বিজেপি ‘রাম রাজত্ব’ চায়, হ্যাঁ, সেই রাজা আর প্রজাদের যুগ ফিরিয়ে আনতে চায়। মুখে তারা বংশানুক্রমিক শাসনের বিরাট বিরোধী হলে কী হবে, তারা আসলে চায় দশরথের বড় ছেলেই রাজা হবে, তারা শুদ্রের সন্তানকে শিক্ষার আওতার বাইরেই রাখতে চায়, তারা এক মধ্যযুগীয় শাসন চায়, যেখানে নির্বাচন থাকবে না, থাকবে না সংবিধান। হ্যাঁ, এটাই বিজিপের কোর বিলিফ, এক্কেবারে মগজে গেঁথে থাকা বিশ্বাস। কাজেই সংসদীয় রীতিনীতি ইত্যাদি তাদের কাছে মূল্যহীন, সময় আর সুযোগ পেলেই সেসব রীতি নীতিকে তারা বুড়ো আঙুল দেখাতেই পারে, আপাতত তাদের লক্ষ্য হল, যে কোনও মুল্যে, যে কোনও উপায়ে ক্ষমতা দখল করা, আমাদের রাজ্যে ভোটের আগে বিজেপির সেই উদগ্র বাসনার বিকৃত চেহারাটা এক্কেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। রাহুল গান্ধী ধরেছিলেন ঠিকই, তবে পরে, অনেক পরে, ততক্ষণে ভোট শেষ, কিন্তু বাংলাতে সেই খেলাটা জমল না, এক্কেবারেই জমছে না। সেটা আজ পরিস্কার, বিভিন্ন জেলা থেকে, বিভিন্ন কন্সটিচুয়েন্সি থেকে খবর আসছে একলপ্তে পাড়ার ১০০-১৫০-২০০-২৫০ জনের নাম বাদ। তাঁদের নাম ২০০২-এ ছিল, তাঁদের নামে কোনও লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নেই, তাঁরা গত ৩-৪-৫-৬-টা ভোটে ভোট দিয়েছেন, তাঁরা স্থায়ী বাসিন্দা, প্রত্যেকের আধার কার্ড আছে, ভোটার কার্ড আছে। কিন্তু তাঁদের নাম বাদ পড়েছে, কেন? তাঁদের নামে জমা পড়েছে ফর্ম সেভেন, কেউ বা কোনও একজন জানিয়েছেন, ইনি ভোটার তালিকাতে থাকার যোগ্য নন, কাজেই তাঁদের নাম বাদ পড়েছে। সেটাই বিষয় আজকে, ‘ফর্ম নম্বর সাত’, বিজেপির হাতিয়ার।
বামেদের ভোট ট্রান্সফারে হঠাৎ ক্ষমতা দখলের খোয়াব দেখা বিজেপি তৃণমূল ভেঙেছে, পিলপিল করে এসেছে ইডি, সিবিআই-এর দল, রেড পড়েছে তৃণমূলের বড়, মাঝারি ছোট নেতা থেকে সেই সব ব্যবসায়ীদের বাড়ি বা দফতরে, যারা তৃণমূল ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত, তাও দখলে আসেনি মসনদ। এরপরে রাজ্যজুড়ে দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা, তুমুল সংখ্যলঘু ঘৃণা ছড়িয়েও লাভ হয়নি। তার পরে চেষ্টা করেছে সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্কে ফাটল ধরানোর, তাতেও খুব একটা কিছু হয়নি। এর পরে স্পেশ্যাল ইনটেনসিভ রিভিশন, খসড়া ভোটারে খুব বিরাট কিছু বাদ পড়েনি, উলটে মতুয়া বেল্টে, রাজবংশী বেল্টে আঘাত পড়েছে, ব্যুমেরাং হয়েছে এসআইআর। তখন এসেছে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির ম্যাজিক, বহু মানুষের নাম নাকি বিচারাধীন, বাঙালি বিচারাধীন, কিন্তু সেটাও এখন বোঝাই যাচ্ছে খুব একটা কাজে দেবে না, কারণ রাজ্য শুদ্ধু মানুষ জানিয়ে দিয়েছেন, ওই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির প্যাঁচে ফেলা মানুষজনকে বাদ দিয়ে ভোট হবে না। হ্যাঁ, মমতা আবার রাজপথে। কাজেই সে ছকে খুব বেশি এগোন যাবে না। কিন্তু এরই মধ্যে কেবল ফর্ম সাত জমা করে বাদ পড়েছে প্রায় ৫ লক্ষের বেশি ভোটার, আর এখন বহু জেলা থেকে সেই খবর আসতে শুরু করেছে।
আরও পড়ুন: Aajke | রাহুল সিনহার দিল্লি যাত্রা, বঙ্গ বিজেপির শেকড়ে ফেরা
হ্যাঁ, ওই শুরুর দিকেই বিজেপি নেতার গাড়ি থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি ফর্ম সেভেন উদ্ধার হয়েছিল, একজন কটা ফর্ম সেভেন জমা করতে পারবে, সে নিয়মও বদলে ফেলা হয়েছিল, কাজেই খুব ঠান্ডা মাথায় এক্কেবারে বিজেপি বিরোধী ভোটারদের নামই বাদ পড়েছে, বা বলা ভালো বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্তত ৭০-৮০টা কেন্দ্রে, যেখানে ৫-৭ শতাংশ ভোটের মার্জিনে তৃণমূল জিতেছিল ২০২১-এ, এক্কেবারে সেই আসনগুলোই এবারের টার্গেট, সেই আসনগুলোতে ওই ফর্ম সেভেনের ম্যাজিক দেখানোর চেষ্টা চলছে। কে জিতবে? কার জেতা উচিত? কে হারবে? সেসব পরের কথা, আমার আপনার সহনাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা চলছে, এখনই রুখে দাঁড়াতে হবে, এখনই আপিল করতে হবে, যদি সামূহিক ডিলিশন হয়ে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক দলের লোকজন রুখে দাঁড়ান, বিজেপি মানুষের রায়কে চুরি করে ক্ষমতায় আসতে চায়, কারণ তারা জানে একবার ক্ষমতায় এলে বুলডোজারের চাপে সমস্ত প্রতিরোধ আর প্রতিবাদ ভেঙে চুরমার করে তারা তাদের রাজত্বকে ধরে রাখবে। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, গোছায় গোছায় ফর্ম সেভেন ভরে বহু এলাকার মানুষের নাম বাদ দিয়ে বিজেপির নেতারা যে ষড়যন্ত্র করেছে তা কি আপনারা জানেন? আপনাদের এলাকাতেও কি এরকম খবর আছে? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
এতদিন মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিত, বিভিন্ন দলের নেতা কর্মীরা, ভোট এলেই ‘মাছ কুটলে মুড়ো দেব’, ‘গাই বিয়লে দুধ দেব’ গোছের ঢালাও প্রতিশ্রুতির কথা শোনা যেত। কিন্তু এখন দিন বদলেছে। সরকার আসবে, সরকার যাবে, বিভিন্ন ইস্যুতে প্রচার হবে পক্ষে বা বিরুদ্ধে, কিন্তু এরকম কদর্যভাবে নির্বাচন কমিশনকেই কাজে লাগিয়ে বিজেপি যেভাবে ক্ষমতা দখলের ছক কষছে তা অভূতপূর্ব। সংসদীয় ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে এক স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা লাগু করার জন্যই এগুলো করা। আসলে বিজেপি সংসদীয় রীতিনীতিকে একেবারে জলাঞ্জলি দিয়ে এক মধ্যযুগীয় শাসন ব্যবস্থায় নিয়ে যেতে চায় আমাদের। আমাদের সেই চেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে।
দেখুন আরও খবর:








