ভাষা ও ভৌগোলিক সীমানা যে ধ্রুপদী সাহিত্যের পথে কখনও বাধা হতে পারে না, কলকাতার টাউন হলে তা আরও একবার প্রমাণিত হলো। শেক্সপিয়ারের নাটকের সঙ্গে সাঁওতালি সংস্কৃতির এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়ে মঞ্চস্থ হলো দ্য উইল অফ শেক্সপিয়ার। তরুণ শিল্পীদের এই অভিনব পরিবেশনা দেখে মুগ্ধ হলেন উপস্থিত বিশিষ্ট টেনিস তারকা লিয়েন্ডার পেজ।
ভুবনেশ্বরের কিট বা কলিঙ্গ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলজি এবং কিস বা কলিঙ্গ ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সেস-এর কুড়ি জন তরুণ শিল্পীকে নিয়ে তৈরি হয়েছে এই বিশেষ নাট্যদল। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাক্ষেত্র ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের এই পড়ুয়ারা নাটক, গল্প বলা এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের তাগিদেই একজোট হয়েছেন। টাউন হলের মঞ্চে তারা শেক্সপিয়ারের তিনটি কালজয়ী নাটক হ্যামলেট, ম্যাকবেথ এবং রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট সাঁওতালি সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ নতুনভাবে উপস্থাপন করেন।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শিক্ষার্থীরা নিজেরাই এই নাটকগুলির রূপান্তর, নির্দেশনা এবং অভিনয় করেছেন। শেক্সপিয়ারের সর্বজনীন বিষয়বস্তুর সঙ্গে সাঁওতালি আদিবাসী সঙ্গীত, নৃত্য, নান্দনিকতা এবং নিজস্ব গল্প বলার ঐতিহ্যের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে এই প্রযোজনায়। হ্যামলেট নাটকের মধ্য দিয়ে অন্বেষণ করা হয়েছে নৈতিকতা, শোক ও প্রতিশোধের অন্তর্দ্বন্দ্ব। ম্যাকবেথ-এ ফুটে উঠেছে লাগামহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতার বিষাদময় পরিণতি। অন্যদিকে, রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট হয়ে উঠেছে প্রেম, সংঘাত ও পুনর্মিলনের এক শাশ্বত আখ্যান। এই প্রযোজনাটি ধ্রুপদী সাহিত্য এবং আদিবাসী পরিচয়ের এক মিলনস্থল হয়ে উঠেছে, যেখানে তরুণ শিল্পীরা তাদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে কালজয়ী গল্পগুলোকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছেন।
কলকাতার মঞ্চে আসার আগেই দ্য উইল অফ শেক্সপিয়ার-এর এই যাত্রা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে রোমানিয়ার ক্রাইওভাতে আয়োজিত সম্মানজনক আন্তর্জাতিক শেক্সপিয়ার উৎসবে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করে এই তরুণ দলটি। বিশ্বজুড়ে আগত দর্শকদের সামনে শেক্সপিয়ারের নাটকের এই নিজস্ব ও অনন্য ব্যাখ্যা তুলে ধরে তারা বিপুল প্রশংসাও কুড়িয়েছেন। দেশে ফেরার পর রাষ্ট্রপতি ভবনে এই তরুণ শিল্পীদের স্বাগত জানান স্বয়ং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। তাঁর এই উৎসাহ ও প্রশংসা বিশ্বমঞ্চে ভারতের আদিবাসী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রচেষ্টাকে যে আরও সুদৃঢ় করেছে, তা বলাই বাহুল্য।

এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে উদ্যোক্তা অচ্যুতানন্দ সামন্ত বলেন, মূলত, দ্য উইল অফ শেক্সপিয়ার কেবল একটি নাট্য প্রযোজনা নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো সাঁওতালি ভাষা ও আদিবাসী ঐতিহ্যকে উদ্যাপন ও প্রসারিত করা এবং একই সঙ্গে শেক্সপিয়ারের সাহিত্যকে এক নতুন ও অর্থবহ উপায়ে বৃহত্তর দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
টাউন হলের এই সন্ধ্যা যেন বুঝিয়ে দিল, শেক্সপিয়ারের আবেদন আক্ষরিক অর্থেই সর্বজনীন। রাজপ্রাসাদের গণ্ডি বা ইংরেজি সাহিত্যের এলিট তকমা ছাড়িয়ে সেই ধ্রুপদী সাহিত্য অনায়াসেই সাঁওতালি সংস্কৃতির লৌকিক বাতাবরণে নতুন প্রাণ খুঁজে নিতে পারে। তরুণ শিল্পীদের এই সৃজনশীলতা কেবল বিশ্বসাহিত্যের পুনর্বিন্যাস নয়, বরং প্রান্তিক জনগাষ্ঠীর আত্মপরিচয়কে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার এক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। লিয়েন্ডার পেজের মতো ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি এই আয়োজনের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আগামী দিনে এই নাট্যদল ভারতীয় সংস্কৃতির নতুন দূত হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন নাট্যবোদ্ধারা।







