ওয়েব ডেস্ক: পয়লা বৈশাখ (Poila Boisakh 2026) বাঙালির প্রাণের উৎসব। কিন্তু এই নববর্ষের রূপ, সময় সবই একদিনে তৈরি হয়নি। ইতিহাস বলছে, বহু পালাবদলের মধ্য দিয়ে আজকের এই দিনটি পেয়েছে তার চেনা পরিচয় (Bengali New Year)। একসময় পয়লা বৈশাখ (Baisakh) মানেই ছিল না আনন্দ-উৎসব। বরং এটি ছিল ব্যবসায়ীদের হালখাতা খোলার দিন, নতুন হিসাবের সূচনা। ‘হাল’ শব্দটির শিকড় সংস্কৃত ও ফারসিতে একদিকে লাঙল, অন্যদিকে নতুনত্বের ইঙ্গিত। সেই সূত্রেই নতুন বছরের অর্থ ছিল অর্থনৈতিক সূচনা।
মোগল আমলে খাজনা আদায়ের সমস্যার সমাধান করতে সম্রাট আকবর চালু করেন ‘ফসলি সন’, যা পরে বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। এর ফলে কৃষিকাজের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বছর গণনা সম্ভব হয়। যদিও অনেকের মতে, আরও আগে রাজা শশাঙ্কই বঙ্গাব্দের সূচনা করেছিলেন।
আরও পড়ুন: পয়লা বৈশাখে পেটপুজোর ঠিকানা খুঁজছেন? রইল কলকাতার সেরা বাঙালি রেস্তোরাঁর হদিশ…
তবে নববর্ষের ধারণা তখনও আজকের মতো ছিল না।একসময় শরৎকালকেই বছর শুরুর সময় ধরা হত ‘শত শরৎ বাঁচি’ কথাটির উৎস সেখানেই। আবার গ্রামীণ কৃষিজীবী সমাজে অগ্রহায়ণ মাস (নতুন ফসল ওঠার সময়) ছিল বছরের প্রথম মাস। চৈত্র সংক্রান্তিতে হত গাজন-চড়ক ধর্মীয় উৎসব, কিন্তু নববর্ষ আলাদা করে পালিত হত না।
ক্রমে পয়লা বৈশাখের সঙ্গে যুক্ত হয় পুণ্যাহ ও খাজনা আদায়, জমিদার-প্রজা সম্পর্ক, মিষ্টি বিলি, সামাজিক মেলামেশা। এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরম্পরাই ধীরে ধীরে রূপ নেয় সার্বজনীন উৎসবে। উনিশ শতকেও কিন্তু বাংলা নববর্ষ এতটা জনপ্রিয় ছিল না। বরং ইংরেজি নববর্ষই বেশি প্রচলিত ছিল। পরে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সংগীত, সব মিলিয়ে নববর্ষ ঢুকে পড়ে বাঙালির জীবনের কেন্দ্রে।
এই রূপান্তরের সবচেয়ে বড় কারিগর নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর লেখনীতে পয়লা বৈশাখ হয়ে ওঠে নবজন্মের প্রতীক পুরনোকে বিদায়, নতুনকে আহ্বান। নববর্ষের আর এক বড় বৈশিষ্ট্য, এটি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই একসঙ্গে মিলিত হয় এই দিনে। গ্রামে-গঞ্জে মেলা, শহরে হালখাতা, বাড়িতে মিষ্টি। সব মিলিয়ে এক মহামিলনের ছবি।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে আবহ। কোথাও উৎসবের উচ্ছ্বাস কমেছে, কোথাও রাজনীতি বা বিভাজনের ছায়া পড়েছে। তবু ইতিহাস বলছে, এই দিনটি মূলত মিলনের, নবসূত্রপাতের, নতুন আশার। তাই সব সংশয় কাটিয়ে নববর্ষের মূল বার্তাই যেন ফিরে আসে, “পুরনো জীর্ণতা মুছে গিয়ে শুরু হোক নতুনের জয়যাত্রা।”







