সারা বছরের অর্থ সংস্থান, কোন খাতে কত খরচ হবে, কোন রাজ্যে কোন কোন প্রকল্প হবে, কত টাকা রাজ্যগুলোর জন্য বরাদ্দ হল, টাকা আসবে কোত্থেকে, টাকা খরচ হবে কোথায় – সেসব জানানো হবে বাজেট বক্তৃতায়। সেই মহান বাজেট বক্তৃতাতে, হ্যাঁ, গোটা বক্তৃতাতে পশ্চিম বাংলার নাম নেই। না, এক বারের জন্যও নেই। তিনটে নাম এসেছে – (১) শিলিগুড়ি, (২) দুর্গাপুর, (৩) ডানকুনি। ব্যস, ফিনিশ, টাটা বাইবাই খতম! নির্বাচনের বছরে আমরা কেবল নয়, বঙ্গ বিজেপি সভাপতিও ভেবেছিল যে, এবার ছপ্পড় ফাড়কে বাংলার জন্য কিছু বরাদ্দ আসবে, আর বাজেট বক্তৃতা শেষ হলেই সোনামুখ করে সেসব প্রকল্পের ঘোষণার ব্যখ্যা শোনাবেন মিডিয়ার বন্ধুদের। তাঁরা এমনিতেই নির্বাচনের বরাত পেয়েই গিয়েছেন, ২৪ ঘন্টা মনের আনন্দে সেই কাজই করে চলেছেন, আছেন হাবিলদার ময়ূখ, আপাতত কেয়ারটেকারের ভূমিকায়, আছেন আরও অনেকেই, লালিত পালিত পোষিত ইউটিউবারেরা আছেন, আবার ঢুকিয়ে দেবে, তাই উত্তরবঙ্গে ক্লিন সুইপ দেখতে পাওয়া ভীমরতিতে পাওয়া বৃদ্ধ সাংবাদিকও আছেন, এবার তাঁরাই ‘নির্বাচনের আগে বাংলার প্রাপ্তি’, ‘বাংলাই তো পেল’, ‘বাংলা এগিয়ে’, ‘বাংলায় ঝরে পড়ল বাজেট’ – এরকম সব শিরোনাম দিয়ে প্রচার শুরু করত। কিন্তু সব্বার মুখে ছাই দিয়ে আমাদের অর্থমন্ত্রী যিনি পেঁয়াজ-রসুন খান না, সেই তিনি বাংলার জন্য ললিপপ টুকুও রাখেননি।
কেবল টাকার হিসেবটা দেখলেই বুঝতে পারবেন। ধরুন রেল প্রকল্প, মূলত তিনটে, (১) ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো, ২) দমদম-নিউ গড়িয়া ভায়া রাজারহাট মেট্রো প্রকল্প, (৩) জোকা-বিবাদি বাগ ভায়া মাঝেরহাট মেট্রো। এই তিনটে প্রকল্পে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট বরাদ্দ ছিল ২২৮২ কোটি টাকা, এক বছরে যদি কম করে ১.৬ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ধরে নিই, তাহলে সেই টাকা এখন হওয়া উচিত ২৩১৮ কোটি টাকা। তো এবারে মানে ২০২৬–২৭-এ বরাদ্দ কত? ২১৪০ টাকা। মানে গত আর্থিক বছরে বরাদ্দের চেয়েও কম। মূল্যবৃদ্ধিকে মাথায় রাখলে এখনই ১৭৮ কোটি টাকা কম। বেশ, এবারে চলুন অন্য বরাদ্দগুলোর দিকে নজর দেওয়া যাক – এসআরএফটিআই, ফারাক্কা ব্যারেজ, চিত্তরঞ্জন ক্যানসার, এশিয়াটিক সোসাইটি, রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরি, গার্ডেনরিচ শিপ বিল্ডার্স, বোস ইন্সটিটিউট ইত্যাদির বরাদ্দ ধরলে মোট বরাদ্দ ১৭৫৬ কোটি টাকা ছিল ২০২৫–২৬-এর বাজেটে, এবারে সেটা এখনই কমে দাঁড়িয়েছে ১৫৯১ কোটি টাকাতে, মূল্যবৃদ্ধি ধরলে আরও কমবে। হ্যাঁ, এই বরাদ্দে আমি দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের বরাদ্দ ধরিনি, কারণ তা কেবল বাংলার নয়, তা বাংলা, ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশার। ওটা বাদ দিলে এক্কেবারে বাংলার জন্য বরাদ্দ ১৭৫৬ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১৫৯১ কোটি টাকাতে। কেন? বিজেপি বাংলার উন্নয়ন চায় বলে? আসলে বিজেপি বুঝেই গিয়েছে যে, কেবল বাংলাতে নয়, বাংলা, তামিলনাড়ু, কেরালাতে তারা হারছে, আর অসমে তারা জিতছে, তাই এই বাজেট নির্বাচনী বাজেট হয়ে উঠল না।
কিন্তু মাত্র এক বছর আগে ছবিটা কীরকম ছিল? ২০২৪-এ বিহারকে দেওয়া হয়েছিল ৬০ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প, ২০২৫-এ দেওয়া হয়েছিল ন্যাশন্যাল ইন্সস্টিটিউট অফ ফুড টেকনোলজি, পাটনা বিমানবন্দর এক্সটেনশনের বিরাট বরাদ্দ, দেওয়া হয়েছিল চারটে গ্রিন ফিল্ড আর একটা ব্রাউনফিল্ড বিমানবন্দর তৈরির বরাদ্দ। গ্রিনফিল্ড মানে এক্কেবারে নতুন বিমানবন্দর, আর ব্রাউনফিল্ড মানে তার অস্তিত্ব আছে কিন্তু তাকে ঢেলে সাজানো। আর আমাদের বাংলার ভাগ্যে কী জুটল এবারে? শিলিগুড়ি–বারাণসী হাই স্পিড রেল চলাচল করিডর, ডানকুনি-সুরাত ফ্রেইট করিডর, দুর্গাপুর শিল্প করিডোর। এর মধ্যে বেনারস–শিলিগুড়ি মানে বুঝতে পারছেন, সেই হাইস্পিড ট্রেনে লাইনে ওই চিকেন নেকের কয়েক কিলোমিটার মাত্র পড়বে, স্টেশন মাত্র একটা। ডানকুনি-সুরাত ফ্রেট করিডোর আজকের প্রকল্প নয়, ১৫ বছর আগের প্রকল্প, কেবল সুরাট জুড়ে তাকে নতুন নাম দেওয়া হল। আর দুর্গাপুর শিল্প করিডোরের আলাদা কোনও মানেই নেই। দুর্গাপুর শিল্প অঞ্চল, পাশাপাশি এসইউজেড অঞ্চল, আর বিরাট কয়লাখনি অঞ্চল এখনই আছে। কাজেই এটা হল ঐশ্যর্য রাইকে বিউটি পার্লারে নিয়ে যাবার ঘোষণা, তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। অথচ মাত্র এক বছর আগে এই মোদিজি, এই নির্মলা সীতারামন ‘কল্পতরু’ হয়ে উঠেছিলেন বিহারের জন্য। ২০২৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে, কেন্দ্রে এনডিএ সরকার টিকিয়ে রাখার জন্যই নীটিশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড (জেডিইউ)-এর সঙ্গে মিলিজুলি সরকার টিকিয়ে রাখার জন্যই বিহারে ঢালাও বরাদ্দের পথে হেঁটেছিল কেন্দ্র। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন তাঁর বক্তব্যে বিহারের জন্য কোনও সরাসরি ‘বিশেষ রাজ্যের তকমা’ ঘোষণা না করলেও, পরিকাঠামো খাতের জন্য যে ২৬,০০০ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন, তা কার্যত একটা বিশেষ প্যাকেজেরই নামান্তর ছিল। এই বরাদ্দের সিংহভাগই রাখা হয়েছিল সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নে, যার মধ্যে পাটনা-পূর্ণিয়া এক্সপ্রেসওয়ে এবং বক্সার-ভাগলপুর এক্সপ্রেসওয়ে ছিল প্রধানতম আকর্ষণ। এই প্রকল্পগুলো বিহারের কৃষিপ্রধান উত্তর ভাগ, শিল্পসম্ভাবনাময় দক্ষিণ ভাগের মধ্যে এক মেলবন্ধন তৈরি করার জন্যই ঘোষণা হয়েছিল। ভাগলপুর জেলার পীরপয়তিতে ২,৪০০ মেগাওয়াটের একটা আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ২১,৪০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের ঘোষণা হয়। এই প্রকল্পটা বিহারের বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটানোর পাশাপাশি রাজ্যে এক বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে বলেও ঘোষণা করা হয়েছিল, সামনে রাখা হয়েছিল আদানি পাওয়ার লিমিটেডের মতো বেসরকারি অংশীদারিত্ব। কৃষি ক্ষেত্রে বিহারের ঐতিহ্যবাহী মাখনা চাষকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিতে একটা বিশেষ ‘মাখনা বোর্ড’ গঠনের ঘোষণা বিহারের উত্তর অংশের কৃষকদের কাছে এক বড় উপহার ছিল। এছাড়াও গয়া জেলায় এক নতুন শিল্প কেন্দ্র বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল নোড তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়, যা অমৃতসর-কলকাতা ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডোরের অংশ হিসেবে রাজ্যের শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বন্যার দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানে ১১,৫০০ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি বিহারের জন্য এক অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ছিল, কারণ প্রতি বছরই বিহারের উত্তরাঞ্চল কোশি ও অন্যান্য নদীর প্লাবনে বিপর্যস্ত হয়, সেখানকার মানুষজনের কাছে এই ঘোষণা বিরাট ব্যাপার ছিল।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | হ্যাঁ, আরএসএস–হিন্দু মহাসভা–সাভারকারের চক্রান্তেই খুন হয়েছিলেন গান্ধীজি
এবারে পশ্চিমবঙ্গের ব্যাপারে এতটা নিস্পৃহ কেন? ঢোঁক গিলতে গিলতে শমীক ভট্টাচার্য অ্যান্ড কোম্পানি বাজেটকে স্বাগত জানাচ্ছেন তো বটে, কিন্তু মধ্যবিত্ত মানুষজন? ট্যাক্সে কোনও ছাড় নেই, উলটে সাধারণ মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হল যে, বাজার একদিনে ১৮০০ পয়েন্ট নিচে চলে গেল। নির্বাচনী বছরে এমনটা দেখা যায় না। তবে কি মোদিজি অ্যান্ড কোম্পানি বুঝে ফেলেছে যে, এবারের বাজেটে এসব বরাদ্দ বাড়িয়ে কোনও লাভ নেই? তার চেয়ে ২৭-এ উত্তরপ্রদেশ বা ২৮-এ কর্নাটক, তেলঙ্গানা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান নির্বাচনের সময়ে আবার এই খেলা খেলা যাবে? হতে পারে, কিন্তু এবারে নির্বাচনের আগে বাজেটে বাংলার এই বঞ্চনা নিশ্চিত নির্বাচনী ইস্যু হয়ে উঠবে, বুঝেছেন আমাদের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও, বুঝতে পেরেই সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এই বাজেটে অনেক কিছু আছে বাংলার জন্য, কিন্তু সেসব পেতে গেলে এই রাজ্যে বিজেপির সরকারকে আনতে হবে, মানে বিজেপির সরকার এলে তবেই আসবে স্পেশ্যাল প্যাকেজ, তবেই আসবে উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ, না হলে বসে আঙুল চুষুন। হ্যাঁ, যুক্তরাষ্ট্র কাঠামোকে