মান্না দে’র গান ‘স্বপন যদি মধুর এমন, হোক সে মিছে কল্পনা, জাগিও না আমায় জাগিও না’। পৃথিবীর সব নেতাদের এমন খোয়াব দেখার অভ্যেস আছে। হিটলার স্বপ্ন দেখেছিলেন গোটা পৃথিবীকে শাসন করার, ইংরেজরা তারও আগে এই খোয়াব দেখেছিলেন, হাজার হাজার তরুণ সত্তরের দশকে এই বাংলাতে মুক্তির দশকের স্বপ্ন তো দেখেছিল। স্বপ্ন নিয়ে সিগমুন্ড ফ্রয়েড সাহেবের কথা সবাই মানেন। উনি বলেছিলেন, মনের অবচেতনে লুকিয়ে থাকা চাহিদাগুলোই অচানক এক রাতে স্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়। কৈশোর থেকে যৌবনের দোরগোড়ায় তাই স্বপ্নে আসেন দেবানন্দ, বৈজয়ন্তিমালা, শাহরুখ খান, কাজল বা রণবীর কাপুর, আলিয়া ভাট। ওই মনের কোণায় লুকিয়ে থাকা চাহিদা ঝর্ণার মত নেমে আসে স্বপ্নে, কাজেই স্বপ্ন দেখা নতুনও নয়, অন্যায়ও নয়। কিন্তু সমস্যা হল দিবাস্বপ্ন নিয়ে, দিব্যি জেগেই আছে, চক্ষুখানি আজাড় করে খোলা, কিন্তু তিনি স্বপ্ন দেখছেন। হয় নাকি? হয় হয়। অনেকেই দেখেন, আসলে সেগুলো স্বপ্নও নয়, কষ্টকল্পনাও বলা যায়। আমাদের বঙ্গ বিজেপির ইনটেলেকচুয়াল সভাপতি সেরকম এক পিস স্বপ্ন দেখেছেন কেবল নয়, বলেও ফেলেছেন। সাংবাদিকদের সামনেই বলেছেন “কলকাতায় টি-২০ বিশ্বকাপের ম্যাচ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সম্প্রতি কলকাতা পুলিশ যে বৈঠক করেছে, আগামী জুনে সেই বৈঠক আবার করতে হবে। এবং সেই বৈঠক হবে বর্তমান বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে।” শিহরিত হওয়ার মতো কথা, ‘অবকি বার দোশ পার’-এর মতো একটা গোল গোল স্লোগান নয়, এক্কেবারে স্পেশিফিক ইনফর্মেশন, পুলিশ কর্তাদের মিটিংয়ে বসতে হবে শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে। কিন্তু পরিষ্কার করে বলেননি যে, শান্তিকুঞ্জের খোকাবাবু পুলিশ মন্ত্রী না মুখ্যমন্ত্রী, কোনটা হবেন? সেটাই বিষয় আজকে, শুভেন্দু অধিকারী, ২০২৬-এ মুখ্যমন্ত্রী হবেন? না পুলিশমন্ত্রী?
২০১৯-এ হঠাৎ দুই থেকে এক লাফে ১৮ হওয়ার পরে বিজেপিতে নবজোয়ার এসেছিল। যদিও সেদিনেই খুব পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, বামের ভোট ফুটকি লাগিয়েই রামে গিয়েছে, তার জন্যই ওই ফলাফল। তবুও এক গেল গেল রব উঠেছিল, অনেকে মনে করে দিয়েছিল ২০০৯ লোকসভা নির্বাচনের কথা, সেবারে তৃণমূল আগের বারের একটা থেকে বেড়ে ১৯টা হয়েছিল। কিন্তু অনেকেই যেটা ভুলে যান, তা হল তার আগের লোকসভাতে তৃণমূলের ২১ শতাংশের বেশি ভোট ছিল, আর ২০০৯-এ কংগ্রেসের ভোট জুড়েছিল, সব মিলিয়েই ওই জয় এসেছিল। কাজেই ২০১৯ কোনও বিরাট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়নি। কিন্তু ওই যে দিবাস্বপ্ন। ২০২১-এ সে কী উল্লাস, এবারে তো এসে গিয়েছেন শান্তিকুঞ্জের মেজ খোকা, এসে গিয়েছেন রাজীব ব্যানার্জী, আরও কিছু তৃণমূল নেতা, কাজেই সেই উল্লাসমাখা চাহিদা থেকে স্বপ্ন জন্ম নিল, ২০২১-এ দোশ পার করার সিদ্ধান্ত। টলিউডে অসাধারণ ট্যাক্সি ড্রাইভার, পকেটমার, বাস কনডাক্টারের অভিনয় করা রুদ্রনীল মমতা মায়ের দেওয়া এক লাখি চাকরি আর নীল বাতি ছেড়ে জানিয়েই দিয়েছিলেন, “আমার কিন্তু তথ্য সংস্কৃতি চাই”, দিলীপবাবু আর খোকা শুভেন্দুর মধ্যে টানা চাপা লড়াই, ‘কোন বনেগা মুখ্যমন্ত্রী!’
আরও পড়ুন: Aajke | ও শুভেন্দুদা, আপনার রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশি গেল কোথায়?
আমরা তো সেসব দেখেছি, এসেই যাচ্ছে যখন বিজেপির রাজত্ব আমরাই বা পিছিয়ে থাকি কেন বলে টালিগঞ্জের যতেক ঝিঙ্কু মামণিরা যোগদান শিবির আলো করে বিজেপিতে যোগ দিলেন, শতাব্দী হইয়াছেন আম্মো হইবো। তাপ্পর? তাপ্পর যা হয়, তাই হয়েছিল। নটে গাছটি মুড়োল, আমার গল্প ফুরোলো! রূপকথার গল্প তো এই বলেই শেষ হয়। গল্প শেষ হল। সেই গল্প আবার চাগিয়ে উঠেছে, স্বয়ং সভাপতি জানিয়ে দিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী না হলেও, অন্তত পুলিশমন্ত্রী তো হচ্ছেন আমাদের শুভেন্দু অধিকারী। আগামী টি-টোয়েন্টি ম্যাচের ব্যবস্থাপনা নাকি উনিই দেখভাল করবেন। আচ্ছা শমীকবাবু জানেন, এই যে পাড়া কাঁপিয়ে এসআইআর চলছে, তাতে বিজেপির ৬০ শতাংশ বুথে বিএলএ নেই। মানে বুথ লেভেলে কাজ করার লোক নেই, এমনি এমনিই সমীকরণ হয়ে যাবে? বাংলার রাজনৈতিক পরিবর্তনের দুটো শর্ত আছে – (১) মাটিতে দখল থাকতে হবে, এক জবরদস্ত সংগঠন থাকতে হবে। যাঁরা বলেন কেউ কোথাও ছিল না জরুরি অবস্থার পরে দুম করে বাম সরকার এসে গিয়েছিল, তাঁদের সিপিএম-এর সাংগঠনিক শক্তি সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই। আবার ২০১১-তে বুথ কামড়ে পড়েছিল তৃণমূল কর্মীরা। (২) এক বড় রকমের ভোট শিফট দরকার, ভাগাভাগি দরকার। ৭৭-এ জনতা দল আর কংগ্রেসের ভোট ভাগাভাগির হিসেবটা দেখুন বুঝতে পারবেন। ২০১১-তে বা ২০০৯-এ কংগ্রেসের ভোট জুড়েছিল তৃণমূল ভোটের সঙ্গে, ওই ভোট না জুড়লে পরিবর্তন হতই না। আজ কোন ভোট জুড়বে? আর বিজেপির সেই মাটি কামড়ে পড়ে থাকার সংগঠন কোথায়? না শমীকবাবু বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস পড়ুন, এখানে ঝট বলতে পট পরিবর্তন হয় না, আর পরিবর্তনের শর্তগুলোর কোনওটাই এখন বিজেপির পক্ষে নয়। কাজেই কেবল গ্যালারি গরম করে লাভ নেই। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, “শমীক ভট্টাচার্য বঙ্গ বিজেপির সভাপতি বলেছেন আগামী টি-টোয়েন্টি ম্যাচের ব্যবস্থাপনার জন্য পুলিশ কর্তাদের শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠকে বসতে হবে। মানে ২০২৬-এ বিজেপিই ক্ষমতায় আসছে, এই কথাই বলতে চেয়েছেন, আপনারা ওনার বক্তব্যের সঙ্গে কতজন কতখনি সহমত?
একটা খবরকে একই দিক থেকে না দেখে বিভিন্ন অ্যাঙ্গল থেকে অ্যানালিসিস করার কথা আমাদের সিনিয়র সাংবাদিকরা প্রায়ই বলেন, তো আমিও সেরকম একটা চেষ্টা করে দেখলাম। বঙ্গ বিজেপির সভাপতি ইনটেলেকচুয়াল শমীক ভট্টাচার্যের এই বক্তব্যের তিনটে সম্ভাবনা আছে। (১) বিজেপি জিতল, শুভেন্দুবাবু মুখ্যমন্ত্রী হলেন, সঙ্গে পুলিশমন্ত্রীর দায়িত্বও রাখলেন, কাজেই উনিই মিটিংয়ে বসবেন, স্বাভাবিক। (২) বিজেপি জিতল, কিন্তু শুভেন্দুবাবুকে মুখ্যমন্ত্রী না করে অন্য কেউ বসলেন সেই গদিতে, শুভেন্দুবাবু কেবল পুলিশমন্ত্রী হয়ে পুলিশদের সঙ্গে বৈঠকে বসলেন। (৩) বিজেপি বিরাটভাবে হারল, শুভেন্দু বাবু দল ছেড়ে তৃণমূলে গেলেন এবং হোম পার্সোনাল হাতে রেখে, বাকি পুলিশের দায়িত্ব আবার দলে যোগ দেওয়া শুভেন্দুকেই দিলেন দিদিমণি, তাহলেও শুভেন্দু অধিকারী কিন্তু পুলিশ বৈঠকে বসবেন। তাই না? আপনাদের কোন অপশনটা মনে হচ্ছে?








