এতক্ষণে অনেকেই জেনে গেছেন খসড়া ভোটার তালিকাতে তাঁর নাম আছে কি না, অনেকে সেটা কাল পরশুর মধ্যে জেনে ফেলবেন। এখনও যা হিসেব তা হল, ২০০২ সালের এসআইআর তালিকার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি মাত্র ৩.৯৯%-এর ভোটারের, যে সংখ্যাটা প্রায় ৩০.৫৯ লক্ষ। তাঁরা ডাক পাবেন শুনানিতে। মানে এঁদের কাছে যে তথ্য চাওয়া হবে তা পেলে তাঁদের নাম ফাইনাল ভোটার লিস্ট এ উঠবে। এ ছাড়া, অনুপস্থিত, ঠিকানা বদল, মৃত এবং ডুপ্লিকেট ভোটারের (এএসডিডি) সংখ্যা ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৮। এই ভোটারদের নামই থাকবে না খসড়া তালিকায়। কিন্তু সেই তালিকাও প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে (বুথ) ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। যদি কারোর মনে হয় এই বাদ দেওয়া তালিকাতে তাঁর বা তাঁদের নাম আছে, তাহলে দাবি-আপত্তি-অভিযোগ পর্বে আবেদন জানাতে পারবেন যে কেউ। এই দুই সংখ্যার বাইরে আরও প্রায় ১.৩৬ কোটি ভোটারের দেওয়া তথ্য নিয়ে চলছে পুনর্যাচাই। কেন? অনেকের বাবা মায়ের নামের বানান ভুল, অনেকের বাবা মায়ের সঙ্গে বয়সের ফারাক গোলমেলে, এসব ছাপার ভুল হয়াটা স্বাভাবিক, তাঁদেরও একাংশকে শুনানিতে ডাকা হতে পারে। কিন্তু এই খসড়া তালিকা আর ফাইনাল তালিকার মধ্যে থাকবে কমবেশি দেড় মাস সময়। কাজেই এরমধ্যেই প্রত্যেক বৈধ নাগরিকের নাম যাতে এই ভোটার তালিকাতে যোগ হয় তা দেখার দায়িত্ব এই খসড়া তালিকাতে নাম যাঁদের আছে তাঁদেরও, আর সেটাই বিষয় আজকে, শপথ নিন, বাংলার একজন বৈধ ভোটারেরও নাম বা দিতে দেবো না।
ভোটার তালিকা সংশোধন এই প্রথম নয়, নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) হ্যান্ডবুক অনুযায়ী ভোটার তালিকা সংশোধন কিন্তু সারা বছর ধরেই চলতে থাকে, প্রতিবার নির্বাচনের আগে সামারি রিভিশন হয়। তখন আগের নির্বাচনের পরে যাঁরা মারা গিয়েছেন, যাঁরা স্থানান্তরিত হয়েছেন তাঁরা বাদ পড়েন, আর যাঁরা ১৮ বছরে পা দিলেন তাঁদের নাম যোগ করা হয় বা অন্য জায়গা থেকে স্থায়ী ভাবে বসবাস করতে আসা মানুষজনের নাম যোগ হয়, কখনও সখনও কিছু নাম যা নাকি আগে বাদ পড়েছিল, সেই নামও যোগ হয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন দুটো কাজ আজ অবদি করেনি, ১) তারা নাগরিকত্ব যাচাই এর কাজ করেনি, তাদের সেই আইনী এক্তিয়ার নেই, পরিকাঠামোও নেই। ২) তারা মূলত ভোটার তালিকার সংশোধন করার কাজ করেছেন, কিছু নাম বাদ দেবো, এই উদ্দ্যেশ্য নিয়ে করেন নি। যার ফলে এর আগে বিভিন্ন জামানাতে ক্ষমতাশীন দলের কারোর মুখে কোনওদিন শোনাই যায় নি যে দেড় কোটি, দু কোটি নাম বাদ দিয়ে দেবো ইত্যাদি। এবারে স্পেশ্যাল ইনটেনসিভ রিভিউ অফ ভোটার লিস্ট হচ্ছে। তো নির্বাচন কমিশনের হ্যান্ডবুক কী বলছে? নির্বাচন কমিশনের হ্যান্ডবুকে স্পষ্ট লেখাই আছে যে হ্যাঁ এই এস আই আর করা যাবে, কিন্তু সেটা একটা নির্দিষ্ট বিধানসভায় কিম্বা একটা বিধানসভার নির্দিষ্ট অঞ্চলে। কারণ? মানে সেটা কখন করা যায়? ধরুন একটা নির্বাচন আসছে, এদিকে এক অঞ্চলে বিরাট বন্যা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলা অসংখ্য মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন, তাঁদের কাছে কাগজপত্র, ভোটার কার্ড নেই, তখন এই এস আই আর করে পুরনো ভোটার তালিকাতে যাঁদের নাম আছে আগে তাঁদের নাম তালিকাতে রেখে, বাকিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে একটা ফাইনাল ভোটার তালিকা তৈরি করা হয়। এই রিভিউ বাদ দিলে ভোটার তালিকা সংশোধন সারা বছর ধরে চলতে থাকে, কেবল নির্বাচনের আগে একটা তালিকা বের করা হয়, তারও এক দেড় মাস পরে সেই তালিকাতে নতুন সংযোজনের তালিকাও জোড়া হয়।
আরও পড়ুন: Aajke | ‘মেসি’-র ঘোলাজলে মাছ ধরতে নেমেছেন শুভেন্দু?
এবারে যেটা হচ্ছে তা বেআইনী, যা হচ্ছে সেটা মোদি শাহের নির্দেশে এক্তিয়ার ছাড়াই নাগরিকত্ব যাচাই করা হচ্ছে, এস আই আর হচ্ছে আর রাজ্যের বিরোধী দলনেতা হুঙ্কার দিচ্ছেন দেড় কোটি, দু কোটি মানুষের নাম বাদ যাবে। হ্যাঁ এটাই সমস্যা, তাই এই মুহুর্তে আমাদের প্রথম কাজ হল এই ষড়যন্ত্রকে রুখে দেওয়া। কীভাবে? দেখুন উচ্চবিত্ত, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষজনদের নাম কাতার সুযোগ নেই, কিন্তু বহু দরিদ্র, সেই অর্থে ইললিটারেট, মানে অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষজনদের অনেকের নাম বাদ যাবে তাদের সমস্ত তথ্য না থাকার কারণে। কাজেই তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে, তাঁদেরকেও দেশের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চক্রান্তকে রুখতে হবে, তাঁদের কাছে যান, সমস্যা বুঝে সমাধান করার চেষ্টা করুন বা ইতিমধ্যে যে সহায়ক কেন্দ্রগুলো খোলা হয়েছে, তাদের সাহায্য নিন। একজন বৈধ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ না যায় সেটা দেখা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেষ করেছিলাম, নির্বাচন কমিশন বিজেপি সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চাইছে, এবারে এই বাংলায় এখনও পর্যন্ত দেড় কোটি মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, এই বিষয়ে আপনাদের মতামত জানান।
প্রতি নির্বাচনের আগে মৃত স্থানান্তরিত ভোটার বাদ দিয়ে আর নতুন ভোটার জুড়ে ভোটার তালিকা সংখ্যা হরে দরে প্রায় একই থাকে। এবার সেই ভোটার তালিকার এক কোটি ৬০ লক্ষ মানুষের ভোট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নির্বাচন কমিশন। এই লোকজনেরা গত ৭/৮/১০ টা বিধানসভা লোকসভাতে ভোট দিয়েছে, কেউ তৃণমূল কেউ বাম কেউ বিজেপিকেই ভোট দিয়েছে। তাদের ভোটেই আজ দিল্লিতে বিজেপির সরকার, রাজ্যে তৃণমূলের সরকার, অথচ তারাই নাকি নাগরক নয়, তারাই নাকি অবৈধ ভোটার। তো এই অবৈধ ভোটারের ভোটে জিতে আসা সরকারগুলো কী করে বৈধ হয় সেটাই এখন আমাদের প্রশ্ন।







