চারিদিকে এত ঢক্কা নিনাদ, এত বড় বড় মিছিল মিটিং, কিন্তু মাটিতে কান পেতে শুনুন প্রায় সবজায়গা থেকেই খবর আসছে হ্যাঁ তৃণমূলের দু চারটে আসন কমে যেতেই পারে, তৃণমূল ১৯০ এও নেমে যেতে পারে, কিন্তু সরকার তৈরি করছে তৃণমূল। কিন্তু কেন? এক প্রবল প্রতিপক্ষ বিজেপি কেন এই বাংলাতে এত চেষ্টার পরেও ম্যাজিক সংখ্যাকে ছোঁওয়া তো দুরের কথা, কাছাকাছিও যেতে পারছে না। আজ এক দুই তিন চার করে পাঁচটা কারণ আপনাদের সামনে রাখবো যা ভালো করে শুনলে, সামান্য বোঝার চেষ্টা করলেও সাফ বুঝতে পারবেন যে কেন আবার বিজেপি এক বড় হারের দিকে এগিয়ে চলেছে। ১) বিজেপি একটা সময়ে দেশে বেনিয়াদের দল হিসেবেই পরিচিত ছিল, তাদের লাগাতার সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, বিভিন্ন শরিক দলকে সঙ্গে নিয়ে এক ধরণের সামাজিক সমীকরণ করে করে তাদের ওই বেনিয়া ভাবমূর্তির বদলে তারা নিজেদেরকে উত্তর ভারতের কাউ বেল্টের এক হিন্দুত্ববাদী দল হিসেবে তৈরি করেছে। আর নিজেদের গোবলয়ের দল হিসেবে তৈরি করতে গিয়েই তারা বাকি ভারতের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। হ্যাঁ তারা যত বেশি করে গোবলয়ে শক্তিশালী হয়েছে, তত বেশি করেই তারা বাকি দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই, ধরুন ৫০/৬০ বা তার পরেও জনসংঘ দলের সণ্নগে ওই নিরামিষ, খাদ্য ইত্যাদি নিয়ে বিরাট বাছ বিচার ইত্যাদি কিন্তু ছিল না, গোরক্ষা সমিতি ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে জনসঙ্ঘের রাজনৈতিক সম্পর্ক বা সমর্থন কোনটাই ছিল না। কিন্তু তাকে গোবলয়ের পার্টি, বিশেষ করে গোবলয়ের উচ্চ শ্রেণীর প্রতিনিধি হয়ে ওঠার জন্য এই খাদ্যাভ্যাস নিয়ে মাথা ঘামাতেই হল, শুদ্ধ শাকাহারি খাদ্য আর বিজেপি এক হল, আর তারা বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করলো দেশের বাকি অংশের থেকে। উত্তর ভারতের আরাধ্য দেবতা রাম হয়ে উঠলো তাদের প্রতীক, না মধ্য ষাটে জনসঙ্ঘের প্রতীক রাম ছিল না। ইন ফ্যাক্ট জনসঙ্ঘের কর্মসূচিতে রামমন্দির (Ayodhya Ram Mandir) আন্দোলনের উল্লেখও ছিল না। হ্যাঁ তারা খুউউব দ্রুত উত্তর ভারতের দখল নিল কিন্তু তাদের বিচ্ছিন্নতা বেড়েছিল, আর সেই বিচ্ছিন্নতা কাটানোর জন্য আজ তাদের প্রেস ডেকে ক্যামেরার সামনে মাছ খতে হচ্ছে, মোদিজী মাছ খাচ্ছেন না কিন্তু ঝাল্মুড়ি খেতে হচ্ছে, জয় শ্রী রাম ছেড়ে জয় মা কালী বলতে হচ্ছে। কিন্তু ওই যে নতুন বৈষ্ণবের কপালে টিকে চড়চড় করে, কাকের পেছনে ময়ূরের পালক গুঁজে দিলেও কাক ময়ূর হয়ে যায় না, ঠিক সেরকম কারিয়াকর্তা নিয়ে যশস্বী পরধানমন্ত্রী নরেনদর মোদি অ্যান্ড কোম্পানি গোবরের গন্ধ ধুয়ে ফেলতে পারছেন না। ২) ওই গোবলয়ের বিভিন্ন এলাকাতে দাঙ্গা হয়, নিয়মিত দাঙ্গা হয়, অসম্ভব মুসলমান ঘৃণা আছে, কিন্তু সেই প্রবল মুসলমান ঘৃণা আমাদের বাংলাতে কোনওকালেই ছিল না এখনও নেই, ওরা আমরা আছে, মুসলমানদের সম্পর্কে ভুল ধারণা আছে, দুই সমাজের মধ্যে যোগসূত্র বড্ড কম কিন্তু সেসবের পরেও বাংলার মুসলমান সমাজ তলায় প্রান্তিক খেটে খাওয়া কৃষক মজুর বা শ্রমিক দের মধ্যে এক ধরণের কামারাদেরি ছিল, সখ্যতা ছিল, আছে, যা গো বলয়ে নেই। সেই কামারাদেরি, সেই সখ্যতা, সেই বন্ধুত্ব কে না ভেঙে এক বিরাট মেরুকরণ সম্ভব নয় আর সেখানেই দু নম্বর বিষয়টা এসে যায়, এ বাংলার জনবিন্যাস।
সাধারণ হিসেবে ৩০/৩১% মুসলমান ভোটার দের এক রক সলিড সমর্থন যদি একটা দল পায় কেবল আরেকটা দলকে হারানোর শর্তে তাহলে তারা যে কোনও দৌড়ের আগেই এগিয়ে থাকে ৩০ পা। আর তারপরে আসে ওই ৬৮/৭০% হিন্দু মানুষের কথা যাদের খুউব বেশি হলেও এখনও ৪৫%, মানে আদত ভোটের ৩০/৩২% ই যায় বিজেপির দিকে। আর এই জনবিন্যাসের অংক ওই এসআইআর ইত্যাদি করে বদলে দেওয়া সম্ভব নয়, সেটাও দেখা গেল। বোঝা গেল জনবিন্যাস বদলে দেওয়ার কাজটা আসলে নির্বাচন কমিশনকে (Election Commission) দিয়ে বিজেপিই করতে চেয়েছিল কিন্তু তারা পেরে ওঠে নি। হ্যাঁ ঠিক এই কারণেই বার বার এত চিৎকার, আসছি আসছির পরেও বিজেপি শেষে হেরেই যায়। ৩) মজার কথা হল বিজেপি দলের যে ম্যানিফেস্টো তাতে কিন্তু সেকুলার কথাটা লেখা আছে, আর লাল কৃষ্ণ আদবানি সেই সেকুলারিজমের একটা চমৎকার ব্যখ্যা দিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন যে পশ্চিমা ধর্ম বিচ্ছিন্নতা নয়, আমাদের সেকুলারিজমের আদত অর্থ হল সর্ব ধর্ম সমন্বয়, কিন্তু পরবর্তিকালে সেই উত্তর ভারতের কাউবেল্টের তীব্র হিন্দু মেরুকরণ, অভি না জিসকা খুন না খঔলা খুন নহিঁ ও পানি হ্যায়। শ্লোগান ছিল বিপ্লবী চন্দ্রশেখর আজাদের কিন্তু রাম জন্মভূমির শ্লোগান হয়ে উঠল, বচ্চা বচ্চা রামকা জনমভূমিকে কাম কা হয়ে উঠল, কাজেই ওই সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের ধ্বজা সেই কবেই বিজেপি ফেলে দিয়েছে, বাংলাতে সময় আর সুযোগ দেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) সেই ধ্বজা কে আঁকড়ে ধরেছেন, ওদিকে জগন্নাথ ধাম হচ্ছে, ওদিকে মহাকাল মন্দির, এদিকে দুর্গাঙ্গন, ওদিকে দূর্গা কার্নিভাল আবার তার সঙ্গে নিয়ম করে ইদের ইফতারি থেকে নামাজে হাজিরা, গুরুদ্বারাতে অনুষ্ঠানে হাজির থাকা, ক্রিস্টমাস ক্যারলে হাজির থাকা, হ্যাঁ কেবল সংখ্যালঘু মুসলমান নয় মমতার এই সর্বধর্মসমন্বয় বিজেপির কাছে এক বিপদ, তারা বাংলার হিন্দুদের কে সেই উগ্র হিন্দু করে তুলতে পারেনি, বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তা হতে দেবে না, আর বিরাট এক নবজাগরণের উদারবাদ বিজেপির এই গোবলয়ের উগ্র হিন্দুয়ানাকে কেবল সমর্থন করেনা তাই নয়, বাঙালি সমাজে এ নিয়ে যথেষ্ট ঘৃণাও আছে। ৪) বাংলার অর্থনীতি। বিশ্বের অর্থনীতিবিদদের কাছে ক্রমশ এক গবেষণার বিষয় হয়ে উঠছে। না বড় শিল্প হয় নি, বিশাল অর্থনৈতিক গ্রোথ যাকে বলে তাও হয় নি, সম্পদ যখন জুড়বেন তখন তা বাংলার কৃষি জমির মত, ২/৩/৪/৫/৬ বিঘে জমির ক্ষেত, হ্যাঁ গুজরাটে ওই আদানি আমবানির সম্পদ বাদ দিলে তারা বিহারের থেকে পিছিয়ে পড়বে, মহারাষ্ট্রেও তাই। বাংলাতে ছোট ছোট শিল্প, সার্ভিস সেক্টর আর বিশাল সরকারি খরচ, বিভিন্ন খাতে, বিশেষ করে সামাজিক উন্নয়নের খাতে বিরাট খরচ এক ধরণের অর্থনীতির জন্ম দিয়েছে যেখানে সেই অসম্ভব খিদে নেই, সেই অসম্ভব দারিদ্র নেই। হ্যাঁ এই কাজ কিন্তু বাম আমলেই শুরু হয়েছিল, মমতার আমলে তা বিরাট হয়েছে আর এই একধরণের অন্তত খাওয়া দাওয়া, বেঁচে থাকার বেসিক উপকরণের সঙ্গে স্বাস্তঝের খানিক সুরাহা, স্কুলের বাচ্চারা মিড ডে মিলে ডিম পাচ্ছে, স্কুল ইউনিফর্ম পাচ্ছে। এরকম এক অবস্থায় বিরাট অ্যান্টি ইনকমব্যান্সি গড়ে উঠছে না। হ্যাঁ উচ্চবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্তের ঘরের ছেলেমেয়েরা দক্ষিণের শিক্ষা ব্যবস্থার অভাব বুঝতে পারছেন, অন্যান্য রাজ্যে হাইলি স্কিল্ড জব এর স্যালারি রেমুনারেশনের ফারাক বুঝতে পাচ্ছেন কিন্তু রাজ্যের ৭০% মানুষের মধ্যে সেই অভাবের ধারণাটা নেই। হ্যাঁ সেটা এক জড়ভরত অবস্থা। এটাই কি কাম্য? না কাম্য নয়। কিন্তু এতার বিরুদ্ধে ৭০% মানুষের কি বিরাট ক্ষোভ জন্ম নিচ্ছে? না নিচ্ছে না। এটাই মমতার জিয়নকাঠি। না এটা আরও অনেকদিন চলবে না, এই বৃত্ত ভাঙতেই হবে, কিন্তু এখনও এটা মমতার পক্ষেই কাজ করছে, কাজেই জিও টাওয়ারের কাজ করা ২০ হাজার মাইনে পাওয়া চাষির ব্যাটার জন্য সেই পরিবারে সরকারের ওপরে বিরাট ক্ষোভ তৈরি করছে না। ৫) দুর্নীতির বেড়াগুলো ভেঙে দেওয়াটা মানুষের মধ্যে দুর্নীতির অভিঘাততা কে, তার নোংরা অসততাকে গা সওয়া করে দিয়েছে। এটা কেবল বাংলায় নয়, এটা ভারত জুড়েই। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এরজন্য কংগ্রেস বিরোধী নেতারা ভীষণভাবে দায়ী।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | সব ক’টা অস্ত্র ব্যবহার করার পরেও মমতা এখনও একাই একশো
স্বাধীনতার পর থেকে দুর্নীতির ইস্যুতে মাত্র একতাই নির্বাচন লড়া হয়েছে, সেটা হল বোফর্স কামন কেনা বেচায় ঘুষ নেবার অভিযোগ কে কেন্দ্র করে রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে এক বিরাট ক্যাম্পেইন, কে ছিলেন না সেই প্রচারে, ভি পি সিং থেকে শুরু করে, লালকৃষন আদবানি, অটলবিহারি বাজপেয়ী, সোমনাথ চ্যাটার্জি ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত থেকে বাম নেতারা, সমাজবাদী নেতারা, এমনকি অরুণ শৌরি বা এন রাম এর মত বিখ্যাত সাংবিদিকেরা জানিয়ে ছিলেন যে একবার রাজীব গান্ধীকে সরিয়ে দিলেই পরের দিন সেই সমস্ত লোকজন যারা ঘুষ নিয়েছে তাদের ধরা হবে, জেলে পাঠানো হবে, রাজীব গান্ধী ছিলেন প্রধান অভিযুক্ত, সুইস ব্যাঙ্কে লোতাস নামে অ্যাকাউন্ট আছে এসব খবরও এসেছিল, হোয়াটস অ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে নয় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য হিন্দুতে। তারপর রাজীব হারলেন, আমরা বহু পরে জেনেছি সেই ডিল এ অন্তত রাজীব গান্ধীর নাম ছিলই না, কারা ছিলেন আজও জানাই যায় নি। হ্যাঁ সম্ভবত সেই সময় থেকেই রাজনৈতিক নেতাদের তোলা দূর্নীতির অভিযোগ মানুষের কাছে কেবল কথার কথা, মানুষ মনেই করেন সব রাজনৈতিক নেতারা চোর, যার হাতে ক্ষমতা তারা এজেন্সিকে কাজে লাগিয়ে এইসব নৌটঙ্কি করে। তা না হলে ২৭ জুন মধ্যপ্রদেশে নরেন্দ্র মোদি প্রকাশ্য ভাষণে বলেছিলেন অজিত পাওয়ার ৭০ হাজার কোটি টাকার দূর্নীতিতে যুক্ত, মাত্র ২ রা জুলাই সেই অজিত পাওয়ার ওই বিজেপি দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মহারাষ্ট্রের মূখ্যমন্ত্রী হলেন। ২২ জুলাই ২০১৫ হিমন্ত বিশ্বশর্মা চোর, দুর্নীতির মাথা বলার পরে সেই বছরেই ২৩ আগস্ট তিনি বিজেপি তে যোগ দিলেন আজ তিনি বিজেপির অন্যতম মাথা। ২০১৬ তে বঙ্গ বিজেপির দপ্তরে দেখানো হল শুভেন্দু অধিকারি হাতে করে টাকা নিচ্ছেন, ভাগ শুভেন্দু ভাগ ইত্যাদি বলার পরে বিজেপি তাকে আজ প্রজেক্টেড মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে রেখে নির্বাচনে নেমেছে, তাঁর মনোনয়ন পেশের সময়ে হাজির থাকছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে। কাজেই মানুষের কাছে দুর্নীতির অভিযোগ এখন হাস্যকপর মনে হয় তাঁরা পাত্তাও দেন না ঠিক তাই তৃণমূলের এক গুচ্ছ নেতাদের বিরুদ্ধে দূর্নীতি, খাটের তলা থেকে টাকা মেলা, চাকরি চুরি ইত্যাদির অভিযোগ গুলো মানুষ শোনেন বটে, কিন্তু পাত্তা দেন না। দিলে সেই ২০১৬ তেই সরকার পড়ে যাবার কথা। আরও অনেক কারণ আছে, কিন্তু আজ এই পাঁচটাই রইলো, এই কারণগুলো ভালো করে খতিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন কেন বিজেপি তৃণমূলের বিরুদ্ধে তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও এর আগেও জিততে পারে নি, এখনও অনেক পিছিয়ে আছে।







