হ্যাঁ বন্দে ভারতে (Vande Bharat Sleeper)চড়বো, টিফিন কৌটতে কষা মাংস নিয়ে তারপরে ওনাদের সাপ্লাই করা ভাত বা পরোটার সঙ্গে জমিয়ে খাবো, হ্যাঁ পেঁয়াজ লঙ্কাও নেবো সঙ্গে। কিম্বা মিলটাই অফ করে দেবো, হট পটে ওই লুচি মাংস, বাসন্তি পোলাও, কাতলা কালিয়া নিয়েই চড়বো ট্রেনে। হ্যাঁ মোদিজির সাধের লাউ থুড়ি সাধের বন্দে ভারতে লাঞ্চ ডিনারের মেনু হল বাঙালি মেনু: ১) বাসন্তী পোলাও ২) ছোলার ডাল ৩) মুগ ডাল ৪) ঝুরি আলু ভাজা ৫) ছানা বা ধোঁকার ডালনা ৬) লাবড়া ৭) সন্দেশ, ৮) রসগোল্লা। হলফ করে বলতে পারি ওই ছানার ডালনাটা আসলে কাঁচা পনির আর ধোঁকার ডালনাটা ডালের বড়া। কেন একজন বাঙালি ট্রেন সফরে উঠে এই খাবারটা খাবে বলুন তো? বাবার শ্রাদ্ধ করতে তো যাচ্ছি না, তাহলে কেন? এবং ওই কামাখ্যা থেকে ফেরার সময়ে নাকি অসম মেনু, ১) সুগন্ধী জোহা ভাত ২) মাটি মাহর ডালি ৩) মুসুর ডালি ৪) মরসুমি সব্জির ভাজাভুজি ৫) নারকেল বরফি । মানে? ডালের জায়গাতে ডালি বললেই আমাদের সোনামুখ করে খেয়ে নিতে হবে? সাধারণ এক্সপ্রেস ট্রেনের চেয়ে কমবেশি ১০০০ টাকা বেশি ভাড়া দিয়ে মাছে ভাতে, মুর্গি বিরিয়ানিতে বাঁচা বাঙালি কিম্বা অহমিয়াকে কেন এই অত্যাচার সইতে হবে? কেন আমরা এঁচোড়ের বিরিয়ানি খাবো? কেন আমরা কাঁচা পনিরের ঝোল খাবো? এরকম ভাবার কিছুই নেই যে এটা ঐ রেলের রিজিওনাল ম্যানেজার বা কোনও এক মন্ত্রী সান্ত্রীর ইচ্ছে অনুযায়ী হচ্ছে। সেটা হলে তো একদিন রেল অবরোধ করেই ব্যাপারটাকে শুধরে নেওয়া যেতো, বিষয়টা অনেক গভীরে, অনেক উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি এক রাজনৈতিক গ্রান্ড প্ল্যান, এক পরিকল্পনার অঙ্গ। সেটাই আমাদের বিষয় আজকে, হাওড়া থেকে কামাখ্যা, মোদিজির বন্দে ভারতে কেবল নিরামিষ। বিজেপি বাঙালি বিরোধী।
ক্রোনলজি সমঝিয়ে, ক্রোনোলজিটা বুঝুন। বন্দে ভারত স্লিপার কোচ চালু হচ্ছে কবে? নির্বাচনের ঠিক ক মাস আগে। সারা দেশে বিজেপি শাসিত ঘাসফুস খাওয়া লোকজন আছে তো, কিন্তু চালু হল কোথায়? বাংলা থেকে অসমে, দুটো রাজ্যের নির্বাচন আগামী এপ্রিল মে তে। চালু করলেন কে? কে আবার? দুর্ঘটনা হলে রেলমন্ত্রী, ট্রেন চালানোর সবুজ ঝান্ডা তো দেখাবেন মোদিজি। এবং দেখুন খুব ভেবে চিন্তেই ২৪ ঘন্টার ট্রেন জার্নিকে আমিষ মুক্ত রাখা হল, যাকে বলে শুদ্ধ শাকাহারী ভোজন। হ্যাঁ সেটাই লেখা আছে ওই প্যাকেটে, শুদ্ধ শাকাহারী ভোজন। মানে খুব পরিস্কার, আমিষ খাবার হল অশুদ্ধ। কতটা ছোটলোকপনা থাকলে একটা ৯৯.৪৩% আমিষভোজী বাংলা থেকে ৯৯.৭৯% আমিষভোজী অসমে যাচ্ছে এমন একটা ট্রেনে কেবল নিরামিষ খাবারের ব্যবস্থা করা যায়? চেপে দেখুন কোন এক অজানা কারণে যাঁরা খাবার দিচ্ছেন, তাঁদের ৮০/৮৫% কর্মী বাঙালি নন, অহমিয়াও নন। আসলে বাংলা দখল করে এই বাংলাতে কী লাগু করতে চান মোদিজি? বাঙালি হিন্দুদের বিয়ে দেখেছেন? আগে শালগ্রাম শীলা স্থাপন হয়, মানে নারায়ণ স্থাপিত হন, তারপর উপবাস করা মহিলা আর পুরুষ আর কন্যা সম্পদান যিনি করবেন তাঁরা বসেন। সেই বিয়ের মন্ডপের পাশেই খাবারের প্যান্ডেল বা ব্যবস্থা, যেখানে মাছ মাংস চিংড়ি কাতলা চিকেন মাটন সব খাওয়া হয়। জানেন না? ন্যাকামো হচ্ছে? বাঙালি হিন্দুর বিয়ে শুরু হয় কী দিয়ে? মাছের মুখে হলুদ মাখিয়ে তত্ত্ব পৌঁছয় মেয়ের বাড়িতে, আমাদের দুর্গাপুজোয়, এখনও পাঁঠা বলি হয় আর সেই মাংস প্রসাদ খান এমনকি ব্রাহ্মণ বিধবারাও। ঠাকুর দালানে বসে সেই মাংস ভাত খাওয়া হয় পাত পেড়ে, কে নেই সেই দুর্গামন্ডপে? কোন দেবতা হাজির নেই? বাংলার মাঠে গীতা পাঠ হচ্ছে, কাকে গীতা শুনিয়েছিলেন কৃষ্ণ? অর্জুন কে, তিনি ক্ষত্রিয় ছিলেন, ক্ষত্রিয়রা নিরামিষ খেতেন? আর এত শত যুক্তিই বা কী দরকার? কোন যুক্তিতে এক পাবলিক প্লেস কে আমিষ বা নিরামিষ বলে ঘোষণা করছে এই হনুমানের দল? কোন অধিকারে বাংলা থেকে অসম যাবার ট্রেনে শুদ্ধ শাকাহারী খাবার দেবার ভড়ং করা হবে? যাঁর নিরামিষ খাবার তিনি খান, যিনি আমিষ চাইবেন তিনি সেটাই পাবেন, এতদিন ট্রেনে সেটাই ছিল, মোদিজির নতুন ভারতে এখন আমিষ মানে অশুদ্ধ, এটা আসলে একটা পলিটিক্যাল স্টেট্মেন্ট, ওই যে ওরা আমিষ খায়, ওরা মানে মুসলমানেরা। ওই মূর্খদের জানাই নেই যে ঔরঙ্গজেব ছিলেন নিরামিষভোজী, রৌকতে আলমগিরি, একটা বই যাতে ঔরঙ্গজেব তার ছেলে কে লেখা চিঠিগুলো রাখা আছে তাতে তিনি লিখছেন তাঁর প্রিয় খাবার নিয়ে, যোগীজি জানেন? কী ছিল সেটা? কুবুলি, এক ধরণের বিরিয়ানি যা ছোলা, শুকনো অ্যাপ্রিকট, পুদিনা পাতা আর আলমন্ড দিয়ে তৈরি হত, ঔরঙ্গজেব মদ্য পান করতেন না, ঔরঙ্গজেবের পছন্দের খাবার ছিল গুজরাটে জন্ম দেওয়া ডালের খিচুড়ি। আসলে নির্বাচনের আগে ওই হিন্দু মুসলমান ন্যারেটিভ টাকে চাগিয়ে তুলতে মোদিজি যেটা করলেন তাতেই বোঝা যায় বিজেপি আসলে এক অবাঙালিদের দলই কেবল নয়, বিজেপি বাঙালি বিদ্বেষী। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেষ করেছিলাম যে ৯৯% আমিষভোজী এই বাংলাতে একটা সম্পূর্ণ নিরামিষ খাবার পাওয়া যায়, আমিষ খাবারই নেই এমন ট্রেনের উদ্বোধন করলেন নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi), আপনাদের মতামত কী? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
আরও পড়ুন: Aajke | একজন বৈধ ভোটারও বাদ পড়লে তাণ্ডবনৃত্যের জন্য তৈরি থাকুন মিঃ নির্বাচন কমিশনার
সারা দেশ জুড়ে বাংলা বললে বাংলাদেশী, হিন্দি বললে দেশপ্রেমিক, নিরামিষ খায় মানে হুন্দু, আমিষখায় মানে মুসলমান, মুসলমানেরা সংখ্যায় বাড়ছে, হিন্দু খতরে মেঁ হ্যায়, মোদিজী হলেন বিশ্বগুরু, আমাদের দেশে দারিদ্র প্রায় নেই, জহরলাল নেহেরুর জন্য দেশ পিছিয়ে গেছে, মোদিজীই এনেছেন নতুন স্বাধীনতা, মুসলমানেরা মঙ্গলসূত্র কেড়ে নেবে, গোমূত্র দিয়ে ক্যান্সার সারানো যায়, গোবর লেপে দিলে তা এয়ারকন্ডিশনিং এর কাজ করে, হাতির মাথা গণেশের মাথায় লাগানো হয়েছিল, সেটাই ছিল প্ল্যাস্টিক সার্জারি। এরকম হাজার হাজার মিথ্যে, মিথ, ফলস ন্যারেটিভ প্রতিদিন হোয়াটস অ্যাপ এ আসছে, আর সেটাই মানুষের কাছে রেফারেন্স হয়ে থেকে যাচ্ছে, এ এক কঠিন লড়াই, একটা ট্রেনে নিরামিষ খাবার চালু করা হয়েছে, সেটা বড় কথা নয়, অনেক বড় কথা হল এটাও সেই ফলস ন্যারেটিভের অঙ্গ যা দিয়ে বিজেপির রাজনীতি চলছে।







