ওয়েব ডেস্ক: হাঁটুর যন্ত্রণায় (Knee Pain) একসময় কাজ চালিয়ে যাওয়াই কঠিন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু পেশার সঙ্গে আপস করতে চাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত ‘সোনার হাঁটু’ প্রতিস্থাপন করিয়ে আবার আগের মতোই কর্মক্ষেত্রে ফিরেছেন ৫৫ বছর বয়সি এক নার্স। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিনে এই ঘটনা যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, শারীরিক শত বাধার কাছেও নারীশক্তির জয় হয়।
আজ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস। সংসার, সন্তান, পেশা- সব সামলে প্রতিদিন লড়াই করে এগিয়ে চলেছেন অসংখ্য নারী। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই চলার পথেই অনেক সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় হাঁটুর ব্যথা। বিশেষ করে ৪০-৫০ পার করার পর বহু মহিলার কাছে এই সমস্যা প্রায় নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। কর্মক্ষেত্রে নিজের জায়গা তৈরি করলেও হাঁটুর যন্ত্রণা অনেক সময় তাদের কর্মক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়। ফলে ইচ্ছাশক্তি থাকলেও আপস করতে হয় জীবনযাত্রার সঙ্গে।
আরও পড়ুন: দিল্লিতে দেশের প্রথম ‘রিং মেট্রো’ উদ্বোধন মোদির
তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে এখন সেই বাধা কাটানোর নতুন পথও তৈরি হয়েছে। সাধারণ হাঁটু প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি এখন আলোচনায় এসেছে ‘সোনার হাঁটু’। বিশেষ ধরনের কোটিং দেওয়া কৃত্রিম হাঁটু প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা সম্ভব বলেই জানিয়েছেন এশহরের অন্যতম অর্থোপেডিক সার্জন ডা. অর্ণব কর্মকার।
৫৫ বছর বয়সি নার্স পিয়ালী দেবীর (নাম পরিবর্তিত) ঘটনাই তার উদাহরণ। কয়েক বছর আগে হাঁটুর তীব্র সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। কিন্তু পেশার সঙ্গে কোনও আপস করতে চাননি। নার্সিং পেশায় সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়, প্রচুর হাঁটাচলা করতে হয়। তাই সাধারণ হাঁটু প্রতিস্থাপন করলে তা ১০-১২ বছরের বেশি টিকবে না, এই আশঙ্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধান্ত নেন বিশেষ ধরনের ‘সোনার হাঁটু’ দিয়েই প্রতিস্থাপন করাবেন। অস্ত্রোপচারের পর আবার আগের মতোই কর্মব্যস্ত জীবনে ফিরেছেন তিনি।
কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জন ডা. কর্মকার। তিনি বলেন, বর্তমানে অল্প বয়সেই অনেককে হাঁটু প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হচ্ছে। বিশেষ করে দুর্ঘটনা বা হাড়ের ক্ষয়ের কারণে যাঁদের দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকতে হবে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই বিশেষ ধরনের কোটিং দেওয়া ইমপ্লান্ট ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
কী এই ‘সোনার হাঁটু’ (Gold Knee Implant)?
আসলে এটি সম্পূর্ণ সোনার তৈরি হাঁটু নয়। এটি কৃত্রিম হাঁটুর উপর বিশেষ ধরনের কোটিং। সাধারণত হাঁটু প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে যে ইমপ্লান্ট ব্যবহার করা হয় তা কোবাল্ট-ক্রোমিয়াম ধাতু দিয়ে তৈরি। বর্তমানে সেই ধাতুর উপর টাইটেনিয়াম নিয়োবিয়াম নাইট্রাইড কোটিং দেওয়া হচ্ছে। এই কোটিংয়ের রং সোনার মতো হওয়ায় একে অনেকেই ‘সোনার হাঁটু’ বলে থাকেন।
চিকিৎসকদের মতে, এই কোটিং ধাতুর উপর একটি সুরক্ষা স্তর তৈরি করে। ফলে ধাতুর ক্ষয় কম হয় এবং ইমপ্লান্টের আয়ু অনেক বেশি হয়। যেখানে সাধারণ কৃত্রিম হাঁটু ১৫-২০ বছরের মধ্যে ক্ষয়ে যেতে পারে, সেখানে এই কোটিংযুক্ত হাঁটু দীর্ঘদিন কার্যকর থাকতে পারে। পাশাপাশি মেটালের সরাসরি সংস্পর্শ কম হওয়ায় শরীরে অ্যালার্জি বা অন্য প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও কম থাকে।
সাধারণ হাঁটু প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে বহু রোগী দীর্ঘদিন ভাল থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আবার সমস্যা দেখা দিতে পারে। কখনও কখনও মেটাল ক্ষয়ে গিয়ে খুব ছোট ছোট কণিকা শরীরে মিশে যায়। এর ফলে জয়েন্টে ব্যথা ফিরে আসা, টিস্যুতে প্রদাহ, এমনকি হাড়ের ক্ষয়ের মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে। অনেক সময় মেটাল রিঅ্যাকশন বা অ্যালার্জির সমস্যাও দেখা যায়। ডা. কর্মকারেন মতে, এই কারণেই খুব কম বয়সে হাঁটু প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিতে আগে অনেক সময় দ্বিধা থাকত। কারণ দীর্ঘদিন পরে আবার সেই হাঁটু ক্ষয়ে গেলে পুনরায় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
কেন অল্প বয়সেই বাড়ছে হাঁটু প্রতিস্থাপন?
বর্তমানে ৩০-৪০ বছর বয়সেও হাঁটু প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন দেখা যাচ্ছে। এর পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ। অ্যাকটিভ লাইফস্টাইল, দুর্ঘটনা বা গুরুতর আঘাত, আর্থ্রাইটিস বা হাড়ের দ্রুত ক্ষয়ের মতো সমস্যার কারণে কম বয়সেই হাঁটু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অনেকের।
ডা. কর্মকারের কথায়, এখন অনেকেই চান হাঁটুর সমস্যা নিয়ে বসে না থেকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে। যাঁদের প্রচুর হাঁটাচলা করতে হয়, নিজে গাড়ি চালান বা খেলাধুলা করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই নতুন ধরনের কোটিং দেওয়া হাঁটু দীর্ঘদিন কার্যকর থাকতে পারে। খরচ কিছুটা বেশি হলেও এতে জীবনযাত্রা অনেকটাই স্বাভাবিক থাকে। স্বাস্থ্যবীমা থাকলে এই ধরনের অস্ত্রোপচার করানো অনেক ক্ষেত্রে সহজ হয়।
আর এটাও ঠিক যে, পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মধ্যে হাঁটু ব্যথার সমস্যা বেশি দেখা যায়। হরমোনের পরিবর্তন, হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং দৈনন্দিন শারীরিক চাপ, সব মিলিয়ে এই প্রবণতা বাড়ে। হাঁটু ব্যথা জীবনের গতি থামিয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে না। আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির সাহায্যে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরা সম্ভব। নারীরা এগিয়ে চলুক, হাঁটু যেন আর সেই পথের বাধা না হয়।







