কলকাতা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিকর্ম চিরকালই নতুন প্রজন্মের কাছে গবেষণার এক অফুরান ক্ষেত্র। কখনও তাঁর সুরের আশ্রয়ে, কখনও বা তাঁর ভাবনার অনুকরণে আধুনিক শিল্পীরা খুঁজে নেন নিজস্ব পথ। সেই পথ ধরেই এবার এক অভিনব সাঙ্গীতিক প্রয়াস নিয়ে হাজির হলো এ.এম স্টুডিও। রবীন্দ্রনাথের নাটক রক্তকরবী, রাজা এবং অচলায়তন, এই তিন কালজয়ী নাটকের একুশটি গানের কথা ও সুরের উপাদানকে অবলম্বন করে তৈরি হলো একটি মৌলিক সৃষ্টি, যার নাম দেওয়া হয়েছে আলাপ।
সাধারণত রবীন্দ্রসংগীতের ক্ষেত্রে আমরা যা শুনে অভ্যস্ত, আলাপ প্রথাগত সেই ধারার বাইরে গিয়ে এক নতুন আঙ্গিক তৈরির চেষ্টা করেছে। এটি কোনো রবীন্দ্রসংগীতের পুনর্নির্মাণ বা রিমেক নয়, বরং রবীন্দ্র ভাবনার এক সমসাময়িক বিনির্মাণ। এই গানের প্রতিটি শব্দ নেওয়া হয়েছে মূল ওই একুশটি গান থেকে। সেই শব্দগুলোকে নতুন বিন্যাসে সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি সম্পূর্ণ নতুন গীতি আখ্যান। আত্মানুসন্ধান, মুক্তি, আলোয় ফেরার আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনের গূঢ় সত্য, রবীন্দ্রনাথের নাটকে যে দর্শনগুলো বারবার উঠে এসেছে, সেই বিষয়গুলোই এই গানের মূল উপজীব্য।
এ.এম স্টুডিওর এই প্রযোজনার সঙ্গীত পরিচালনায় এবং নির্দেশনায় রয়েছেন অয়ন মুখোপাধ্যায়। তিনি জানিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের নাটকের যে গভীর দর্শন, তাকে আজকের সময়ের নিরিখে নতুন করে অনুভব করার তাগিদ থেকেই এই কাজ। রবীন্দ্রসাহিত্যের শব্দভাণ্ডারকে ব্যবহার করে এক নতুন অর্থ তৈরির এই চ্যালেঞ্জটি ছিল বেশ কঠিন, যা তারা সাফল্যের সঙ্গেই সম্পন্ন করতে চেয়েছেন।
গানে কণ্ঠ দিয়েছেন বর্ণিনী চক্রবর্তী এবং প্রিয়া ভট্টাচার্য। সঙ্গীতের মূল পরিকাঠামো অর্থাৎ অ্যারেঞ্জমেন্ট, মিক্স ও মাস্টারিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন সায়ন্তন দাশগুপ্ত। আলাপ কেবল শ্রুতিমধুর সঙ্গীত নয়, এটি একটি ভিজ্যুয়াল বা দৃশ্যকাব্যও বটে। এই প্রকল্পের জন্য বিশেষভাবে শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন প্রখ্যাত শিল্পী চন্দ্র ভট্টাচার্য। তাঁর আঁকা ছবিগুলো গানের ভাবের সঙ্গে একাত্ম হয়ে দর্শকদের সামনে তুলে ধরছে নাটকের অভ্যন্তরীণ আবহকে। এছাড়া সম্পাদনা ও অ্যানিমেশনের দায়িত্বে ছিলেন বিজয়ব্রত জ্যোতি এবং গ্রাফিক্সের কাজে ছিলেন ত্রিনাথ মজুমদার। সৃজনশীল সহযোগী হিসেবে ছিলেন রবিন রায়।
সাংস্কৃতিক মহলের মতে, রবীন্দ্রচর্চার ক্ষেত্রে এটি একটি সাহসী পদক্ষেপ। রবীন্দ্রনাথের গানগুলো নির্দিষ্ট ছাঁচে বদ্ধ না রেখে, তার উপাদানগুলোকে ভেঙে নতুন কিছু তৈরির এই প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে তরুণ শিল্পীদের মধ্যে বাড়ছে। আলাপ সেই ধারায় একটি নতুন সংযোজন হতে চলেছে বলে মনে করছেন সঙ্গীতবোদ্ধারা। পুরনোকে সম্মান জানিয়ে, তাকে আজকের দিনের মানুষের মনের ভাষায় নতুন করে সাজিয়ে তোলার এই প্রয়াস আদতে এক নন্দনতাত্ত্বিক সংলাপ। আলাপের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের নাটকের সেই চিরন্তন প্রশ্নগুলো, মানুষের মুক্তি কোথায় বা ক্ষমতার উৎস কী, তা আবারও নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন নির্মাতারা। খুব শীঘ্রই এটি বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেতে চলেছে।







