কলকাতা: বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের পাশাপাশি আরও একটা সমান্তরাল উৎসব চলে অবিরত। তা হলো সংস্কৃতির উৎসব। মাটির সোঁদা গন্ধমাখা সুর আর অক্ষরের চিরন্তন আসক্তি, দুইয়ের মেলবন্ধনে এবার শহর কলকাতায় এক অভিনব কোলাজের কোলাকুলি। গ্রামের মেঠো সুরের টান আর কালজয়ী কবিতার অন্তলীন স্পন্দনকে এক সুতোয় বাঁধতে আগামী ২৩ মে রূপালি পর্দার স্মৃতিবিজড়িত উত্তম মঞ্চে বসছে ‘ফোকবিতা’র(PhoKOBITA) আসর। থিঙ্কবিজ মার্কোম আয়োজিত এই বিশেষ সন্ধ্যায় মঞ্চ ভাগ করে নেবেন এ সময়ের দুই জনপ্রিয় শিল্পী সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তন্ময় বিশ্বাস। আগামী শনিবার, সন্ধ্যা সাড়ে ছটা থেকে শুরু হতে চলা এই অনুষ্ঠান ঘিরেই এখন তিলোত্তমার সংস্কৃতিপ্রেমী মহলে পারদ চড়তে শুরু করেছে।
বাঙালির মনন বরাবরই ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের চালিকাশক্তি। সাহিত্য, গান, কবিতা কিংবা নাটক, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই শিল্পমাধ্যমগুলো মানুষের যাপনচিত্র আর অনুভূতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে রয়েছে। গ্রামের আখড়া থেকে উঠে আসা মাটির সুরে ভরা লোকগান কিংবা রবীন্দ্র-উত্তর আধুনিক বাংলার কালজয়ী কবিতা আজও সব বয়সের শ্রোতাদের হৃদয়ে সমানভাবে স্পন্দন তোলে। সেই চেনা আবেগকেই এক সম্পূর্ণ নতুন আধারে পরিবেশন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এই অনুষ্ঠানে। ‘ফোKOBITA’, নামটির মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে এক চতুর ও সুচিন্তিত চমক। ‘ফোক’ এবং ‘কবিতা’, আপাতভিন্ন মেরুর এই দুই ঘরানাকে মিলিয়ে দিয়েই তৈরি হয়েছে অনুষ্ঠানের মূল রূপরেখা।
আয়োজক সংস্থা থিঙ্কবিজ মার্কোমের পক্ষে সায়ন মজুমদার এই অভিনব ভাবনার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান, বিগত নয় বছর ধরে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সুবাদে বহু প্রথিতযশা শিল্পী ও পারফর্মারদের সঙ্গে আমাদের কাজ করার সুবর্ণ সুযোগ হয়েছে। তাঁদের অত্যন্ত কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতার সূত্রেই আমাদের মনে হয়েছে, এমন একটি ব্যতিক্রমী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা দরকার যা শিল্পীদের চেনা বৃত্তের বাইরে গিয়ে আরও বড় পরিসরে সাধারণ মানুষের দরবারে পৌঁছতে সাহায্য করবে। সেই তাগিদ থেকেই ‘ফোকবিতা’র জন্ম।
কবিতা ও লোকগানের এই যুগলবন্দি নিয়ে স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত ও আশাবাদী দুই শিল্পীও। বাচিক শিল্পী সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, আমার কাছে কবিতা কেবল নিছক মঞ্চে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করা নয়, তা মানুষের অন্তরের অনুভূতির সঙ্গে বাংলার মাটির টানকে জুড়ে দেওয়ার একটা সেতু। ‘ফোকবিতা’র হাত ধরে বাংলা সাহিত্যের সেই চিরন্তন সৌন্দর্য আর নিহিত দর্শনকেই শ্রোতাদের সামনে অত্যন্ত সহজ ও সাবলীলভাবে পরিবেশন করতে চাই। এর সঙ্গে যখন লোকসঙ্গীতের সুর যুক্ত হয়, তখন পুরো বিষয়টাই আরও বেশি ঘরের হয়ে ওঠে, আমাদের শিকড়ের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
oncology, সুরের জাদুকর তন্ময় বিশ্বাসের অকপট স্বীকারোক্তি, বাংলার লোকসঙ্গীত মানেই তো আমাদের মাটির গল্প, মানুষের সুখ-দুঃখের নিখাদ যাপনের কথা। এই গানগুলো গাইতে পারা আমার কাছে সবসময়ই এক পরম প্রাপ্তি। ‘ফোকবিতা’র সবচেয়ে সুন্দর এবং জোরের জায়গা এটাই যে, এখানে সুর আর শব্দ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। কোথাও কেউ কাউকে ছাপিয়ে যাবে না, বরং একে অপরকে জড়িয়ে এক অনন্য আবহ তৈরি করবে।
গ্রীষ্মের এক তপ্ত সন্ধ্যায় উত্তম মঞ্চের প্রেক্ষাগৃহে সেই সুর-শব্দের সহাবস্থান বাঙালির মননে কতটা স্থায়ী দাগ কাটতে পারে, এখন সেটাই দেখার। টিকিট কাউন্টারের ব্যস্ততা অবশ্য আভাস দিচ্ছে, কলকাতার রসিক সমাজ এই পরীক্ষামূলক কোলাজকে স্বাগত জানাতে ইতিমধ্যেই প্রস্তুত।
মাটির গল্পে সুর-শব্দের মেলবন্ধন, ‘ফোকবিতা’
সুর ও শব্দের এক অভিনব মেলবন্ধন







