Wednesday, March 11, 2026
HomeScrollFourth Pillar | সোনালি ঘরে ফিরবেন কবে? তাঁদের এই ৫ মাসের ভোগান্তির...
Fourth Pillar

Fourth Pillar | সোনালি ঘরে ফিরবেন কবে? তাঁদের এই ৫ মাসের ভোগান্তির জবাব শুভেন্দু অধিকারী দেবেন?

বাংলাদেশের আদালত বলছে, এঁরা ভারতীয়; ভারতের হাইকোর্ট বলছে, এঁরা ভারতীয়; অথচ প্রশাসন অনড়

Written By
অনিকেত চট্টোপাধ্যায়

এক রাতের মধ্যে ঘর খালি করে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। না হলে ঘাড় ধাক্কা দিয়েই কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে পাঠানো হবে, এই হুঁশিয়ারিও সঙ্গে ছিল। ঘুসপেটিয়া অনুপ্রবেশকারীই আপাতত বঙ্গ বিজেপির সবথেকে বড় ইস্যু। বাংলার রাজনৈতিক দলের কারা কী করবে, আমার জানা নেই; কিন্তু বাংলার সিভিল সোসাইটির কাছে আমার আবেদন, ২৯৪টা বিধানসভা কেন্দ্রে নিয়ে হাজির করা হোক এই সোনালি খাতুনকে। মানুষ জানুক এই মোদি সরকার, দেশের এক মহিলা এবং তাঁর পরিবারের উপরে কোন অত্যাচার নামিয়ে এনেছিল, জানুক এক অন্তঃস্বত্তা মহিলাকে কীভাবে এক কাপড়ে কপর্দকহীন অবস্থায় ঠেলে পাঠানো হয়েছিল কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে। সোনালি বিবির বাবা মায়ের নাম ২০০২-এর ভোটার লিস্টে আছে, তারপরেও তাঁকে বাংলাদেশি বলে পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশে। আইনি জটিলতায় অন্তঃস্বত্তা সোনালি বিবি দু’মাস রাস্তায় ঘাটে ঘুরে বেড়িয়েছেন, আর প্রায় তিন মাস বাংলাদেশ জেলে থাকার পরে আজ জামিন পেয়েছেন। তাঁকে বাংলাদেশেই সেফ হাউসে রাখা হয়েছে, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তাঁদের ফিরিয়ে আনার কথা তো বলেছেন, ইন ফ্যাক্ট নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা? এখনও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে কোনও কথাই শোনা যাচ্ছে না। সরকারের মাথায় বসে থাকা জনগণের চৌকিদারের হুঁশ ছিল না তাঁকে ফেরানোর, বড়বড় কথা বলা বিদেশমন্ত্রীর নজরেই নেই ঘটনাটা, ‘অনুপ্রবেশ, অনুপ্রবেশ’ বলে দু’বেলা চেঁচিয়ে মরছেন অমিত শাহ, তাঁরও নজর নেই এই ব্যাপারে। কেন? সোনালি মুসলমান বলে? ওদিকে বাংলাদেশের আইনে দোষী সাব্যস্ত একজনকে আমাদের দেশে নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে রেখে দেওয়া হয়েছে, বলা হয়েছে উনি বাংলাদেশে গেলে নাকি প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই যাবেন। এখনও পর্যন্ত ভারতের বিদেশ মন্ত্রক সোজাসুজি এই দুটো ব্যাপার নিয়েই কোনও কথাই বলছেন না। “সোনালি বিবিকে বাংলাদেশে পুশ ব্যাক করেছে তো স্বরাষ্ট্র দফতর চুপ কেন?” সোনালি খাতুনের বাড়ি ফেরার লড়াই, ভাবুন তো একবার, পেটে আট মাসের সন্তান নিয়ে ২৫ বছরের এক তরুণী ভিনদেশের জেলে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর অপরাধ? নিজের দেশ তাঁকে চিনতে অস্বীকার করেছে, আর ভিনদেশ তাঁকে বলছে অনুপ্রবেশকারী। এটা কোনও সিনেমার গল্প নয়, এটা পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার মেয়ে সোনালি খাতুনের জীবনের নির্মম সত্যি। রাষ্ট্র, রাজনীতি আর আমলাতন্ত্রের জটিল জাঁতাকলে পিষে যাওয়া এই মেয়েটার গল্প শুনলে শিউরে উঠতে হয়। দিল্লি থেকে রাতারাতি ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে বের করে দেওয়া থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের এজলাস পর্যন্ত—এই পুরো ঘটনাটা আধুনিক ভারতের নাগরিকত্ব সংকটের এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

দিল্লি থেকে উধাও: এক রাতের দুঃস্বপ্ন। গল্পের শুরুটা বেশ সাধারণ। সোনালি আর তাঁর স্বামী দানিশ শেখ, বীরভূমের মুরারইয়ের পাইকর গ্রামের বাসিন্দা। পেটের দায়ে তাঁরা বছর বিশেক ধরে দিল্লিতে থাকতেন। মানে কেবল তিনি নন, তাঁর বাবা-মাও সেখানেই ছিলেন। রোহিণীর এক বস্তিতে থেকে ভাঙাচোরা জিনিস কুড়িয়ে সংসার চালাতেন। তাঁদের সঙ্গে থাকত আট বছরের ছেলে সাবির। কিন্তু গত জুন মাসে, লোকসভা ভোটের ঠিক পরেই, তাঁদের সাজানো জগৎটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। ১৮ থেকে ২১ জুনের মধ্যে দিল্লি পুলিশ হঠাৎই ‘আইডেন্টিটি ভেরিফিকেশন’ বা পরিচয় যাচাইয়ের নামে তাঁদের আটক করে। অভিযোগ, তাঁরা নাকি বাংলাদেশি। সোনালিরা বারবার তাঁদের আধার কার্ড, ভোটার কার্ড দেখালেন, কিন্তু পুলিশ সে সব কানেই তুলল না। অদ্ভুত ব্যাপার হল, কোনও আদালতে বিচার হল না, আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হলো না, সোজা এফআরআরও-র (FRRO) আদেশে তাঁদের ‘রেস্ট্রিকশন’ ক্যাম্পে পাঠানো হল। আর তারপর? মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে, অর্থাৎ ২৬ জুন, তাঁদের অসম সীমান্ত দিয়ে সোজা বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হল। একে বলে ‘হট হেস্ট’ বা তাড়াহুড়ো করে বের করে দেওয়া, যা পরে কলকাতা হাইকোর্টও উল্লেখ করেছে। শুরু হল সীমান্তের ওপারে এক ভবঘুরে জীবন আর জেলযাত্রা। বিনা দোষে, কপর্দকহীন অবস্থায় এক গর্ভবতী নারীকে মাঝরাতে ভিনদেশে ঠেলে দেওয়া হল। জুন মাসের শেষে বাংলাদেশে ঢোকানো হলেও, তাঁরা ধরা পড়েন অগাস্ট মাসে। এই মাঝের দু’মাস সোনালি, দানিশ, তাঁদের বাচ্চা ছেলেটা এবং তাঁদের সঙ্গে থাকা প্রতিবেশি সুইটি বিবি ও তাঁর দুই ছেলে কীভাবে বেঁচেছিলেন, তা ভাবলেও কষ্ট হয়। তাঁরা ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছেন, পার্কের বেঞ্চে ঘুমিয়েছেন, মানুষের কাছে হাত পেতে খেয়েছেন। শেষে উপায় না দেখে হয়তো ভারতের দিকেই ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ২১ অগাস্ট বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জে পুলিশ তাঁদের সন্দেহজনকভাবে ঘুরতে দেখে আটক করে। সেখানেও সেই একই ট্র্যাজেডি—ভারতের নাগরিকত্বের প্রমাণ (আধার কার্ড) দেখানোর ফলেই বাংলাদেশে তাঁদের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশের মামলা হল। সোজা জেল হেফাজতে পাঠানো হল তাঁদের। নিজ দেশ যাঁদের তাড়িয়ে দিল, পরদেশ তাঁদের জেলে পুরল। এই সময়ে এই খবর পেলেন বাংলার কিছু মানুষ, খবর পেয়েছিলেন রাজ্য সভা সাংসদ সামিরুল ইসলাম, শুরু হল আইনি লড়াই, আদালতের দরজায় কড়া নাড়া। বীরভূমে সোনালির বাবা ভদু শেখ মেয়েকে ফিরে পেতে পাগলপ্রায়। তিনি কলকাতা হাইকোর্টে ‘হেবিয়াস কর্পাস’ মামলা করলেন। তাঁর আইনজীবীরা আদালতে দেখালেন যে, এই পরিবারটা কোনওভাবেই বাংলাদেশি হতে পারে না। প্রমাণ হিসেবে তাঁরা পেশ করলেন ২০০২ সালের পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা, যেখানে সোনালির বাবা-মায়ের নাম জ্বলজ্বল করছে। আরও দেখালেন ১৯৫২ সালের জমির দলিল। হাইকোর্ট সব দেখে ২৬ সেপ্টেম্বর এক ঐতিহাসিক রায় দিল। বিচারপতিরা পুলিশ ও প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করে বললেন, এভাবে যাচাই না করে কাউকে দেশ থেকে বের করে দেওয়া যায় না। আদালত নির্দেশ দিল, চার সপ্তাহের মধ্যে সোনালি ও তাঁর সঙ্গীদের ফিরিয়ে আনতে হবে।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | নির্বাচন কমিশনের মুখোশটা খুলে গিয়ে বেরিয়ে এল তাদের আসল চেহারা

কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়। হাইকোর্টের নির্দেশের পরেও চার সপ্তাহ কেটে গেল, কিন্তু সোনালিরা ফিরলেন না। উল্টে কেন্দ্র সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে চলে গেল। কেন্দ্রের যুক্তি ছিল, হাইকোর্ট জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টা দেখেনি এবং এফআরআরও-র কাজে হস্তক্ষেপ করেছে। ওদিকে, বাংলাদেশের আদালতেও এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। ৩ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালত সোনালিদের নথিপত্র দেখে রায় দিল যে, এঁরা ভারতীয় নাগরিক এবং এঁদের দ্রুত ভারতে ফেরত পাঠানো হোক (পুশব্যাক)। অর্থাৎ, বাংলাদেশের আদালত বলছে এঁরা ভারতীয়, ভারতের হাইকোর্ট বলছে এঁরা ভারতীয়, অথচ প্রশাসন অনড়। এবারে এল সুপ্রিম কোর্টের ধমক, আর সেখান থেকেই প্রথম আশার আলো। বিষয়টা শেষমেশ ভারতের সুপ্রিম কোর্টে উঠল। ২৫ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ কেন্দ্র সরকারকে বেশ কড়া কথাই শোনাল। আদালত বলল, “যাঁরা দাবি করছেন তাঁরা ভারতীয় এবং যাঁদের কাছে নথিপত্র আছে, তাঁদের কথা না শুনেই কি বের করে দেওয়া যায়?” সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রকে পরামর্শ দিল, আগে তাঁদের ফিরিয়ে আনুন, তারপর না হয় নাগরিকত্ব যাচাই করবেন। বিশেষ করে সোনালি যেহেতু অন্তঃসত্ত্বা, তাই মানবিক দিকটা সবার আগে দেখতে হবে। আদালত ১ ডিসেম্বরের মধ্যে কেন্দ্রকে জানাতে বলেছে যে, তাঁরা কবে এবং কীভাবে এই পরিবারগুলোকে ফিরিয়ে আনবে। আগেই বলেছি, ২০০২ সালের পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় যা বিশেষ সংশোধনের পরেই তৈরি হয়েছিল সেখানে সোনালির বাবা ভদু শেখ ও মা জ্যোৎস্না বিবির নাম রয়েছে। এছাড়া ১৯৫২ সালের জমির রেকর্ড প্রমাণ করে যে তাঁরা দেশভাগের সময় আসা উদ্বাস্তু বা অনুপ্রবেশকারী নন, বরং বংশপরম্পরায় এদেশের বাসিন্দা। সোনালির নিজের আধার কার্ড, প্যান কার্ড এবং ভোটার কার্ডেও তাঁর জন্মসাল ২০০০ বা তার আশেপাশে দেখানো হয়েছে, যা প্রমাণ করে তিনি জন্মসূত্রেই ভারতীয়। এমনকি গ্রামের যে দাইমা সোনালির প্রসব করিয়েছিলেন, তিনিও সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত।

সোনালির দিন কাটছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগারের চার দেওয়ালের মধ্যে। তিনি এখন গর্ভাবস্থার একদম শেষ পর্যায়ে। জেলের খাবার আর পরিবেশে তাঁর শরীর ও মন দুই’ই ভেঙে পড়েছে। যদিও জেল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু পরিবারের চিন্তা, বাচ্চাটা যদি জেলের মধ্যে জন্মায়, তবে তাঁর ভবিষ্যৎ কী হবে? তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে কি নতুন জটিলতা তৈরি হবে না? অন্যদিকে সুইটি বিবির কিশোর ছেলে কুরবান শেখ এবং ছোট ছেলে ইমাম দেওয়ানও জেলের ঘানি টানছে। এই শিশুদের শৈশব আজ আদালতের ফাইলে আর জেলের গরাদে আটকে গিয়েছে। এবং সেই সময়ে গতকাল পয়লা ডিসেম্বর চাঁপাইনবাওগঞ্জের আদালতের রায়ে সোনালি আর তাঁর সঙ্গিরা জামিন পেলেন। কিন্তু তাঁরা ঘরে ফিরবেন কবে? সোনালি খাতুনের এই ঘটনাটা কেবল একটা সাধারণ আইনি মামলা নয়, এটা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, নথিপত্রের রাজনীতির চেয়ে মানুষের জীবন অনেক বেশি দামী। সমস্যা হল এই এসআইআর-এর পরে নথিপত্রের এরকম ভুলে অজস্র মানুষের সঙ্গে ঠিক এটাই হবে, যদি না আমরা এখনই রুখে দাঁড়াই।

দেখুন ভিডিও:

Read More

Latest News

toto evos gaming

https://rendez-vous.benin-ambassade.fr/profil-d/ https://www.annabelle-candy.com/about/ JUARA88 DEPOBOS idn poker 88 situs slot gacor https://www.demeral.com/it/demeral_software/ BWO99 slot 5000 poker situs slot gacor joker toto slot maxwin slot maxwin situs bola BANDAR80 WATITOTO LGO188 DEPOBOS https://www.demeral.com/it/podcast