Sunday, February 8, 2026
HomeScrollFourth Pillar | এসআইআর-এর ফাইনাল লিস্ট কাল, নাম না থাকলে কী করবেন?
Fourth Pillar

Fourth Pillar | এসআইআর-এর ফাইনাল লিস্ট কাল, নাম না থাকলে কী করবেন?

২০০২-এর তালিকায় নাম থাকার পরেও, আধার-পাসপোর্ট থাকার পরেও আপনার নাম কাটা যেতে পারে!

Written By
অনিকেত চট্টোপাধ্যায়

নির্বাচন তালিকা নিয়ে ঠিক কী যে হচ্ছে, তা জানার কোনও উপায় নেই। কারণ তাঁরা কী করছেন, কেন করছেন, কীভাবে করছেন, আর কোন উদ্দেশ্যে করছেন – তা নিয়ে যথেষ্ট ধোঁয়াশা আছে। প্রথম কথাটাই হল, এই দেশজুড়ে স্পেশ্যাল ইনটেনসিভ রিভিশন করার এক্তিয়ার নির্বাচন কমিশনকে কে দিল, সেটাই এখনও পরিষ্কার নয়। কারণ তাদের হ্যান্ড বুকে এই স্পেশ্যাল ইনটেনসিভ রিভিশনের উল্লেখ আছে, কিন্তু কেবল একটা নির্দিষ্ট বিধানসভা বা নির্দিষ্ট বিধানসভার মধ্যে এক নির্দিষ্ট এলাকায় তা করা যেতে পারে, সারা দেশজুড়ে তা করার কোনও আইনি সুযোগ তাঁদের নেই, কিন্তু করা হচ্ছে। কাজেই ক’দিন পরেই সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে সবটাই বাতিল হয়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। সে যাই হোক, এখন তো তা হচ্ছে, আর আগামীকাল এই রিভিসনের খসড়া রিপোর্ট বের করা হবে। অনলাইনে সকলেই পেয়ে যাবেন, অফলাইনে বিএলও-দের কাছে, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের কাছেও নাকি থাকবে। এসআইআর আপনার ভোট কাটার জন্যই তো আনা হয়েছে এমন নয়, আপনিই নির্দিষ্টভাবে এই কর্মসূচির টার্গেট নয়। তাহলে? এর টার্গেট সীমান্তবর্তী এলাকাতে মুসলমান ভোট, বাংলাদেশঘেঁষা সীমান্তের জেলাগুলোতে আসন ধরে ধরে বেশ কিছু নাম বাদ দেওয়া। সুবিধে কী? বা বলা ভালো এই ষড়যন্ত্রের পিছনে আসল প্ল্যানটা কী? আসল প্ল্যান হল, বেশ কিছু মুসলমান ভোট বাদ দেওয়া, র‍্যান্ডমভাবেই। খুব বেছেবুছে নয়, এপাড়ার ৫টা ফ্যামিলি উধাও, সে পাড়ার তিনটে, আরও ওধারে আরেক পাড়ার ৬টা ফ্যামিলিকে গায়েব করে দাও। কেন? কারণ ধরেই নেওয়া হচ্ছে যে, সীমান্তবর্তী মুসলমান জনসংখ্যা বেশি আছে এমন জেলাগুলোতে মুসলমানদের বাদ দেওয়া গেলে তৃণমূলের কোর ভোটার ব্যাঙ্কে ধাক্কা দেওয়া যাবে।

হ্যাঁ, এমনিতেই ওই শান্তিকুঞ্জের মূর্তিমান অশান্তি থেকে অধুনা বঙ্গ বিজেপির ইনটেলেকচুয়াল সভাপতি জানেন যে, রাজ্যের ২৮ থেকে ২৯ শতাংশ মুসলমান ভোটের ৮০ শতাংশ নিশ্চিতভাবেই মমতার দিকে যাবেই, এবারে সেই ভোট বাড়বে বই কমবে না। ওসব মুর্শিদাবাদি হুমায়ুন কবীর বা ফুরফুরা শরিফের পীরজাদাদের ফতোয়ার পরেও। কাজেই সেই কোর ভোটার সংখ্যাকে কমাতে হবে। বীরভূমের মুসলমানপ্রধান এলাকাতে ইভিএম খুললে মনে হয় তৃণমূলের চাষ হয়েছে, তারও কারণ ওই মুসলমান ভোট। তাহলে এক নম্বর স্ট্রাটেজি হল – সেই মুসলমানদের জন্য ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’ – এরকম এক স্লোগান তুলে হিন্দু ভোটের বেশিরভাগটাই নিজেদের দিকে নিয়ে যাওয়া, আর অন্যদিকে মুসলমান ভোটারদের বাদ দেওয়া। দুই – এর এফেক্টে মার্জিনাল আসনগুলোতে প্রবাবিলিটি বাড়ানো। কাজেই নাম বাদ যাবে, বিনা কারণে বা কারণে। কাজেই প্রথম দফাতে যেমন ১০০ শতাংশ ফর্ম জমা দেওয়া ইত্যাদিকে সিকিওর করা গিয়েছে, ঠিক তেমন একটাও জেনুইন ভোটারের নাম যেন বাদ না পড়ে, সেটা দেখাও আজ প্রত্যেক বিজেপি বিরোধী দলের ধর্ম। বেশ কিছু নাম কাটা পড়তেই পারে, সে নাম মুসলমানের হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হলেও, হিন্দুদের কাটা পড়বে না, সে গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে না। এক্কেবারে হিন্দু ভদ্রলোকেদের পাড়াতে সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, কিন্তু হিন্দু-মুসলমান আছেন বা মুসলমান প্রধানএলাকা বা সীমান্তবর্তী এলাকাতে যে কারও নাম কাটা যেতে পারে। আর সাধারণ প্রবাবিলিটির অঙ্ক বলে, যত বেশি নাম কাটা যাবে, তত বেশি হিন্দুদের নাম বাদ পড়বে, কারণ তাঁরা সংখ্যায় অনেক অনেক বেশি। যা এতক্ষণ ধরে বোঝাতে চাইলাম তার সারার্থ্য হল, আপনার নাম কাটা যেতে পারে। সব কিছু করার পরেও, ২০০২-এর তালিকাতে বাবা-মা-চোদ্দ গুষ্টির নাম থাকার পরেও পেটে বাচ্চা নিয়ে সোনালি বিবি এখনও বাংলাদেশের জেলে।

আরও পড়ুন: Fourth Pilar | বন্দেমাতরম, চিকেন প্যাটিস নরেন’দা আর বঙ্কিমদা

কাজেই ২০০২-এর তালিকায় নাম থাকার পরেও, আপনার আধার কেন পাসপোর্ট থাকার পরেও আপনার নাম কাটা যেতে পারে। এটা হল প্রথম চিন্তা। চিন্তা নম্বর দুই – আপনি থাকেন একজায়গাতে, কর্মসূত্রে চলে আসতে হয়েছে আরেক জায়গাতে, এদিকে এখন ঠিকানা পরিবর্তন করা যাচ্ছে না। বা আপনার আধার কার্ডে নামের বানান মিলছে না। কাজেই কাউকে দিয়ে আপনার এনিউমারেশন ফর্ম ফিলাপ করিয়ে জমা তো দিয়েছেন, কিন্তু আপনার ভোটার কার্ড আপনার অ্যাড্রেসে নেই। চিন্তা নম্বর তিন – আপনি কর্মসূত্রে বার বার ঠিকানা বদলেছেন, একজায়গার আধার কার্ড, একজায়গায় ভোটার কার্ড, এক জায়গাতে পাসপোর্ট এরকম হয়ে আছে। ওদিকে আপনার ২০০২ তালিকাতে নাম যে ঠিকানায়, সে ঠিকানাতে এখন থাকেন কোনও এক গন্ডারিরাম বাটপারিয়া। ৪ নম্বর চিন্তা হল – আপনার নাম ভোটার তালিকাতে নেই, কোনওদিনও ভোটই দেননি, এ পোড়ার দেশে ভোট দেবার জন্য সব্বাই এক্কেবারে আকুল, তেমনও তো নয়। নানান কাজে, বিরক্তিতে, প্রতিবাদে ভোট দেননি, অনেক চোরের মধ্যে থেকে একটা চোরকে বাছার প্রক্রিয়াতে যেতে রাজি ছিলেন না, কিন্তু এখন কী করবেন? যদিও আপনার বাবা-মা ২০০২-এ ভোট দিয়েছেন, ভোটার তালিকাতে নাম আছে। (৫) কিছুই নেই, নাম নেই, বাবা-মার নাম নেই, আধার পাসপোর্ট আছে, প্যান আছে। (৬) সব হারিয়েছে বা কিছুই ছিল না কোনওদিন। এই সবকটা চিন্তা নিয়ে আলোচনা করব? কী করতে হবে? কীভাবে করতে হবে? সবটা।

প্রথমে যেটা করতে হবে সেটা হল, এইটা মাথায় রাখা যে, কিছুই হবে না। সত্যি বলছি কিছুই হবে না। এত লক্ষ নাম বাদ পড়বে সারা দেশে যে আপনারটা আপনাকে আলাদা করে ভাবতেই হবে না। এই আকাট বিজেপি, আরএসএস নেতৃত্ব জানেই না যে, এই সমস্যা এভাবে সমাধান হবে না। সে কথা থাক, আগে জেনে নিন যে, আপনার কিছুই হবে না। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এনজিও, সিভিল সোসাইটি সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন হেল্প ডেস্ক খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, সেখানে আইনি সাহায্যও পাওয়া যাবে। কাজেই ওই চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। একটা পাগলা কুত্তা আপনার দিকে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ করছে বলে আপনি তো আত্মহত্যা করবেন না? কাজে এটাকেও সেইভাবে নিন। যা করতে হবে সেটা করুন। প্রথম চিন্তাতে বলেছিলাম, আপনার নাম কাটা গিয়েছে ওই সংঘী জ্ঞানেশ কুমারের খাতা থেকে, ভোটার লিস্ট থেকে, চিত্রগুপ্তের খাতা থেকে নয়। এবার হিয়ারিং হবে, আধার, পুরানো ভোটার কার্ড, ২০০২-এর ভোটার তালিকা ইত্যাদি নিয়ে হাজির হন, আপনার নাম আবার জুড়ে যাবে, যাবেই। চিন্তা নম্বর দুইয়ে বলেছিলাম, কর্মসূত্রে আপনি বাইরে, আগের ঠিকানাতে থাকেন না, কোনও একজন আত্মীয় ইত্যাদিকে দিয়ে ফর্মটা ফিল আপ করিয়েছেন, ভোটার লিস্টে আপনার নাম সেই ঠিকানাতে বের হয়েছে। আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফর্ম এইট ভরে ঠিকানা পরিবর্তনের আবেদন জানান, আর সেই আবেদনের জন্য সেই ঠিকানাতে আপনার আধার কার্ড, আপনার ইলেকট্রিক বিল, আপনার জমির দলিল, আপনার স্বামীর আধার কার্ড বা আপনার এলাকার বিধায়ককে দিয়ে একটা নির্দিষ্ট ফর্মে আপনি ওই ঠিকানাতেই বসবাস করেন, বা আপনার সরকারি কাজের পরিচয়পত্র থাকলে, সেটা দিয়ে আবেদন করুন। যদি ওনারা মেনে নিলেন তো ভালো, নাহলে হিয়ারিংয়ে ডাকবে, সেখানে ওই ডকুমেন্টগুলো দিয়ে আপনার ভোটার কার্ডের ঠিকানা বদল সম্ভব হবে। (৩) আপনার একেকটা ডকুমেন্ট একেক জায়গাতে আছে। ১৬ তারিখের পরে আপনি আপনার নাম সংযোজনের জন্য অনলাইন ফর্ম ফিল আপ করুন, সঙ্গে এখনকার ঠিকানার আধার কার্ড, বা আগের যে ডকুমেন্টগুলো বললাম সেগুলো দিয়ে। আপনার নাম সংযোজিত তালিকাতে থাকবে বা আপনাকে হিয়ারিংয়ে ডাকা হবে। (৪) আপনি ভোটার লিস্টে নামই তোলেননি, কিন্তু আপনার আধার কার্ড আছে, পাসপোর্ট আছে, আপনার মা-বাবার নাম ২০০২ তালিকাতে আছে। ১৬ তারিখের পরে সংযোজনের জন্য আবেদন করুন। আধার কার্ড বা পাসপোর্ট দিয়ে। আর কিচ্ছু করতে হবে না। এবারে আসি ষষ্ঠ সম্ভাবনায় – আপনার কিছুই নেই, তেমনটা হলে আপনি নিশ্চিতভাবেই খুব কচি নন, বয়স ৫০ থেকে ৫৫-র কোঠায় বা তারও উপরে, সম্ভবত বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যাঁদের সঙ্গে দেখেছিলেন, সে সব ‘সাত সেয়ানার এক সেয়ানা’রা আধার, ভোটার, প্যান-ভ্যান-ক্যান সব কার্ড জোগাড় করেছে, আপনি পড়ে আছেন। চিন্তা করবেন না, যেমন আছেন তেমন থাকুন, এতদিন যেভাবে দিনের রাতের খাবার জুটেছে জুটে যাবে।

এখনও পর্যন্ত বাদ পড়ার সংখ্যা বা ডাউটফুল ভোটারের সংখ্যা নিয়ে এক ধরণের উদ্বেগ ছড়ানোর কাজ চলছে, একটু অপেক্ষা করুন, বুঝতে পারবেন আমাদের বাংলাতে সামারি রিভিশনের পরে যে সংখ্যক নাম বাদ হয় তাই হবে। কিন্তু সমস্যা সত্যিই কাদের হবে? যাদের সমস্যার সমাধান আমার জানা নেই, তাঁরা হলেন আমাদের রাজ্যের বিশেষ করে মতুয়া মানুষজন, এনাদের অনেককেই বিজেপি বুঝিয়েছিল যে সিএএ-তে আবেদন করলেই মিলে যাবে নাগরিকত্ব, কেন একজন মানুষ যিনি গিত ৬ থেকে ৭টা নির্বাচনে ভোট দিলেন, এদেশে থাকলেন, জমি কিনলেন, চাকরি করলেন, বিয়ে করলেন, বংশবৃদ্ধি হল, কিন্তু তিনি বা তাঁরা নাকি নাগরিক নন! হ্যাঁ, এই সমস্যা আমাদের সামনে, এর এক মিলিত প্রতিরোধ দরকার, যদি এক বিশেষ জনগোষ্ঠির নাম বাদ দেওয়া হয়, তাহলে কেবল, তাঁদের নয়, রুখে দাঁড়াতে হবে রাজ্যের মানুষকে।

দেখুন ভিডিও:

Read More

Latest News