নাম বদল হচ্ছে, সেরকম একটা খবর তো বাজারে ছিলই। বলা হচ্ছিল যে মনরেগা প্রকল্প জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর (Mahatma Gandhi) নামে করা হয়েছিল, কিন্তু সেই নাম থেকে মহাত্মা এবং গান্ধী দুটোকেই বাদ দিয়ে পূজ্য বাপু করা হবে। তো অনেকেই ভেবেছিলেন গান্ধিজীর নামের সামনে থেকে মহাত্মা সরিয়ে সম্ভবত নিজের জন্য রেখে দিতে চান আমাদের নন বায়োলজিকাল প্রধানমন্ত্রী, কুঁজোরও তো উপুড় হয়ে শুতে ইচ্ছে হয়। তো দেখা গেল নাম বদলাচ্ছে। কিন্তু ‘মহাত্মা গান্ধী’র পরিবর্তে ‘পূজ্য বাপু’— প্রকল্পের নামে যুক্ত হওয়ার সে জল্পনা ছিল, তা–ও হচ্ছে না। একশো দিনের কাজের (100 Days Work) প্রকল্প বা মনরেগা–র (মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট) নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব করে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার সোমবার লোকসভায় একটি বিল এনেছে। যেখানে প্রকল্পের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে, ‘বিকশিত ভারত— গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ)’, সংক্ষেপে ‘ভিবি জি–রাম–জি’। মানে গান্ধিজী পুরোপুরিই বাদ। হ্যাঁ এতদিন জহরলাল নেহেরু, কংগ্রেস ইত্যাদি নিয়ে অনেক কথা বলার পরে এখন গান্ধিজীকেই বাদ দিতে চান আমাদের পরমাত্মার বেটা মহাত্মা নরেন্দ্র মোদি। মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট, মানুষের মুখে মুখে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প বা মনরেগা নামেও প্রচলিত ছিল, ২০০৫ সালে এই আইন করার সময়েই বলা হয়েছিল যে এই ১০০ দিনের গ্যারান্টি পরবর্তি সময়ে আরও বারানো হবে, কিন্তু কার্যত ৩৭/৩৮ দিনের বেশি কাজ দেওয়া যায় নি। মোদি সরকার, মানে পরমাত্মার সরকার সেই ১০০ দিন তুলে এটাকে ১২৫ দিন করেছে আর নামটাও বদলে দিয়েছে। তার এক বড় কারণ হল ওনারা শুরু থেকেই জানেন ওনাদের লড়তে হবে সেই কবেই খুন করা ওই গান্ধীর সঙ্গেই, হ্যাঁ উনিই ভারতের সেই আত্মা যা অবিনশ্বর, মহাত্মা সম্বোধনকে ফ্রিজ থেকে বার করা হবে আরও বছর দুই পরে, মহাত্মা নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) করা জন্য। হ্যাঁ পরমাত্মার ডাইরেক্ট পাঠানো মাল তো মহাত্মাই হবেন, অ্যাট লিস্ট হতে চান। আর দ্বিতীয় হল সারা দেশ জুড়ে অসংখ্য মানুষের ভরসার এক প্রকল্পের সঙ্গে কংগ্রেসের নাম, ইউ পি এর নাম, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নাম জুড়ে গেলে তো চলবে না, কাজেই নাম বদলে দাও। মোদিজী ক্ষমতায় আসা ইস্তক বহু বহু পুরনো প্রকল্পের নাম বদলেছেন কেবল এই জন্যেই। ধরুন ডায়রেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার ফর এল পি জি এখন পহল স্কিম, বেসিক সেভিংস ব্যাঙ্ক ডিপোজিট স্কিম এখন জন ধন প্রকল্প, নির্মল ভারত অভিযান এখন স্বচ্ছ ভারত অভিযান, ন্যাশনাল আর্বান লাইভ্লিহুড মিশন এখন দীন্দয়াল অন্ত্যোদয় যোজনা, ন্যাশনাল অপটিকাল ফাইবার নেটওয়ার্ক এখন ভারতনেটস্বাবলম্বন যোজনা এখন অটল পেনশন যোজনা। এরকম হাজারটা উদাহরণ দিতে পারি, রাত কাবার হয়ে যাবে। ক্ষমতায় আসা ইস্তক ওনার কাজ বিভিন্ন প্রকল্পের নাম বদলে তাকে নিজের বলে চালিয়ে দেওয়া।
এবারে মনরেগা নিয়ে পড়েছেন, মূলত দুতো কারণে, প্রথমত খুব ভেবেচিন্তেই মহাত্মা সম্বোধনটা এবারে গান্ধিজীর নামের আগে থেকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছিল, এখন তো পুরো নামটাই বাদ দেওয়া হবে, সময় বুঝে ওই মহাত্মা রেখে দেওয়া হল ফেকুজীর নামের আগে জোড়ার জন্য। আর দুনম্বর হল এই যোজনার সাফল্য তিনি নিজেই নিতে চান। কিন্তু ক বছর আগেই তিনি কী বলেছিলেন শুনুন, ২০১৫ ২৭ ফেব্রুয়ারি সংসদে দাঁড়িয়ে ওনার মত নৌটঙ্কি করতে করতে জানিয়েছিলেন, ঘাবড়াবেন না, আমি এই মনরেগা কে তুলে দেবো না, এত বছরের কংগ্রেস শাসনের এক অসফলতার কাহিনীকে আমি বাঁচিয়ে রাখবো, সারা পৃথিবীকে আমি জানাবো কংগ্রেস শাসনের এই ব্যররথতার কথা। বলেছিলেন কিন্তু কদিন পরেই বুঝেছিলেন এই প্রকল্পের কার্যকারীতার কথা, করোনার সময়ে এই প্রকল্পই লক্ষ লক্ষ মানুষের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আজ আবার তিনি ক্রমশ এই প্রকল্পের বরাদ্দ কমাচ্ছেন, সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে রেগা চূড়ান্ত তহবিল বরাদ্দ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ২০২০-২১ অর্থ বছরে চূড়ান্ত বরাদ্দ ছিল ১ লক্ষ ১১ হাজার ১৭১ কোটি। ২০২১-২২ সালে তা নেমে আসে ৯৮ হাজার ৪৬৮ কোটিতে, ২০২২-২৩ সালে ৯০ হাজার ৮১০ কোটি, ২০২৩-২৪ সালে ৮৯ হাজার ২৬৮ কোটি এবং ২০২৪-২৫ সালে আরও কমে দাঁড়ায় ৮৫ হাজার ৮৩৯ কোটি। ২০২০-২১ সালের তুলনায় এটি প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার হ্রাস। ঠিক সেই সময় যখন জ্বালানির দাম, খাদ্যদ্রব্যের দাম এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের খরচ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন এমজিএনআরইজিএ-র মতো এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে তহবিল কমানো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কেবল বরাদ্দই কমাচ্ছেন তাই নয়, বিভিন্ন বিরোধী শাসিত রাজ্যের প্রাপ্যও মেটাচ্ছেন না, , বিভিন্ন রাজ্যে মিলিয়ে কেন্দ্রের কাছে ৯,২০০ কোটি টাকারও বেশি বকেয়া পড়ে আছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বকেয়া টাকার পরিমাণ ৩০০০ কোটি টাকারও বেশি, কেরালার বকেয়া পরিমাণ ৫২৭ কোটি টাকা, যা বারবার চাওয়ার পরেও মোদী সরকার দিচ্ছে না । বরাদ্দ কমছে, প্রাপ্য বরাদ্দের টাকা দেওয়া হচ্ছে না, কিন্তু ১০০ দিনের কাজ এই সরল জনপ্রিয় কথাটাকে মুছে দেবার জন্য ১০০ দিনকে ১২৫ দিন করে দেওয়া হল।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | এসআইআর-এর ফাইনাল লিস্ট কাল, নাম না থাকলে কী করবেন?
ওদিকে আন্দামান সেলুলার জেলে তৈরি হয়েছে বীর সাভারকার প্রেরণা পার্ক। যে লোকটা ব্রিটিশদের কাছে ক্ষমাভিক্ষা করে, মুচলেকা দিয়ে, একটা নয় সাত সাতটা মুচলেকা দিয়ে জানিয়েছিল আর কোনওদিন ব্রিটিস বিরোধীতা করবো না, বরং যাঁরা ইংরেজ বিরোধিতায় নেমেছিল তাদেরও বোঝাবো, পথে নিয়ে আসবো, এসব বলে নাকখত দিয়ে যে জেল থেকে বেরিয়ে গান্ধী হত্যার ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছিলেন সেই লোকটার স্ট্যাচু উদ্বোধন হচ্ছে, তার নামে পার্ক হচ্ছে আর গান্ধীর নাম মুছে দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে। যে মানুষ ৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে ব্রিটিশদের চিঠি লিখে জানিয়েছিল এই আন্দোলনকে শেষ করার জন্য যা যা করার তাই করবে, সেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এনাদের আইডল, এনাদের পূজ্য, তাঁর মূর্তি বসানো হচ্ছে। অথচ কালাপানিতে সারা তাজীবন কাটিয়ে দেওয়া উল্লাসকর দত্তের নাম কোথাও নেই, ইলেক্ট্রিক শক দেওয়া হয়েছিল উল্লাসকরকে, হাজার অত্যাচারের পরেও তিনি তাঁর পথ থেকে সরে আসেন নি, সেই উল্লাসকর দত্তের কোনও ছবি নেই সংসদে, আছে কার? এক বেইমানের, এক বিশ্বাসঘাতকের, যিনি গান্ধী হত্যায় সরাসরি জড়িত ছিলেন, যিনি প্রথম দ্বিজাতিতত্ত্বের কথা তুলেছিলেন যে দ্বিজাতিতত্ত্ব জিন্নার অস্ত্র হয়ে উঠেছিল। আজ ফেকুজি বন্দেমাতরম নিয়ে কথা বলছেন, একবারও ভেবে দেখেছেন, কেন তাঁরা ১৯৩৭ এর আগে বন্দেমাতরম নিয়ে একটা কথাও বলেন নি? ১৮৭৫ এ বন্দেমাতরম লেখা হয়েছিল, ১৯২৫ এ আর এস এস স্থাপনা হয়, অ্যাট লিস্ট কাগজ তাই বলছে, কিন্তু তখন কি আর এস এস এর প্রার্থনায় বন্দেমাতরম ছিল? ছিল না তার কারণ কী? কারণ হল বিপ্লবীরা বন্দেমাতরম বলতেন,বিপ্লবীরা লড়ছিলেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে, জেলে যাচ্ছিলেন, ফাঁসিকাঠে প্রাণ দিচ্ছিলেন বন্দেমাতরম বলে। আর আর এস এস ইংরেজদের বিরুদ্ধে কোনও সংগ্রামে কোনওদিনও ছিলই না। কিন্তু যখন জিন্নাহ, মুসলিম লিগ ১৯৩৭ এ বন্দেমাতরম নিয়ে তাঁদের আপত্তির কথা জানালেন, তখন আর এস এস মাঠে নেমেছিল, কিন্তু সেদিন কেন আজও তাদের শাখায় ঐ নমস্তে সদা বৎসলে ইত্যাদি গাওয়া হয়, বন্দেমাতরম গাওয়া হয় না। আজ সংসদে দাঁড়িয়ে গলা কাঁপিয়ে বিজেপির ইনটেলেকচুয়াল সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলছেন ফজলুল হক প্রজা কৃষক পার্টি করেছিলেন, তাই তাঁর সঙ্গে হিন্দু মহাসভা জোট করেছিল, তিনি যেটা বলছেন না তা হল, ১) ওই হিন্দু মহাসভা নর্থ ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার স্টেটে, সিন্ধু প্রদেশে ওই মুসলিম লিগের সঙ্গেই হাত মিলিয়েছিলেন, ওখানে কোনও কৃষক প্রজা পার্টি ছিল না। ২) এই ফজলুল হক সেই মুসলমান নেতাদের অন্যতম যাঁরা বন্দেমাতরম নিয়ে তাঁদের আপত্তি জানিয়েছিলেন, পরে জিন্নাহ এই ইস্যু তোলেন। ৩) এই ফজলুল হক ১৯৪০ এ মুসলিম লিগের লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তানের দাবি নিয়ে প্রস্তাব আনেন, আর ১৯৪১ এ সেই ফজলুল হকের সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ হিন্দু মহাসভা আঁতাত করেন। ৪) এই ফজলুল হক স্বাধীন পাকিস্তানে প্রথম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হয়েছিলেন। বিজেপির বঙ্গ সভাপতি সত্যিটা বলতে লজ্জা পাচ্ছেন বলেই এতগুলো মিথ্যে বলছেন। আসলে স্বাধীনতা সংগ্রামে আর এস এস ছিল গান্ধীর আদর্শের বিরুদ্ধ শিবিরে, তাঁরা জানতেন এই গান্ধীর জন্যই তাঁদের ভারতে পায়ের তলায় জমি মিলছে না।
এই গান্ধীই ভারতের আত্মা, আদর্শ। তাই এই আর এস এস – হিন্দু মহাসভা সাভারকার গডসেরা গান্ধীকে মারার চক্রান্ত করেন আর শেষমেষ সফলও হন। কিন্তু মৃত্যুর পরেও সেই গান্ধীর ভূত তাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেরাচ্ছে, তাই আজ গান্ধীর নামের আগের থেকে মহাত্মা সম্বোধন কে কেড়ে নিতে চায় তারা, যে সম্বোধন করেছিলেন রবি ঠাকুর। এক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে যে কাজ আজ মোদি অ্যান্ড কোম্পানি করছে তারা জানেই না যে এই সিংহাসন চিরস্থায়ী নয়, রবি ঠাকুরই লিখে গেছেন “রাজছত্র ভেঙে পড়ে,রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে, জয়স্তম্ভ মূঢ়সম অর্থ তার ভোলে, রক্তমাখা অস্ত্র হাতে যত রক্ত-আঁখি শিশুপাঠ্য কাহিনীতে থাকে মুখ ঢাকি।“ হ্যাঁ একদিন এই শাসন, এই ক্ষমতা থাকবে না, সেদিন আজ বলে রাখছি মিলিয়ে নেবেন, কোথাও এই নরেন্দ্র মোদি অ্যান্ড কোম্পানির নামটুকুও থাকবে না, কোথাও দেখেছেন না মহম্মদ বিন তুঘলক বা কালাপাহাড়ের নাম? কোনও স্কুলে, কোনও রাস্তায়?







