৩৯ শতাংশ থেকে কমে ওই বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট পেল ১০ শতাংশ। মানে কী? মানে খুব পরিস্কার, মূলত সিপিএম-এর ভোট যা কমল, সেটা চলে গেল বিজেপির খাতায়। হ্যাঁ, সেবারে সিপিএম-এর ভোট ট্রান্সফার হয়েছিল বিজেপিতে, সেই জন্যই একলাফে ২৮ শতাংশ ভোট বৃদ্ধি। তো এবারে আমাদের ছোটা মোটা ভাই ৩১ জানুয়ারি শিলিগুড়িতে তাঁদের কর্মীসভায় বলেছেন, বিজেপির ভোট বাড়িয়ে ৩৮ শতাংশ থেকে ৪৫ শতাংশ করতে হবে। এমনিতে ৪৫ শতাংশ করলেও ৩ শতাংশের গ্যাপ থেকেই যাবে, সেটা মাথায় ছিল না, পরে মাথায় আসার পরে বক্তৃতা শেষ হবার একটু আগে জানিয়েছেন যে, ওটা প্রথম ধাপ, তারপরে ওটাকে ৫০ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। আসলে সেদিন ওনাকে ৪৫-এ পেয়েছিল, সেদিনেই বলেছেন যে, সরকারে এলে ৪৫ দিনের মধ্যেই বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হবে। সে থাক, মোদ্দা হিসেব তাহলে দাঁড়ালো ৪৫’ও নয়, ৪৮-এর উপরে যেতে হবে, মানে ১০ শতাংশ ভোট বাড়াতে হবে। সেই ভোট আসবে কোথা থেকে? বাম ভোটের আরও ক্ষয়? কত ক্ষয়? আছেই তো ৭ শতাংশ। কংগ্রেস ভোটের ক্ষয়? সে ভোট তো মূলত মালদা মুর্শিদাবাদের সংখ্যালঘু ভোট, তা বিজেপির দিকে যাবে কেন? বাকি রইল তৃণমূল। তো সেই ভোট অ্যান্টি-ইনকমব্যান্সিতে কমে বিজেপির দিকে যাবে। সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব। কিন্তু গত ক’বছরের লোকসভা ভোট বা বিধানসভা ভোটের হিসেব দেখলে, এমনকি ২০১৯, যেবারে তৃণমূলের ফলাফল খারাপ হল, সেবারেও কি তৃণমূলের ভোট আগের থেকে কমেছে? না কমেনি, সামান্য হলেও বেড়েছে। মানে সেই ২০১১ থেকে তৃণমূল তাদের ভোট সামান্য হলেও বাড়িয়েছে প্রতিটা নির্বাচনে।
অন্যদিকে বিজেপি ভোট বাড়িয়েছিল ২০১৯-এ, কিন্তু তারপর থেকে সামান্য হলেও তাদের ভোট কমেছে। তাহলে কেন কমবে? দুর্নীতি? ২০১৯-এ বিরাট দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, হাতে করে টাকা নেওয়ার ভিডিও বের করেছিল বিজেপি। ২০২১-এও দুর্নীতির অভিযোগ তো ছিল। ২০২৪-এ পার্থ চ্যাটার্জি জেলে, শিক্ষা দফতরের আমলারা জেলে, বীরভূমের কেষ্ট মোড়ল জেলে, তৃণমূলের ভোট বেড়েছে। মানে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ভুরিভুরি অভিযোগ থাকলেও সেটাকে পাত্তাও দেয়নি পাবলিক। তাহলে কমবে কেন? সংখ্যালঘু ভোট কমবে? এটা জেনেও যে তৃণমূল সরে গেলে বিজেপি ক্ষমতায় আসবে, সংখ্যালঘুরা অন্য কোথাও ভোট দেবেন? আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, এবারে বিজেপিকে জিততে হলে তাদের ভোট শতাংশকে ৩৮ থেকে কম করে ৪৮-এ নিয়ে যেতে হবে। সেটা কী সম্ভব?
৩৮ শতাংশ থেকে ৪৮ শতাংশে ভোট নিয়ে যাওয়াটা অসম্ভব নয়, কিন্তু তার জন্য যে সাবজেক্টিভ কনডিশনটা বিজেপির থাকাটা জরুরি, তা বিজেপির কাছে নেই। তার সবথেকে বড় কারণ হল, তারা পরীক্ষাতে বসার আগেই দান ছেড়ে দিয়েছেন, জানিয়েই দিয়েছেন, এই বংলার ৩১ থেকে ৩২.৩৩ শতাংশ ভোট আমাদের দরকার নেই। বাকি ৬৮ শতাংশ ভোটের মধ্যে ৭৫ শতাংশ ভোট পাওয়াটা আজকের দিনে বিজেপির পক্ষে প্রায় অসম্ভব। কারণ (১) বিজেপির কোনও বিকল্প মুখ নেই, যিনি মমতার বিকল্প হতে পারবেন, (২) বিজেপির সেই সংগঠন নেই, যা দিয়ে তারা নির্বাচনে নামবে, (৩) সিবিআই, ইডি আর অন্য এজেন্সিগুলোকে দিয়েও বিজেপি এমন কোনও প্রমাণ এনে হাজির করাতে পারেনি, যা আপ-এর কেজরিওয়ালের মত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্বাসযোগ্যতাকে শূন্যে নামিয়ে নিয়ে যায় বা যেতে পারে। সব মিলিয়ে বিজেপির গতবারের ওই ৩৮ শতাংশ ভোট ধরে রাখাটাই এখন বেশ বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে হচ্ছে।
দেখুন আরও খবর:








