কলকাতা: শিল্পের ইতিহাসে এমন অনেক গল্প রয়েছে, যা জানলে রীতিমতো অবাক হতে হয়। প্রায় দু’শো বছর আগে ভারতের মাটিতে তৈরি হত এক বিশেষ উজ্জ্বল হলুদ রং, যার উৎস ছিল গরুর প্রস্রাব। শুধু চিত্রকলাই নয়, ঔপনিবেশিক ভারতে ব্যবহৃত একটি বিশেষ আলোকচিত্র প্রযুক্তির সঙ্গেও জড়িয়ে ছিল গবাদি পশুর প্রস্রাব থেকে পাওয়া উপাদান। নতুন গবেষণার সূত্রে ফের সামনে এসেছে সেই বিস্মৃত ইতিহাস।
এই ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল ‘ইন্ডিয়ান ইয়েলো’। ষোড়শ থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত মুঘল, রাজস্থানি ও পাহাড়ি মিনিয়েচার চিত্রকলায় এই উজ্জ্বল হলুদ রঞ্জকের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকে এই রং ইউরোপেও পৌঁছে যায়। পরে ব্রিটেনের বিখ্যাত রঙ প্রস্তুতকারী সংস্থা উইন্সর অ্যান্ড নিউটনের ক্যাটালগেও জায়গা করে নেয় ‘ইন্ডিয়ান ইয়েলো’।
এই রং নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রহস্য ছিল। কীভাবে এত উজ্জ্বল হলুদ রঞ্জক তৈরি হত, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল গবেষকদের। ১৮৮৩ সালে ভারতীয় প্রশাসনিক আধিকারিক টি. এন. মুখার্জি বিহারের মুঙ্গেরে গিয়ে এই রং তৈরির একটি প্রক্রিয়া নথিবদ্ধ করেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, বিশেষ এক সম্প্রদায়ের দুগ্ধচাষীরা গরুকে মূলত আমপাতা ও জল খাইয়ে তাদের উজ্জ্বল হলুদ প্রস্রাব সংগ্রহ করতেন। এরপর সেই তরল থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে কঠিন পদার্থ তৈরি করে তা শুকিয়ে রফতানি করা হত লন্ডনে।
তবে মুখার্জির এই বিবরণ নিয়ে দীর্ঘদিন সংশয় ছিল। পরে ২০১৯ সালে লন্ডনের কিউ গার্ডেনে সংরক্ষিত ‘ইন্ডিয়ান ইয়েলো’-র নমুনার রাসায়নিক পরীক্ষা করা হয়। সেই পরীক্ষায় গরুর প্রস্রাবের উপস্থিতির প্রমাণ মেলে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে বহু বছর আগে নথিবদ্ধ করা মুখার্জির পর্যবেক্ষণ নতুন করে গুরুত্ব পায়।
আরও খবর : ফের খুলল ওয়ানধামা হত্যাকাণ্ডের ফাইল! ২৩ কাশ্মীরি পণ্ডিত হত্যার তদন্তে নামল SIA
‘ইন্ডিয়ান ইয়েলো’-র সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিশ্বখ্যাত শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের নামও। শিল্প ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, তাঁর বিখ্যাত ছবি ‘স্টারি নাইট’-এর উজ্জ্বল হলুদ অংশে এই রঞ্জক ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে গল্প এখানেই শেষ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ‘বেঙ্গল লাইট’-এর ইতিহাসও। আধুনিক ফ্ল্যাশ প্রযুক্তি আবিষ্কারের আগে আলোকচিত্রে কৃত্রিম আলো তৈরি করতে ব্যবহৃত হত এই বিশেষ রাসায়নিক উপাদান। এর মূল উপাদান ছিল সল্টপিটার বা পটাশিয়াম নাইট্রেট।
বিহার ও বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গবাদি পশুর প্রস্রাবে সমৃদ্ধ মাটি থেকে সল্টপিটার সংগ্রহ করতেন নুনিয়া সম্প্রদায়ের শ্রমিকরা। পরে সেই উপাদান পরিশোধন করে ইউরোপে পাঠানো হত। প্রথম দিকে গানপাউডার তৈরিতে এর ব্যবহার থাকলেও উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ফোটোগ্রাফি ও আলোকসজ্জাতেও সল্টপিটারের ব্যবহার শুরু হয়। অল্প সময়ের জন্য তীব্র নীলাভ আলো তৈরি করতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিত।
এই ইতিহাসে শিল্প, বিজ্ঞান এবং ঔপনিবেশিক বাণিজ্যের যোগসূত্রও স্পষ্ট। ভারতীয় কাঁচামাল, স্থানীয় শ্রম এবং ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল একটি বড় বাণিজ্যিক শৃঙ্খল। ভারত থেকে সংগৃহীত উপাদান পৌঁছে যেত ইউরোপের শিল্পী, আলোকচিত্রী এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে।
পরবর্তীতে বিশ শতকের শুরুতে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। গরু রক্ষার আন্দোলন, ঔপনিবেশিক রাজনীতির পরিবর্তন এবং কৃত্রিম রাসায়নিক রঞ্জকের আবিষ্কারের কারণে ধীরে ধীরে ‘ইন্ডিয়ান ইয়েলো’-র উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে সল্টপিটারও ক্রমে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি হতে শুরু করে।
তবে এই ঐতিহ্যের কিছু নিদর্শন এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জয়পুরের সপ্তম প্রজন্মের মিনিয়েচার শিল্পী শাম্মি বান্নু শর্মার কাছে এখনও আসল ‘গোগোলি’ বা ‘ইন্ডিয়ান ইয়েলো’-র অতি সামান্য নমুনা রয়েছে। কৃষ্ণের অলংকার বা কপালে অত্যন্ত সংযতভাবে সেই ঐতিহাসিক রং ব্যবহার করেন তিনি।
অর্থাৎ, আজকের আধুনিক শিল্পের ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে ভারতের গ্রাম, গবাদি পশু এবং সাধারণ মানুষের শ্রমের এক বিস্মৃত অধ্যায়। ‘ইন্ডিয়ান ইয়েলো’ এবং ‘বেঙ্গল লাইট’-এর ইতিহাস সেই পুরনো ভারতীয় জ্ঞান ও কাঁচামালের আন্তর্জাতিক প্রভাবেরই এক আশ্চর্য উদাহরণ।