এইভাবে চুরমার করার কথা জোর গলায় মানুষকে বলা একমাত্র বিজেপির পক্ষেই সেটা সম্ভব, আর সেটা একবার নয়, বারবার বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রী থেকে বিভিন্ন নেতারা সেটা পরিষ্কার জানিয়েও দেন, ডাবল ইঞ্জিন সরকার হলেই তবেই উন্নয়নের চাকা ঘুরবে। মানে কেন্দ্রে বিজেপি আছে, রাজ্যেও বিজেপি সরকারকে আনুন, তারপরে উন্নয়নের বান বইবে। বিহারের ২০২৪ সালের বাজেটে অর্থমন্ত্রী সরাসরি প্রকল্পের খরচ আর বরাদ্দের অঙ্ক জানিয়েই দিয়েছিলেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে এক স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল। উদাহরণ আপনাদের সামনে, সড়ক প্রকল্পের জন্য ২৬,০০০ কোটি টাকা বা বন্যার জন্য ১১,৫০০ কোটি টাকার মতো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান বিহারের মানুষের মধ্যে এক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বাজেটে প্রকল্পের নাম ঘোষণা করা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই সরাসরি আর্থিক বরাদ্দের অঙ্ক বলাই নেই, ঘোষণার জন্য বরাদ্দ কতটা? কত দিনের মধ্যে প্রকল্পের রুপায়ণ হবে? কিছুই নেই।
বাংলার এই বঞ্চনার কাহিনী আজকের নয়, বাংলা ভাগ করেই স্বাধীনতা এসেছিল, সেদিন বাংলার সবথেকে বড় শিল্পকে শকুনির পাশা খেলার পণের মত ব্যবহার করা হয়েছিল, কারখানা থেকে গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে, কাঁচা মালের উৎপাদন থেকে গিয়েছিল পূর্ব বঙ্গে। তার কিছুদিনের মধ্যে চালু হয়েছিল মাসুল সমীকরণ নীতি, কাজেই আমাদের কয়লা কম দামে যাচ্ছিল মহারাষ্ট্রে, আর মহারাষ্ট্র, গুজরাতের তুলো বেশি দামে আসছিল বাংলাতে। বহু পরে ভিপি সিংয়ের জামানাতে সেই মাসুল সমীকরণ যাও বা উঠে গেল, আর্থিক বঞ্চনা কিন্তু থামেনি, আর এই মোদি জামানাতে সেই আর্থিক বঞ্চনা এক চরম আকার নিয়েছে। এমনকি এখন একশ দিনের কাজ, যা এখন খাতায় কলমে ১২৫ দিনের কাজ বলে ঘোষণা হচ্ছে, সেই প্রকল্পের খরচের ৪০ শতাংশ দায় এখন রাজ্যকে বইতে হবে। কিন্তু তার জন্য আলাদা কোনও বরাদ্দ কি এসেছে? না আসেনি। তার মানে গ্রামের শহরের প্রান্তিক মানুষজন যেটুকু সামান্য টাকা পেত, এখন সেটাও সুতোয় ঝুলছে, কারণ সেই ৪০ শতাংশ টাকার সংস্থান না করা গেলে ওই ৬০ শতাংশ টাকাও আসবে না, পেটে লাথি পড়বে গরীবদের। আর এগুলো খুব ভেবে চিন্তেই করা হচ্ছে। এবারে মেসেজ হল, সোজা আঙুলে ঘি উঠছে না, তাই আঙুল বেঁকানো হলো, উন্নয়ন চাই? লাইনে এসো বাছা, বিজেপিকে ভোট দাও। মেসেজ লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার। কিন্তু পালটা মেসেজ সামনের নির্বাচনে রাজ্যের মানুষ দিয়ে দেবেন, এই বাংলা কোনও সতীনের বাচ্চার ব্যবহার সইতে রাজি নয়, ঘাড়ও নোয়াবে না, সেই মেসেজ বাংলার মানুষ সামেনের নির্বাচনে দেবেন।
দেখুন আরও খবর:








