কলকাতা: চিকিৎসকদের তৎপরতা ও দক্ষতায় প্রাণে বাঁচলেন মোটরবাইক দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম এক ব্যক্তি। মোটরসাইকেলের পিছনের আসনে বসে যাত্রাকালীন দুর্ঘটনায় তাঁর গলার ডান দিকে মারাত্মক আঘাত লাগে। সেই আঘাতে ঘাড়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিরা ছিঁড়ে গিয়ে ব্যাপক রক্তক্ষরণ শুরু হয়। সংকটজনক পরিস্থিতিতে দ্রুত অস্ত্রোপচার করে রোগীর প্রাণ বাঁচান চিকিৎসকেরা।
মুকুন্দপুরের নারায়ণা আরএন টেগোর হাসপাতালে (Narayana RN Tagore Hospital) তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি করা হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভোগা ওই ব্যক্তি হাসপাতালে পৌঁছনোর সময় তাঁর গলা থেকে অনবরত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তিনি ছিলেন তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় এবং শারীরিক অবস্থাও ছিল অত্যন্ত সংকটজনক। জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা ও শারীরিক স্থিতি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন। এরপর তাঁকে সরাসরি অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকদের মতে, ঘাড়ের ভেতরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালিতে আঘাতজনিত এই ধরনের ‘পেনিট্রেটিং নেক ইনজুরি’ অত্যন্ত বিরল এবং জীবনহানির ঝুঁকি বহন করে। কারণ ঘাড়ের মধ্যেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ধমনি, শিরা, স্নায়ু ও শ্বাসনালির মতো সংবেদনশীল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।
অস্ত্রোপচারের আগে রোগীর শারীরিক পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য আর্টেরিয়াল ব্লাড গ্যাস বিশ্লেষণ ও সিটি ব্রেন স্ক্যান করা হয়। তবে চলমান রক্তক্ষরণের কারণে সময় নষ্ট না করে জরুরি অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা দেখতে পান, রোগীর ইন্টারনাল জাগুলার ভেন বা ঘাড়ের একটি প্রধান শিরা কলারবোনের পিছনে থাকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিরা থেকে সম্পূর্ণ ছিঁড়ে গিয়েছে। ক্রমাগত রক্তক্ষরণ, ক্ষতস্থানের গভীর অবস্থান এবং আশপাশে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালি থাকায় অস্ত্রোপচার ছিল অত্যন্ত জটিল।
আরও পড়ুন: ধেয়ে আসছে তুমুল দুর্যোগ! ভারী বৃষ্টিতে ভাসবে একাধিক জেলা! কমবে দহনজ্বালা?
হাসপাতালের ইএনটি ও হেড-নেক অনকোলজি বিভাগের কনসালট্যান্ট চিকিৎসক ডা. অগ্নিভ বসু বলেন, “রোগীকে অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। দ্রুত রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালিকে চিহ্নিত করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে আনার পর অস্ত্রোপচারে যোগ দেয় ভাসকুলার সার্জারি দল। ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালির মেরামত এবং বক্ষগহ্বরে অন্য কোনও আঘাত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়।
ভাসকুলার ও থোরাসিক সার্জন ডা. মনুজেশ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “কলারবোনের পিছনে থাকা গভীর রক্তনালিতে আঘাত লাগায় অস্ত্রোপচার অত্যন্ত কঠিন ছিল। দ্রুত রক্তক্ষরণ বন্ধ করা, সময়মতো রক্তনালির পুনর্গঠন এবং বিভিন্ন বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টাই রোগীকে সুস্থ করে তুলতে সাহায্য করেছে।”
প্রায় আড়াই ঘণ্টার এই অস্ত্রোপচারে অ্যানাস্থেসিয়া বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অস্ত্রোপচারের পর পরীক্ষায় রোগীর বুকের মধ্যে রক্ত জমার বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে ইন্টারভেনশনাল রেডিওলজি বিভাগের সাহায্যে বিশেষ পদ্ধতিতে সেই জমাট রক্ত বের করে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ভাসকুলার সার্জন, অ্যানাস্থেসিওলজিস্ট এবং ইন্টারভেনশনাল রেডিওলজিস্টদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ দল রোগীর উপর নিবিড় নজরদারি চালায়। ধীরে ধীরে তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয় এবং সাত দিনের চিকিৎসার পর তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
নারায়ণা হেলথের গ্রুপ সিওও আর. ভেঙ্কটেশ বলেন, “দুর্ঘটনাজনিত আঘাত এখনও প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এই ধরনের ক্ষেত্রে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা পাওয়া গেলে প্রাণ বাঁচানোর সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। এই ঘটনাটি উন্নত জরুরি পরিষেবা এবং সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।”
নারায়ণা হেলথ (ইস্ট)-এর ডিরেক্টর ও ক্লাস্টার হেড অভিজিৎ সি. পি. জানান, “এই জটিল ট্রমা কেসের সফল চিকিৎসা আমাদের জরুরি পরিষেবা ও বহুমুখী বিশেষজ্ঞ দলের দক্ষতারই প্রমাণ। দ্রুত সিদ্ধান্ত, নিখুঁত অস্ত্রোপচার এবং সমন্বিত চিকিৎসাই রোগীর জীবন রক্ষা করেছে।”
দেখুন আরও খবর:







