Monday, February 9, 2026
HomeScrollFourth Pillar | মোদিজির ডিয়ার ফ্রেন্ড ট্রাম্পের গলায় হিটলারের সুর
Fourth Pillar

Fourth Pillar | মোদিজির ডিয়ার ফ্রেন্ড ট্রাম্পের গলায় হিটলারের সুর

নরেন্দ্র মোদির ভূমিকা আজ দেশে, বিদেশেও বিতর্কের মুখে

হ্যাঁ, পৃথিবীতে আবার হিটলারের পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। একুশ শতকের এই পর্যায়ে এসে বিশ্ব রাজনীতি এক নাটকীয় বাঁকের মুখে। আমরা এমন এক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি যেখানে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুরনো সমীকরণগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে গণতান্ত্রিক কাঠামো, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর ভিত্তি করে পৃথিবী এক ধরনের স্থিতিশীলতা খুঁজে পেয়েছিল, আজ তা সংকটের মুখে। এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দু আমাদের মোদিজির মাই ডিয়ার ফেন্ড প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। তাঁর মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে নতুন ‘বোর্ড অফ পিস’ গঠনের পরিকল্পনা, গ্রিনল্যান্ড (Greenland) দখলের মরিয়া চেষ্টা সঙ্গে তাঁর উগ্র জাতীয়তাবাদী বুকনিবাজি অনেককেই গত শতাব্দীর সেই অন্ধকার সময়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, যখন অ্যাডলফ হিটলারের উঠে এসেছিল। ট্রাম্পের প্রতি্টা পদক্ষেপ আজ বিশ্বজুড়ে এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করছে হ্যাঁ পৃথিবীতে আবার হিটলারের পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির (Narendra Modi) সেই বিখ্যাত স্লোগান ‘অবকি বার ট্রাম্প সরকার’ আজ ভারতের জন্য কতটা অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটাও আলোচনার দাবি রাখে। বহু আগেই বলেছিলাম যে মোদি হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেলায় হারিয়ে যাওয়া গরীব যমজ ভাই, কাজেই প্রতিটা পদক্ষেপে ওনার সঙ্গে ট্রাম্পের একটা ভালো রকমের মিল পাওয়া যাবে, ফারাক একটাই ট্রাম্প সাহেব প্রেসের সামনেও অনায়াসে মিথ্যে আর ভাট বকে যেতে পারেন, মোদিজির সেই সাহসটা নেই। ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনীতির একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলোকে তুচ্ছজ্ঞান করা। তিনি যখন থেকে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার প্রস্তুতি নিয়েছেন, তখন থেকেই তাঁর নিশানায় ছিল রাষ্ট্রপুঞ্জ বা ইউনাইটেড নেশনস। ট্রাম্পের মতে, রাষ্ট্রপুঞ্জ একটা ‘অকেজো’, আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান যা বছরের পর বছর কোটি কোটি ডলার খরচ করেও বিশ্বে শান্তি ফেরাতে পারেনি। বিশেষ করে আফ্রিকার কঙ্গোতে রাষ্ট্রপুঞ্জের লাগাতার ব্যর্থতাকে তিনি নিজের দাবির পক্ষে ব্যবহার করছেন। এই প্রেক্ষাপটেই তিনি মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা মেটানোর জন্য এক অদ্ভুত বিতর্কিত পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘বোর্ড অফ পিস’ বা শান্তি বোর্ড।

কদিন আগেই ২০২৫ সালের শেষের দিকে এই বোর্ডের পরিকল্পনা সামনে এল আর ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হওয়ার কথা বলা হল। এই বোর্ড্টা গাজার পুনর্গঠন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট মেটানোর নাম করে তৈরি করা হলেও, এর আসল উদ্দেশ্য নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আমরা তো জানিই যে এই বোর্ড রাষ্ট্রপুঞ্জের কোনো কাঠামো মেনে কাজ করবে না। এটা হবে ট্রাম্পের নিজের কোম্পানি।লিক হওয়া খসড়া চার্টার থেকে জানা যাচ্ছে ট্রাম্পকে নাকি এই বোর্ডের আজীবন চেয়ারম্যান করা হবে। আর তাঁর হাতে থাকবে প্রশ্নাতীত ক্ষমতা—ভিটো পাওয়ার থেকে শুরু করে সদস্য নিয়োগ, তহবিল নিয়ন্ত্রণের পুরো অধিকার । আর এই ‘বোর্ড অফ পিস’-এর সবচেয়ে অদ্ভুত দিক হলো এর সদস্যপদ পাওয়ার ব্যাপারটা। ট্রাম্প এখানে আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে এক্কেবারে ব্যবসায়িক চুক্তিতে নামিয়ে এনেছেন। স্থায়ী সদস্য হতে হলে যে কোনো দেশকে ১ বিলিয়ন ডলার বা ১০০ কোটি ডলারের ‘এন্ট্রি ফি’ দিতে হবে। এটা ‘পে-টু-প্লে’ মডেল, যেখানে যার টাকা আছে, তারই কথা চলবে। এই বোর্ডে ট্রাম্পের কাছের মানুষদের প্রাধান্য স্পষ্ট। জ্যারেড কুশনার, মার্কো রুবিও, এমনকি ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের নামও এখানে জড়িয়ে রয়েছে। এবং সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো গাজা নিয়ে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি গাজাকে কোনো মানবিক সংকট হিসেবে তো দেখেন না, দেখেন এক বিশাল ‘রিয়েল এস্টেট’ প্রপার্টি হিসেবে। তিনি গাজাকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়েরা’ বানানোর কথা বলেছেন, গাজাকে একটা ‘ডেমোলিশন সাইট’ বলেছেন, যার নাকি উন্নয়নের ব্যাপক ব্যবসায়িক সম্ভাবনা রয়েছে। এখানে ফিলিস্তিনিদের অধিকার বা তাঁদের মতামত নেওয়ার কোনো বালাই নেই। এই পুরো প্রক্রিয়াটা যেভাবে রাষ্ট্রপুঞ্জকে এড়িয়ে করা হচ্ছে, তা বিশ্বজুড়ে একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার এক নতুন চেহারা হয়ে উঠে আসছে। ভারতকেও এই বোর্ডে যোগ দেওয়ার জন্য ট্রাম্প আমন্ত্রণ পাঠিয়েছেন, এবারে মোদিজি কী করবেন? তা আমাদের এখনও জানা নেই । ওদিকে ট্রাম্প সাহেবের আবার গ্রীনল্যান্ড চাই। গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। কিন্তু ট্রাম্পের দাবি, আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড দখল করতেই হবে। তিনি মনে করেন, গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান সেখানে থাকা খনিজ সম্পদ আমেরিকার নিয়ন্ত্রণেই থাকা উচিত যাতে রাশিয়া, চীনের প্রভাব কমানো যায়। ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ডের সরকার সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে যে গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়, জানিয়েই দিয়েছেন যে এটা তো কোনো পণ্য নয় যে কেনা যাবে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেন এই আলোচনাকে ‘অবাস্তব’ এবং ‘অযৌক্তিক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন । কিন্তু ট্রাম্প সাহেবের মত কী? স্বাভাবিকভাবেই এই বিরোধিতাকে মোটেও ভালো চোখে দেখেননি। আর সরাসরি ডেনমার্ক, তাকে সমর্থন করা ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড আর নেদারল্যান্ডসের ওপর তিনি ১০ শতাংশ ট্যারিফ আরোপ করবেন। তিনি হুমকি দিয়েছেন যে, যদি ১ জুনের মধ্যে গ্রিনল্যান্ড বিক্রির চুক্তি না হয়, তবে এই শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে। এটা হল ‘হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার’ বা এক ধরনের পরোক্ষ যুদ্ধ, হ্যাঁ হিটলারের শুরুয়াতটাও এরকমই ছিল।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | সনাতনী মোদিজি বেনারসের দফারফা করে ছাড়ছেন; হ্যাঁ, বেনারসে হিন্দু ‘খতরে মে হ্যাঁয়’

ট্রাম্পের এই হুমকি ন্যাটোর ঐক্যে বড়সড় ফাটল ধরিয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এবং জার্মানির নেতারা ট্রাম্পের এই হুমকিকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন। এমনকি ব্রিটেনের কনজারভেটিভ নেতা নাইজেল ফারাজ, যিনি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত, তিনিও এই শুল্ক আরোপের তীব্র সমালোচনা করেছেন । গ্রিনল্যান্ড ইস্যুটা এখন আর কেবল একটা দ্বীপের মালিকানা নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই, এটা এখন আমেরিকার সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্কের এক মরণপণ লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে হিটলার যেমন জার্মানির উন্নতির জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর জমি দখল করতে চেয়েছিলেন, ট্রাম্পও ঠিক একইভাবে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির দোহাই দিয়ে এক স্বাধীন অঞ্চলের অধিকার কেড়ে নিতে চাইছেন। তিনি প্রকাশ্যেই বলছেন যে যদি সহজ পথে গ্রিনল্যান্ড না পাওয়া যায়, তবে তিনি কঠিন পথ বেছে নেবেন, মানে সরাসরি সামরিক অভিযানের কথাই বলেছেন। হিটলার যেমন ইহুদিদের সম্পর্কে বলতেন যে তাঁরা জার্মানির ‘রক্ত বিষাক্ত’ করছে, ট্রাম্পও ঠিক একইভাবে ইমিগ্রান্টসদের সম্পর্কে বলছেন যে তাঁরা আমেরিকার ‘রক্ত বিষাক্ত’ Poisoning the blood করছে। ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীদের ‘ভার্মিন’ বা কীটপতঙ্গ বলে ডাকছেন—এই একই শব্দ হিটলার এবং মুসোলিনি ব্যবহার করতেন তাঁদের বিরোধীদের অমানুষ হিসেবে প্রতিপন্ন করার জন্য । হ্যাঁ খেয়াল করুন অমিত শাহ বাংলাদেশীদের উঁইপোকা বলেছেন, যোগিজী মুসলমানদের কিড়ে মকৌড়ে, কীতপতঙ্গ বলেছেন। ভারতের অবস্থান কী? এই পুরো বিশ্ব পরিস্থিতির মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভূমিকা আজ দেশে, বিদেশেও বিতর্কের মুখে।

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যখন ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তখন হাউস্টনে ‘হাউডি মোদি’ নামের এক বিশাল অনুষ্ঠানে মোদী যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে প্রায় ৫০ হাজার ভারতীয়-আমেরিকান মানুষের সামনে মোদি ট্রাম্পের হাত ধরে মঞ্চে হেঁটেছিলেন, বলেছিলেন, “অবকি বার ট্রাম্প সরকার”। ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রী এর আগে কোনো অন্য দেশের নির্বাচনে এভাবে কোনো বিশেষ প্রার্থীর হয়ে প্রচার করেননি। আজ যখন ট্রাম্প সেই একনায়কতান্ত্রিক পথে হাঁটছেন, বিশ্বজুড়ে অশান্তি ছড়াচ্ছেন, তখন মোদীর সেই পুরনো সমর্থন ভারতের জন্য এক বড় লজ্জা, কেউ ভোলেনি। ট্রাম্প এখন মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর সেই বিতর্কিত ‘বোর্ড অফ পিস’-এ যোগ দেওয়ার জন্য মোদিকে চিঠি লিখেছেন। ট্রাম্পের এই বোর্ড আসলে রাষ্ট্রপুঞ্জকে অকেজো করার একটা চাল এবং ভারতের মতো দেশের সেখানে থাকা মানে ট্রাম্পের এই অনৈতিক পদক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া। গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ (GTRI) এর মতো বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ সংস্থাগুলো ভারত সরকারকে কড়াভাবে সতর্ক করে দিয়েছে। তাঁদের মতে, এই বোর্ডে যোগ দেওয়া ভারতের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হবে, কিন্তু মোদিজীর সরকার এখনও ভেবেই চলেছেন। ভারতের জন্য এটা কেবল একটা কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়, একটা নৈতিক চ্যালেঞ্জও। আমাদের দেশ মহাত্মা গান্ধীর অহিংসা, জওহরলাল নেহরুর জোট নিরপেক্ষতার আদর্শে বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু আজ ক্ষমতার লোভে, ব্যক্তিগত ইমেজের স্বার্থে যদি আবার ট্রাম্পের মতো একজন মানুষের হাত শক্ত করা হয়, তাহলে তা ভারতের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে । ইতিহাস সাক্ষী আছে, হিটলারের উত্থানের সময়ও অনেক বিশ্বনেতা ভেবেছিলেন যে তাঁকে তোয়াজ করে বা তাঁর সঙ্গে আপস করে শান্তি বজায় রাখা যাবে। কিন্তু সেই ভুল সিদ্ধান্ত বিশ্বকে এক ভয়ংকর ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। আজ আবার সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ‘শান্তি’ আসলে এক অশান্তির পূর্বাভাস। ইউরোপের দেশগুলো যেভাবে রুখে দাঁড়াচ্ছে, ভারতকেও সেই একইভাবে সত্যের পক্ষে শান্তির পক্ষেই দাঁড়াতে হবে। গাজার ধ্বংসস্তূপের ওপর রিয়েল এস্টেট ব্যবসা করা কিংবা জোর করে গ্রিনল্যান্ড দখল করা কোনো সভ্য দেশের কাজ হতে পারে না। হিটলারের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে, হিটলারকে রুখতে হবে।

 

Read More

Latest News

toto DEPOBOS