জ্ঞানেশ কুমার এলেন, হুবহু রাজনৈতিক নেতাদের মতো হাত নাড়লেন, কালীঘাটে গেলেন, তেমন বড় রাম মন্দির নেই বলে বা আদেশ এসেছে ‘জয় শ্রী রাম’-এর বদলে এখন ‘ব্যোম কালী’। তো কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম করে অভ্যস্থ জ্ঞানেশ বাবু কালীঘাটে গেলেন, বেলুড় মঠে গেলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠকের পরে জানিয়ে দিলেন বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই নাকি ওনার সঙ্গে একমত, জানালেন না সেই বেশির ভাগেরা কারা, আমলাদের সঙ্গে বৈঠকের সময়ে এ রাজ্যের আমলাদের ধমকালেন এবং শেষমেশ একটা অত্যন্ত ম্যাড়ম্যাড়ে প্রেস কনফারেন্সে বসে জানালেন রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা নিয়ে আপাতত তাঁর কিছু বলার নেই, তার পরে রুটিন মাফিক কিছু কথা, যা আমরা প্রতিবার ভোটের আগে শুনি। ওয়েব কাস্টিং হবে, বুথ থেকে কতটা দূরে রাজনৈতিক দলের ক্যাম্প হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ওদিকে মামলা উঠল সর্বোচ্চ আদালতে, মানুষের নাম কাটা গিয়েছে, মানুষ আতঙ্কে আছেন, মানুষ আত্মহত্যা করছেন, আপিলের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন সাধারণ মানুষ, এখনও ৫০ লক্ষ বিচারাধীন ভোটার, কেবল তাই নয়, যে দশ লক্ষের বিচার করলেন হুজুর মাই বাপেরা, তাঁদের মধ্যে কে থাকলেন? কে বাদ গেলেন? এখনও আমরা জানি না, যাঁরা বিচারাধীন তাঁরাও জানেন না। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতে কি প্রশান্তি, কোথাও উত্তেজনার রেশ মাত্র নেই, হবে হবে, হবে হবে শোনা গেল, আর তার সঙ্গে কিছু আশ্বাস, এই মুহূর্তে সেটাও যথেষ্ট, খড়কুটো ধরেও তো মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে। সেটাই আমাদের বিষয় আজকে, মামলা হল সুপ্রিম কোর্টে, নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ এল আর গেল, ভোটার কী পেল?
নির্বাচন কমিশন যা জানিয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের কিছু এসে যায় না, রাজনৈতিক দলের বুথ থেকে কত দূরে হবে? এটা তার কোন কাজে লাগবে? রাজ্য শুদ্ধু মানুষজন জানতে চাইছেন, ডিলিটেড ভোটারেরা আপিল করেছেন, তাদের কবে শুনানি হবে? এখনও ৫৫ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার নেই, কিন্তু তাঁরা নাগরিক, তাঁদের কী হবে? না নির্বাচন কমিশিনের ফুল বেঞ্চ এসব কিছুই বলেনি। কেন? কারণ ওনারা একটা নির্দিষ্ট ছকে খেলাটা শুরু করে এখন এক্কেবারে ফেঁসে গিয়েছেন। এখন তাদের ঠিক কী করলে আরও মুখ পুড়বে না, সেটা ঠিক করাটাই প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ, (১) ভোটের আগের দিন পর্যন্ত চলবে এই যাচাই পর্ব৷ ধরা যাক, শেষ দিনে ৮ লাখ লোকের নাম বাদ পড়ছে৷ তখন সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখা হবে। মানে এক্কেবারে সোজা হুঁশিয়ারি, ৮-১০-২০ লাখ মানুষকে বাদ দিয়েই ভোট করিয়ে নেওয়া যাবে এমন নয়। (২) হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি নির্বাচন কমিশনকে সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবেন। মানে এবার থেকে বিচার চলবে, পাশাপাশি সেই তালিকা প্রকাশ করা হবে। মানে আপনি বাদ পড়লেও আবার আপিল করার সুযোগ থাকবে। (৩) ‘বিচারাধীন’ ব্যক্তিদের নথি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করবেন৷ হাইকোর্টেরই প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবং আরও দুই বিচারপতি ও বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত হবে এই ট্রাইব্যুনাল৷ কোনও ব্যক্তির নাম বাদ গেলে, তিনি যদি আপিল করেন, সে ক্ষেত্রে শেষ কথা বলবে এই ট্রাইব্যুনাল, এক্কেবারে শেষ কথা, নির্বাচন কমিশন নয়, এই ট্রাইবুনাল জানাবে আপনার নাম ভোটার তালিকাতে থাকবে কি থাকবে না। হ্যাঁ, এটাকেই গতকাল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দরজা খানিকটা খুলেছে, এরকম বলেছিলেন।
আরও পড়ুন: Aajke | নতুন সমীকরণ! কংগ্রেস–তৃণমূল কংগ্রেস কি আরও কাছাকাছি, আরও পাশাপাশি?
না, আতঙ্ক শেষ হয়নি, রাষ্ট্রপতি শাসনের সম্ভাবনা দূর হয়নি, কিন্তু সবটাই ওই জ্ঞানেশ বাবু উনিজির নির্দেশ মতোই চালাবেন, তেমনটাও নয়। সেদিন নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের সময়ে ওই জ্ঞানেশবাবু তৃণমূল সদস্যদের বারবার বলেছেন, আপনারা তো আদালতে গিয়েছেন। হ্যাঁ, বিরোধী দলের নেতা কর্মীরা আদালতে গিয়েছেন, কারণ নির্বাচন কমিশন এক স্বৈরাচারী চেহারা নিয়ে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে, গণতান্ত্রিক অধিকার বজায় রাখার জন্য তারা আদালতে গিয়েছেন, তাতে ওনাদের গায়ে ছ্যাঁকা লেগেছে, খুব স্বাভাবিক। ওনাদের প্রভুরা বলেছেন, এক কোটি ২৫ লক্ষ বাদ দিতে হবে, ওনারা জো হুজুর বলে মাঠে নেমেছিলেন, এখন মাঠ ছেড়ে দিয়েছেন এমন তো বলা যাবে না, কিন্তু থমকে দাঁড়িয়েছেন। কাজেই নির্বাচন কমিশনের এই ফুল বেঞ্চ এল আর চলে গেল তাতে মানুষের কোনও সুরাহা হয়নি, এটা ঠিক, কিন্তু সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভোটার তালিকা থেকে এক্কেবারে নাম কেটে দেবার শেষ অধিকার এখন আদালতের হাতে, আদালতের এই নির্দেশ কি আপনাদের কিছুটা হলেও স্বস্তি দিচ্ছে? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
পাড়ার ক্যাটারারকে ডেকে যদি জিজ্ঞেস করেন, আপনার ওই চিকেন-মাছ দিয়ে প্লেটের দাম কত? উনি জিজ্ঞেস করবেন আপনার আয়োজন কতজনের? আপনি ৫০০ বললে একটা রেট হবে, ১৫০০ বললে আরেকটা রেট। একেই বলে ব্যাক ক্যালকুলেশন। মানে আগে অংকের উত্তরটা জেনে নিয়ে অঙ্ক কষা। তো এখানেও ওই যে শান্তিকুঞ্জের মেজখোকা বলেছেন, দেড় কোটি মুসলমান আর রোহিঙ্গাদের বাদ দিতেই হবে, এবারে নির্বাচন কমিশন পুরাতন অনুগত ভৃত্যের মতো ব্যাক ক্যালকুলেশন করে মাঠে নেমেছিলেন, এখন বুঝতে পেরেছেন মাঠ পিছিল, সামনে ডিফেন্স লাইন বেশ স্ট্রং, হ্যাঁ, থমকে দাঁড়িয়েছেন। দু’মাস বাকি নেই নির্বাচনের, ওনারা আর যাই করুক মহারাষ্ট্র, বিহার, হরিয়ানার মতো খোলা মাঠে গোল দিয়ে চলে যাবেন, সেটা এখানে হবে না, সেটা অন্তত বুঝে গিয়েছেন।
দেখুন আরও খবর:








