ওয়েবডেস্ক- সামনেই বিধানসভা ভোট (Assembly Election) । সেই নির্বাচনের আবহে রাজ্যের একাধিক জায়গায় বোমাতঙ্ক (Bomb threat) । রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলিতে এই ধরনের হুমকি মেল পাঠানো হচ্ছে। গতকাল আসানসোল আদালত সহ কলকাতার সিটি ও ব্যাঙ্কশাল আদালতে বোমাতঙ্ক ছড়ায়। মেলে হুমকি বার্তা দেওয়া হয়। আজও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri) , কাঁথি (Kanthi) , দার্জিলিং (Darjeeling) জুড়ে বোমা আতঙ্ক ছড়াল। ফলে কাল থেকে আজ পর্যন্ত চিত্রটা একই রকম।
জলপাইগুড়ি হেড পোস্ট অফিস বিল্ডিং (Jalpaiguri Head Post Office Building) বোম দিয়ে উড়িয়ে দেবার হুমকি মেল, আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ঘটনাস্থলে বিশেষ পুলিশি তল্লাশি। রাজ্যের বেশ কিছু পোস্ট অফিসের সঙ্গে বৃহস্পতিবার জলপাইগুড়ি জেলার মুখ্য ডাক ঘরে আসা এক ই-মেল বার্তায় রীতিমত হুমকি দিয়ে জানানো হয় পোস্ট অফিসে আসা পার্সেলের মধ্যে আরডিএক্স রয়েছে। এমন বার্তা পেতেই নড়েচড়ে বসে জেলার প্রধান ডাক ঘর কর্তৃপক্ষ।
খবর পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান জলপাইগুড়ি কোতোয়ালি থানার আইসি সঞ্জয় দত্তের নেতৃত্বে বোম স্কোয়াড, পুলিশ কুকুর সহ জেলা গোয়েন্দা বিভাগের উচ্চ পদস্থ আধিকারিকেরা। এই প্রসঙ্গে জেলা গোয়েন্দা দফতরের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ই মেলে একটি হুমকি দেওয়া হয়েছে, ঠিক যেমনটি রাজ্যের অন্যান্য পোস্ট অফিসগুলোতে দেওয়া হয়েছে। আমরা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।

অপরদিকে এই প্রসঙ্গে জলপাইগুড়ি হেড পোস্ট অফিসের পোস্ট মাস্টার, দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য বলেন, বোম স্কোয়াড এসেছিল, পুলিশ কুকুর দিয়ে তল্লাশি চালিয়ে পোস্ট অফিসে আসা সাধারণ গ্রাহকদের আতঙ্ক দুর করে। এই মুহূর্তে স্বাভাবিক কাজ কর্ম চলছে।
একই চিত্র ধরা পড়ল দার্জিলিংয়েও। ‘দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে বিস্ফোরণের উদ্দেশ্যে ১৯টি সায়ানাইড গ্যাস মিশ্রিত RDX IED আপনার পাসপোর্ট দফতরে রাখা হয়েছে। নিরাপদ থাকতে দুপুর ১২টার মধ্যে সমস্ত কর্মীদের নাক–মুখ ঢেকে পাসপোর্ট দফতর খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়, এই মর্মে একটি ই-মেল কলকাতার (Kolkata) যোগাযোগ ভবনস্থিত চিফ পিএমজি, পশ্চিমবঙ্গ সার্কেল দার্জিলিং পোস্ট অফিসের (Darjeeling Post Office) প্রধানকে পাঠানো হয়। ই-মেলটি পাওয়ার পর দার্জিলিং পোস্ট অফিসের কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পোস্ট অফিসের উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দিলে সঙ্গে সঙ্গে দার্জিলিং DIB (ডিস্ট্রিক্ট ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ)-এর একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তল্লাশি চালায়। তবে কোনো সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া যায়নি। এরপর DIB দল কর্মীদের জানায় যে ভয়ের কোনও কারণ নেই এবং স্বাভাবিকভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। পরবর্তীতে পাসপোর্টের কাজ আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে শুরু হয় বলে পোস্ট অফিস সূত্রে জানা গেছে। কেন দার্জিলিং পোস্ট অফিসে বোমা হুমকি এল?
আরও পড়ুন- রাজ্যে আসছে ২৪০ কোম্পানি কোথায় কত কেন্দ্রীয় বাহিনী? নজরে শুভেন্দুর ‘গড়’
এই প্রসঙ্গে প্রাপ্ত ই-মেলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তামিলনাড়ুর কনস্টেবলদের নাকি অভিনেত্রী নিবেথা পেথুরাজ ও অন্যান্য DMK-র সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িত ব্যক্তিদের কাপড়চোপড় ও নোংরা বাসনপত্র পরিষ্কার করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এর ফলে কনস্টেবলদের অপমান ও শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
১৯৭৯ সালের নৈনার দাস পুলিশ ইউনিয়নের সুপারিশ তামিলনাড়ুতে কার্যকর করার দাবিতে আজাদ কাশ্মীরের পাক আইএসআই সেলের কিউ ব্রাঞ্চের সদস্যরা পাসপোর্ট অফিসগুলিকে নিশানা করার হুমকি দিয়েছে বলে ই-মেলে জানানো হয়।

ই-মেলে আরও বলা হয়েছে, এ ধরনের বিস্ফোরণের মাধ্যমেই তাদের দাবি আদায় সম্ভব, এর বাইরে অন্য কোনো উপায় নেই। পাশাপাশি ক্ষমা চেয়ে তামিলনাডু ও কলকাতার পোস্ট অফিসগুলিতে এই ই-মেল পাঠানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধরনের ই-মেল কলকাতা পোস্ট অফিস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দার্জিলিং পোস্ট অফিসের পাসপোর্ট দফতর খালি করার নির্দেশ কলকাতা থেকে দেওয়া হয়।
দার্জিলিংয়ের পুলিশ সুপার প্রতীক্ষা ঝারখারিয়া জানান, এই হুমকি সরাসরি দার্জিলিং পোস্ট অফিসে আসেনি, বরং কলকাতা অফিসে এসেছে। যেহেতু পাসপোর্ট শাখা দার্জিলিং পোস্ট অফিসে অবস্থিত, তাই কলকাতা অফিস নিরাপত্তার স্বার্থে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দার্জিলিংয়ের পাসপোর্ট দফতর খালি করার নির্দেশ পাঠায়।
পুলিশ দল পাসপোর্ট দফতর ও পোস্ট অফিসে পূর্ণাঙ্গ তল্লাশি চালিয়েছে। কোনও প্রকার ভয়ের কারণ নেই বলে পুলিশ সুপার আরও জানান।
এর পরেই এই একই ঘটনা সাক্ষী থাকল কাথিঁ। কাথিঁর প্রধান ডাকঘরে (Kanthi main post office) বোমাতঙ্ক, মুহূর্তে খালি করা হল ডাক বিভাগ। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কাঁথি প্রধান ডাক ঘরে বোমাতঙ্ক। বোমাতঙ্ককে ঘিরে কাঁথি শহরে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। আজ সকাল ১১:৩০ মিঃ নাগদ কাঁথি প্রধান ডাক ঘরে মেল করে জানানো হয় ডাক ঘরের পাসপোর্ট ডিপার্টমেন্টে আর ডি এক্স বিস্ফোরক রাখা আছে। আরও বলা হয় দুপুর ১:৩০ মিঃ নাগাদ বিস্ফোরণ করা হবে। মেল আসার সাথে সাথেই ডাক বিভাগের কর্মীদের মধ্যে অফিসের বাইরে বেরোনোর জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। সাথে সাথে খালি করে দেওয়া হয় পোস্ট অফিস।
আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পথ চলতি মানুষদের মধ্যে। খবর পেয়েই ছুটে যায় কাঁথি থানার পুলিশ। খবর দেওয়া হয় বোম্ব স্কোয়াডকে। পাশাপাশি তমলুক মুখ্য ডাকঘরে বোমাতঙ্ক! হুমকি ইমেল ঘিরে হুলুস্থুল, প্রাণভয়ে দৌড় কর্মী-গ্রাহকদের। ভরা দুপুরে তখন কাজকর্মে সরগরম ডাকঘর। কেউ টাকা জমা দিচ্ছেন, কেউ বা কাউন্টারে লাইনে দাঁড়িয়ে জরুরি চিঠিপত্র পাঠাতে ব্যস্ত। ঠিক সেই সময়ই পোস্টমাস্টারের কম্পিউটারে এসে পৌঁছল একটি ইমেল। আর সেই ইমেলের বয়ান পড়তেই কার্যত রক্ত হিম হওয়ার জোগাড় কর্তৃপক্ষের। সাফ জানানো হয়েছে— ‘ডাকঘরে বোমা রাখা আছে, অবিলম্বে অফিস খালি করুন।’
বৃহস্পতিবার দুপুরে এই ইমেল ঘিরেই তীব্র চাঞ্চল্য ছড়াল তমলুক মুখ্য ডাকঘরে। মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বোমাতঙ্ক। প্রাণভয়ে অফিস ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন প্রায় ২০০ জন গ্রাহক ও ডাককর্মী। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় তমলুক থানার পুলিশ।
ডাকঘর সূত্রে খবর, এদিন বেলা ১২টা নাগাদ পোস্টমাস্টারের কাছে একটি উড়ো ইমেল আসে। সেখানে দাবি করা হয়, ডাকঘর চত্বরে বিস্ফোরক লুকানো আছে। কোনও ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত গোটা ভবন খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয় ওই মেলে। বিষয়টি জানাজানি হতেই হুড়োহুড়ি পড়ে যায় ভেতরে। কাউন্টার ছেড়ে বেরিয়ে আসেন কর্মীরা, আতঙ্কে ছুটতে থাকেন গ্রাহকরাও। পোস্টাল এজেন্টরাও তড়িঘড়ি নিজেদের নথিপত্র গুছিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন।
ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত সাধারণ মানুষ থেকে এজেন্টরা। দীর্ঘদিনের পোস্টাল এজেন্ট তরুণ কুমার জানা বলেন, “আমাদের অফিস থেকে জানানো হয় যে, সাড়ে এগারোটা নাগাদ একটা মেল এসেছে। আমাদের বলা হয় আপনারা দুপুর ২টো পর্যন্ত বাইরে থাকুন, যে কোনও মুহূর্তে বিপদ হতে পারে। ওনারা তড়িঘড়ি সমস্ত গ্রাহক ও কর্মীদের বাইরে বের করে দেন। এমন ঘটনা এখানে আগে কখনও ঘটেনি। আমরা ভীষণ উদ্বিগ্ন।”
একই সুর শোনা গেল আর এক এজেন্ট ফাল্গুনী ভট্টাচার্যের গলায়। তিনি জানান, “বোমাতঙ্ক ঘিরে রীতিমতো হুলুস্থুল পড়ে যায়। সেই সময় কর্মী ও গ্রাহক মিলিয়ে প্রায় ২০০ জন ভেতরে ছিলেন। ওপর মহল থেকে ইমেল মারফৎ খবর আসার কথা শুনেই সবাই দৌড়ে বাইরে চলে আসি।”
খবর পেয়েই এলাকায় পৌঁছয় পুলিশ বাহিনী। গোটা এলাকাটি ঘিরে ফেলা হয়। ইমেলটি কোথা থেকে এবং কেন পাঠানো হলো, তার নেপথ্যে কোনও নাশকতার ছক রয়েছে নাকি কেউ নিছক আতঙ্ক ছড়াতে এই কাজ করেছে, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তবে এই ঘটনায় জেলা সদর তমলুকের নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল।







