Placeholder canvas

Placeholder canvas
Homeচতুর্থ স্তম্ভFourth Pillar | নীতীশ কুমার তো জোকার, কিন্তু তাঁর চারপাশে কারা?     

Fourth Pillar | নীতীশ কুমার তো জোকার, কিন্তু তাঁর চারপাশে কারা?     

Follow Us :

যেদিন পাটনাতে বিরোধীদের বৈঠক হয়েছিল, তখনও নাম ইন্ডিয়া অ্যালায়েন্স হয়নি, সেদিনই আমরা এই চতুর্থ স্তম্ভে প্রশ্ন তুলেছিলাম, নীতীশের উপর ভরসা করা যায় কি? কেবল তখন কেন? যেদিন নীতীশ কুমার ওরফে পাল্টুকুমার বিজেপির হাত ছেড়ে আরজেডি-র সঙ্গে সরকার তৈরি করলেন, সেদিনেই আমরা এই ভেঙে বেরিয়ে আসা নিয়ে কী বলেছিলাম? আমরা বলেছিলাম, ভারতীয় রাজনীতির হাস্যকর বিষয়, নীতীশ বিজেপির হাত ছাড়লেন। এখন থেকে তিনি বিরোধী দলগুলোর কাছে সেকুলার, ক’দিন পরেই দিল্লিতে কমিউনিস্ট কমরেড সীতারাম ইয়েচুরি বা কমরেড ডি রাজার সঙ্গে বৈঠকে দেখা যাবে ওনাকে। ২০২৪ কেবল বিহার নয়, হিন্দিভাষী বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক বিজেপির বিরুদ্ধে প্রচার করতে দেখা যাবে নীতীশ কুমারকে। উল্টোদিকে নরেন্দ্র মোদি তাঁর ভাষণে বলবেন বিরোধী দলগুলোর নেতাদের সততা নেই, তারা দেশপ্রেমিক নয়, তারা দেশের বিকাশের বিরুদ্ধে, উন্নয়ন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কাজ করছেন, যার মধ্যে এক ব্র্যাকেটেই থাকবেন নীতীশ কুমার। বিহারে গিয়ে মোদিজি বলবেন, পিছলা সরকার বিকাশ কা কাম রোক দিয়া থা, হাম ফির সে চালু করনা চাহতে হ্যায়। এ হল ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের মহিমা। এবং বামপন্থীরা, আবার সেই এক পুরনো খেলায়, আগেকার দিনে বিশেষ করে ব্রাহ্মণের ঘরের বিধবারা কিছু নিয়ম কানুন মেনে চলতে বাধ্য হতেন, কঠোর সেই নিয়ম কানুন, কেন মানতে হবে? কেন মানব? এসব প্রশ্নের অবকাশই ছিল না, নিয়ম ইজ নিয়ম, তা মেনে চলতেই হবে। তো আমাদের দেশের সংসদীয় কমিউনিস্ট পার্টিদেরও সেরকম কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়, চলেন। কেন চলেন, তা বোঝাতে পারেন না, নিজেরাও বোঝেন, তাও নয়। বিজেপির হাত ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাম দলের নেতারা নীতীশের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন, যদিও সরকারে অংশগ্রহণ করবেন না বলেই জানিয়েছেন। কেবল ২০২২ এর অগাস্ট মাসেই নয়, তারপরেও বহুবার আমাদের চতুর্থ স্তম্ভে বলেছি এই মানুষটা আসলে পাল্টি কুমার, যে কোনও সময়েই পাল্টি খেতে পারেন। যেদিন কলকাতায় এসেছিলেন মমতার সঙ্গে দেখা করতে, সেদিনও এই একই কথাই বলেছি, ওনার নিজস্ব এজেন্ডা আছে, সেই এজেন্ডা কোনও আদর্শের ভিত্তিতে নয়, সেই এজেন্ডা হল আরও বড় পদ, প্রধানমন্ত্রী না হলেও অন্তত রাষ্ট্রপতি। তো সেই নীতীশ কুমার আবার মহাগঠবন্ধন ছেড়ে বিজেপির হাত ধরলেন, আবার মুখ্যমন্ত্রী হলেন। অগাস্ট ২০২২-এ কী বলেছিলেন, শুনে নিন। কেবল কি উনি নাকি, উনকে লিয়ে সব দরওয়াজা হমেশা কে লিয়ে বন্ধ হো গয়া। কে বলেছিলেন? বিজেপির দুধুভাতু সভাপতিকে বাদ দিলে বিজেপির দু’ নম্বর নেতা অমিত শাহ। তো সেটা তো জুমলা ছিল, এখন এটা প্রমাণিত। কিন্তু আজ এক অন্য আলোচনাতে আসা যাক।

আচ্ছা আপনাদের কী মনে হয়? দেশের মধ্যে আমিই এক সর্বজ্ঞানী? আমিই কেবল জানতাম যে নীতীশ কুমার পাল্টিবাজ নেতা, যে কোনও সময় পাল্টি মারতে পারেন? না তেমন তো নয়। উল্টে আমি বলব, রাজনীতি সচেতন প্রত্যেক মানুষ, প্রত্যেক নেতা, প্রত্যেক দল জানতেন, জানেন যে আর যাই হোক নীতীশ কুমারের কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল না আজও নেই। তাহলে এই যে বার বার তাঁর শিবির বদল, সেটা জানা সত্ত্বেও তাঁকে কমিউনিস্ট, বামপন্থীরা সমেত বিভিন্ন শিবির বিভিন্ন সময়ে সঙ্গে নিয়েছেন, তাঁর দলের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন, তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী করে রেখেছেন, এর কারণ কী? তিনি তো ভারতীয় রাজনীতির পরিচিত জোকার, কিন্তু খেলোয়াড় রিং মাস্টারেরা তাঁকে নিয়ে নেমেছেন কেন? একবার নয় বারবার। প্রথমে আসুন নীতীশ কুমারের রাজনীতিটা বোঝা যাক। জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলন থেকে বিহারে যাঁরা উঠে এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে তিনজনের নাম হল লালুপ্রসাদ যাদব, নীতীশ কুমার আর সুশীল মোদি। জনসঙ্ঘের সুশীল মোদি তাঁর দলের জন্য, বেনিয়া, ব্রাহ্মণ রাজনীতির জন্যই পিছিয়ে পড়া রাজনীতির প্রতিনিধি কোনওদিনও হতে পারেননি, তিনি বিহারের রাজনীতিতে হাইফেন হয়েই রয়ে গেছেন, এবারেও সেই হাইফেন, উপমুখ্যমন্ত্রী। অন্যদিকে শুরুয়াতি খেলায় লালু এগিয়ে গিয়েছিলেন, নীতীশ উচ্চশিক্ষিত, নীতীশ লালুর মতো মেঠো নয়, কিন্তু ওই মেঠো রাজনীতির জন্যই লালু এগিয়ে গেলেন এবং নীতীশ সেই সময় থেকেই সুযোগসন্ধানী হয়ে ওঠার পাঠ নিতে থাকলেন। এরপর জনতা পার্টির ভাঙন, জনতা দল, সেও ভাঙল, নীতীশ আর জর্জ ফার্নান্ডেজের সমতা পার্টি, বাজপেয়ীর মন্ত্রিসভা, এরপরে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী পদ পিছলে পিছলে যাওয়া। প্রথমবারে তো মাত্র সাতদিনের মুখ্যমন্ত্রিত্ব, এরপরে ২০০৫-এ তিনি বিজেপির হাত ধরলেন, পাকাপোক্ত মুখ্যমন্ত্রী, তারপরে ২০১৫ পর্যন্ত তিনিই শাসনে। মধ্যে জিতন রাম মাঞ্ঝির আট মাসের মুখ্যমন্ত্রিত্বের পরে তিনিই আবার, ২০১৫তে মহাগঠবন্ধন, লালু-নীতীশ। ২০১৭-র জুলাই জোট ভেঙে আবার বিজেপিতে, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী তিনিই। ২০২০ র নির্বাচনে তিনি ছোট দল, জনভিত্তি কমছে ১১৫, ৭৫ থেকে ৪৫ এ নেমে এসেছে তাঁর দল, কিন্তু তিনিই মুখ্যমন্ত্রী। ১০ অগাস্ট ২০২২-এ বিজেপির হাত ছেড়ে লালু, কংগ্রেস বামেদের হাত ধরে আবার সেই মুখ্যমন্ত্রী, এবং আবার সেই জোট ছেড়ে বিজেপির হাত ধরলেন, এবং আবার সেই তিনিই মুখ্যমন্ত্রী। এক্কেবারে এইসময়েই এই ভাঙনের কারণও খুব পরিষ্কার, নীতীশের দলের সাংসদেরা, বড় নেতারা নীতীশকে বুঝিয়েছেন রামমন্দির প্রাণপ্রতিষ্ঠার পরে বিহার রামময় হয়েই গেছে, এখন শিবির না বদলালে দল উঠে যাবে, হুমকিও এসেছে দল ভাঙার।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | মন্দির উদ্বোধনে শুরু হল নতুন কালচক্র, নবনির্মাণ

ওদিকে নীতীশের এই নড়বড়ে অবস্থান কি লালু জানতেন না? সেখান থেকেও সম্ভবত নীতীশের দল ভাঙার একটা চেষ্টা চলছিল, কাজেই দল সামলাতে নীতীশ আবার শিবির বদল করলেন। কিছু বিধায়ক সকালে সন্ধেতে দল ছেড়ে অন্য দলে গিয়ে পরের দিন আবার আরেক দলে গেছেন। আবার ধরুন চোখে আঙুল দাদা রুদ্রনীলের মতোও তো লোকজন আছেন যাঁরা বাম থেকে তৃণমূল হয়ে আপাতত বিজেপিতে, কিন্তু এই মাপের একজন সর্বভারতীয় নেতার এতবার শিবির বদলের মতো উদাহরণ আর একটাও নেই। জর্জ ফার্নান্ডেজ ছিলেন সমাজতন্ত্রী, তিনি বিজেপির সঙ্গে গেলেন, আর ফেরেননি। নীতীশ কুমার সে দিক থেকে সত্যিই এক অনন্য রেকর্ডের অধিকারী, ২০০৫ থেকে মধ্যে আট মাস বাদ দিলে তিনিই মুখ্যমন্ত্রী কিন্তু বিহারের প্রত্যেক দলের মুখ্যমন্ত্রী তিনি হয়েছেন। কিন্তু বাকিরা তা হতে দিল কেন? প্রথমে আসুন বিজেপির আলোচনায়। বিজেপি এ দেশের একমাত্র দল যারা তাদের রাজনৈতিক ফায়দার জন্য যা যা করার সব করতে পারে, এবং এ দেশের বিভিন্ন রাজনীতির, বিভিন্ন পথের নেতাদের তারা যে ভাবে ব্যবহার করেছে তারও আবার কোনও তুলনা নেই। বিহারের জাতিগত অবস্থানের দিক থেকেই ওখানে আরএসএস, জনসঙ্ঘ বা বিজেপির জমি বড্ড অনুর্বর। এখনও বিহারে বিজেপির ভোট ২০ শতাংশের নীচে, আর ২০ শতাংশ নিয়ে কোনও দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা আশা করতে পারে না, তাকে জোট করতে হয়। জোট ছাড়া বিজেপি ৪০টা সাংসদ আসনের ৭-৮টাও পাবে না, বা বলা ভালো সেটা পেতেই প্রচুর ঘাম ঝরাতে হবে। ওদিকে লালু যাদব মুরগি, গরুর খাবার সাবড়ে দিতেই পারে কিন্তু বিজেপির সঙ্গে জোটে যাবে না। এক বিরাট মুসলমান ভোট, বেনিয়া ব্রাহ্মণ বিরোধী যাদব কুলের ভোটে বলীয়ান লালুর পক্ষে সেটা আত্মহত্যার সামিল। কংগ্রেস বিজেপি বা বাম বিজেপি জোট হবে না, বাকি তো রয়েছে কেবল নীতীশ আর তার দল, কারণ ওই পশুপতি বা চিরাগ পাসোয়ান আর দু টুকরো হওয়া লোক জনশক্তি পার্টি বা জিতন মাঞ্ঝির হিন্দুস্তানি আওয়াম মোর্চার ক্ষমতা সবার জানা, ওঁরা সাকুল্যে ৭-৮ শতাংশ ভোট জুড়তে পারবেন, কাজেই নীতীশই ভরসা। এবং এই রামমন্দির প্রাণপ্রতিষ্ঠার পরে বিজেপির কাছে কিন্তু এক্কেবারে আলাদা ফিডব্যাক, তাঁদের সমীক্ষকেরা, তাঁদের দলের ভেতরের নির্বাচনী পণ্ডিতেরা জানিয়েছেন ঠিক উল্টোটা, বিহার রামময় হয়নি, নীতীশ ছাড়া ভোটে লড়লে সাকুল্যে ৭-৮টার বেশি আসন জুটবে না। কাজেই কাজে নেমে পড়েছিল বিজেপি, এক তো বিহারে অবস্থান একটু ভালো হবে, দুই, ইন্ডিয়া জোটকে ধাক্কা দেওয়া যাবে, এক তির দো নিশানা। নীতীশকে ভাঙাল বিজেপি, অপারেশন লোটাস সাকসেস। যদিও এটাও ঘটনা যে এই বিজেপি-নীতীশ জোট টিকবে না, লোকসভা ভোটের পরেই মুখ্যমন্ত্রীত্বের প্রশ্নেই জোট ভাঙবে, যা খুশি তাই হতে পারে, কিন্তু একটা নিশ্চিত ঘটনা হবেই।

নীতীশের রাজনীতির উপসংহার লেখা কিন্তু হয়ে গেল, ওনার শেষ দিনগুলো না ঘর কা না ঘাটকা হয়েই থেকে যাবে। কিন্তু বিরোধী দলেরা, কংগ্রেস, লালু, বাম দলগুলো নীতীশের সঙ্গে জোটে রাজি হল কেন? বিরোধীদের ধারণা হয়েছিল, বিজেপির গিলে খাওয়ার চেষ্টার সামনে নীতীশের বিরোধী জোটে আসা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই, এবং পিছড়ে জাতির মানে নীতীশের কুড়মি, কৈরি জাতির ভোট যোগ হলে বিহারে বিজেপি ২-৩টের বেশি আসন পাবে না, এই হিসেব মাথায় রেখেই এর আগেও নীতীশ-লালু জোট হয়েছে, মহাগঠবন্ধন হয়েছে। এতক্ষণের আলোচনা থেকে একটা জিনিস তো পরিষ্কার যে, যে ধরনের জোটই হোক না কেন, তা কোনও আদর্শের ভিত্তিতে হয়নি, কোনও ধার থেকেই নয়, ছিল ভোটের ক্যালকুলেশন। বিভিন্ন জাতের ভোটের হিসেব নিকেশ, ছিল ধর্মের ভিত্তিতে ভোট ব্যাঙ্কের হিসেব নিকেশ। সংবিধান আদর্শ, ধর্ম নিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, নিদেনপক্ষে বিকাশ উন্নয়ন এসবই কথার কথা, ওগুলো চটকদার বাহানা, রংচংয়ে মোড়ক মাত্র, আসলে সব্বাই তাদের নিজেদের ঘর গোছানোর জন্য, ক্ষমতা দখলের জন্য জোট বেঁধেছে। এমনকী আমরা যারা সত্যিই ধর্মনিরপেক্ষ, সত্যিই আমাদের যাদের সংবিধানে আস্থা আছে, এক উদার গণতান্ত্রিক শাসন যাদের মাথায় আছে, সেই আমরাও যখন গত ১০ অগাস্ট বিজেপি জোট ছেড়ে এই নীতীশ কুমারই বেরিয়ে এসে মহাগঠবন্ধনের সরকার তৈরি করেছিলেন, তখন আমরাও তো কোনও প্রশ্ন করিনি, আমরাও তো তখন মনে মনেই আনন্দিত হয়েছিলাম। আজ ঠিক উল্টোটা হওয়ার পরে সেই আমরাই দুঃখিত, আমরাই পালটুরাম পালটুরাম বলে চিৎকার করছি সেই আমরাও তো তখনই জানতাম যে নীতীশ পালটুরাম। কেবল নির্বাচনী পাটিগণিত আর সরকার বানানোর, দখলে রাখার খেলেই যতদিন আমাদের রাজনীতির মূল বিষয় হয়ে থাকবে ততদিন এই নীতীশ কুমারেরা দল বদলাবেন। তবে আজ অন্তত একটা নিদান হাঁকার দিন এসেছে, মার্ক মাই ওয়ার্ড, নীতীশ কুমার এই লোকসভা নির্বাচনের পরে দল বদলানোর অবস্থাতেও থাকবেন না, তিনি দল বদলাতে চাইলেও আর বদলাতে পারবেন না, এইজন্য নয় যে দেশের রাজনৈতিক মূল্যবোধ হঠাৎ চাগাড় দিয়ে উঠবে। এইজন্য যে সব কিছুরই তো একটা এক্সপায়ারি ডেট থাকে, এই পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নীতীশ কুমারের রাজনীতির পরিসমাপ্তি ঘটে গেছে।

 

RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments