২০২৬ সালের ২৩ মার্চ। বিশ্ব এক অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইজরায়েল-ইরানের যুদ্ধ তার চতুর্থ সপ্তাহে পা দিয়েছে। এই সংঘাত আর দুটো দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে লোহিত সাগর থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরশুর ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম আর তার উল্টোদিকে ইরানের পাল্টা হুমকি বিশ্বজুড়ে এক নতুন ভয়ের, এক তীব্র আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে—তাহলে কি আমরা একটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি? মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোনের গর্জন শুনছে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশ ছুঁয়েছে, আর সাধারণ মানুষ যুদ্ধের এই দাবানলে জ্বলেপুড়ে মরছে। মাত্র কদিন আগে আমাদের দেশের শেয়ার বাজার ছিল ৮৫ হাজারে, আজ সেটা নেমে ৭২ হাজারে চলে এসেছে, কেবল এই তথ্যই বলে দেয় এই মূহুর্তে পরিস্থিতির গভীরতা, এর অর্থনৈতিক প্রভাব আর সামনে এসে যাচ্ছে আরেক বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা। আসলে তেল দেখলেই আমেরিকার হাত চুলকোয়, সে যেই থাকুক ক্ষমতায়।
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ইরানে এক বিশাল বিক্ষোভ শুরু হয়, যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর সবথেকে বড় গণজাগরণ, কিন্তু সেটা তো ইরানের দেশের ভেতরের সমস্যা। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বিক্ষোভকে আমেরিকার স্বার্থে কাজে লাগানোর জন্যই সমর্থন করে ইরানের উপর সামরিক অভিযানের হুমকি দেন। ভাবুন একবার, এক স্বাধীন দেশের নিজেদের রাজনৈতিক সামাজিক সমস্যাকে ব্যবহার করছে অন্য আরেক দেশ, অবশ্য আমেরিকার কাছে এটা নতুন কিছু নয়। আর ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের পর সবথেকে বড় সামরিক অভিযান শুরু হল। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র আর ইজরায়েল একসঙ্গে ইরানে বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যার পোশাকি নাম ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ আর ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’। এই হামলায় ইরানের শীর্ষ আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই মারা গেলেন, যা ইরানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে শুধু নয়, সেখানকার রাষ্ট্র, সমাজ মানুষকে এই হামলার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা আর সাহস যুগিয়েছে।
এই যুদ্ধ তো শুরু হয়েছিল পরমাণু আলোচনা চলাকালীন, কথা নেই বার্তা নেই এক আচমকা হামলা হিসেবে, যা সরাসরি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। আর তারপরে যা ঘটলো তা ছিল স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, ইরানের প্রতিশোধ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি, ইজরায়েলের শহরগুলোতে শয়ে শয়ে ব্যালিস্টিক মিসাইল, ড্রোন ছুঁড়তে থাকে। এখন পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে যে, এই যুদ্ধের মূল কারণ কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার আর এক দীর্ঘস্থায়ী শাসন পরিবর্তনের পরে এক কাঠপুতুল সরকার বসানোর চেষ্টা। কাজেই যুদ্ধ ছড়াতে শুরু করল, হরমুজ প্রণালী বন্ধ, ইরান বড় মাপের ক্ষতিপূরণ নিয়েই কিছু জাহাজ ছাড়ার ব্যবস্থা করল, তারাই জানিয়েছে সেটা জাহাজ পিছু ভারতীয় টাকায় প্রায় ২০ কোটি টাকা। এর পরে ২১ মার্চ ২০২৬, শনিবার রাতে ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে এক বিস্ফোরক কথা লিখে দিলেন, উন্মাদের ঘোষণা। তিনি ইরানকে ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়েছেন হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণভাবে আর কোনও হুমকি ছাড়াই খুলে দেওয়ার জন্য। যদি ইরান এটা না করে বা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বৃহত্তম বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে শুরু করে একের পর এক সমস্ত জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করে দেবে। ট্রাম্পের এই হুমকি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন তিনি একদিকে যুদ্ধ শেষ করার কথা বলছেন, আবার অন্যদিকে অসামরিক অবকাঠামোতে হামলার ভয় দেখাচ্ছেন। আসলে চাপে পড়েছেন ট্রাম্প সাহেব, ট্রাম্পের এই চরমপত্র মূলত মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপ আর আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলকে সামনে রেখে করা হয়েছে। তেলের দাম বাড়ার কারণে মার্কিন ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে, আর ট্রাম্প সেই চাপ কমাতে ইরানকে এক ‘কুইক ফিক্স’ এর মত দ্রুত সমাধানের পথে আনতে চাইছেন। তবে এই আল্টিমেটাম বিশ্ববাজারে এক ‘টিকেটিং টাইমবোমা’র মতো কাজ করছে।
বিশ্বজুড়ে অর্থ বাজারে ধস নেমেছে। আর ট্রাম্পের এই আল্টিমেটাম অনুযায়ী ইরানের বেশ কিছু বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখন সরাসরি হুমকির মুখে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়টা হল তেহরানের কাছে অবস্থিত ২,৮৬৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার তাদের দেশের বৃহত্তম তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ‘দামাভান্দ’। এছাড়া দক্ষিণ উপকূলের একমাত্র পারমাণবিক কেন্দ্র ‘বুশেহর’ (১,০০০ মেগাওয়াট), দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের ‘কেরমান’ কেন্দ্র (১,৯১২ মেগাওয়াট), খুজেস্তান প্রদেশের ‘রামিন’ স্টিম টারবাইন কেন্দ্র (১,৮৯০ মেগাওয়াট), মাজানদারান প্রদেশের ‘নেকা’ কেন্দ্র (১,৭৬০ মেগাওয়াট) আর ইসফাহান শহরের ‘শহীদ মোহাম্মদ মুনতাজেরি’ (১,৬০০ মেগাওয়াট) কেন্দ্রটাও ট্রাম্প সাহেবের টার্গেটে রয়েছে। এটা সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধ’, কারণ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালানো আইন নেই, কিন্তু উনি এই হুমকি দিচ্ছেন সেসব জেনেও, আসলে যুদ্ধ আর কিছুদিন চললে বিশ্বের অনেক শাসকের গদি টলমল করবে। এতটুকু টসকায়নি ইরান, ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ সরাসরি জানিয়েছেন যে, যদি ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে হামলা হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের পুরো অঞ্চলকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দেওয়া হবে। ইরানের সামরিক কমান্ড ‘খাতাম আল-আম্বিয়া’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, মার্কিন হামলার পরপরই তারা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন জ্বালানি, জলশোধন কেন্দ্র আর তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো ধ্বংস করে দেবে। কারণ আমেরিকার অসামরিক পরিকাঠামোর উপরে আক্রমণ তাদের হাতেও সেই একই সুযোগ তৈরি করে দেবে। ইরানের এই কৌশলের নাম ‘অপ্রতিসম প্রতিশোধ’। তারা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি বা কুয়েতের মতো দেশগুলোর জলশোধন কেন্দ্র বা ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যা ধ্বংস হলে ওই দেশগুলোতে পানীয় জলের হাহাকার তৈরি হবে। হ্যাঁ, চারিদিকে নোনা জলে ঘেরা ওই অঞ্চলে জলের আকাল এক বিরাট ব্যাপার। এছাড়া কাতার, বাহরাইন বা ওমানের আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিডে আঘাত হেনে অর্থনৈতিক স্থবিরতা আনার হুমকিও রয়েছে। পাশাপাশি ইজরায়েল আর আঞ্চলিক মার্কিন ঘাঁটিগুলোর তথ্যপ্রযুক্তি পরিকাঠামো, জিসিসি অঞ্চলে মার্কিন মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোকেও তারা বৈধ টার্গেট হিসেবে ঘোষণা করেছে, যা শেয়ার বাজারে ধস নামাতে পারে। আর সব থেকে বড় কথা হল, ইরানের এই হুমকি কেবল ফাঁকা বুলি নয়। ২০২৬ সালের ২২ মার্চ রাত থেকেই কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে ক্রমাগত মিশাইল বা ড্রোন আক্রমণ হয়েছে। আবু ধাবিতে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক ভারতীয় নাগরিক আহত হয়েছেন।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | আগে মা’কে খুঁজে নিয়ে আসুন, মোদিজি, তার পর অন্য কথা!
মানে যুদ্ধ ইতোমধ্যেই আঞ্চলিক সীমানা অতিক্রম করেছে। আর ঠিক সেই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় স্ট্রাটেজিক প্রশ্ন, হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্বের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ তেলের করিডোর। এখান দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়, যা বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২১ শতাংশ। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান এই প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও তারা দাবি করেছে যে, তারা কোনও শত্রু রাষ্ট্র ছাড়া অন্যদের চলাচলে বাধা দিচ্ছে না, তবে বাস্তবে বিমা খরচ বৃদ্ধি আর হামলার ভয়ে এই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গিয়েছে। এই অবরোধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১১১-১১২ ডলারের আশেপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে আর পরিস্থিতি খারাপ হলে তা ১৫০ থেকে ২০০ ডলারে পৌঁছতে পারে। এই প্রণালী দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে দেশভেদে আলাদা আলাদা ছবি উঠে আসছে। ভারত প্রধানমন্ত্রী মোদীর আলোচনার পর কয়েকটা এলপিজি ট্যাঙ্কার পার করতে পেরেছিল, এখন জানা যাচ্ছে তার জন্য জাহাজ পিছু ২০ কোটি টাকা দিতে হয়েছে, তার উপরে ইরান ভারতের ওপরে চাপ দিচ্ছে ব্রিক্স-এর তরফে এই আক্রমণকে নিন্দা করার। চীন তেহরান থেকে এক ধরণের ‘অঘোষিত সবুজ সংকেত’ পাওয়ায় তাদের জাহাজগুলো কিন্তু নিরাপদে যাতায়াত করছে। পাকিস্তানের তেলবাহী জাহাজ ‘করাচি’ ইরানি উপকূল ঘেঁষে চলাচল করতে পারছে। তুরস্ক বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে জাহাজ পারাপার করছে, কিন্তু জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এখনও বিকল্প জ্বালানি উৎসের জন্য হাহাকার করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের জন্য এই পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই জ্বালানি সংকটের বড় প্রভাব পড়ছে এশিয়ার দেশগুলোর উপর। পাকিস্তান ইতোমধ্যেই এলএনজি কেনা বন্ধ করে দিয়েছে কারণ তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতির পক্ষে এই দাম বহন করা অসম্ভব। বাংলাদেশে এলএনজি কার্গোর দাম এক মাসের ব্যবধানে তিনগুণ বেড়েছে। ভারত ল্যওসের মতো দেশগুলোতে পেট্রোলের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
ইরানের উপর মার্কিন হামলা কেবল ইরানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটা তার প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য এক মহাবিপদ ডেকে এনেছে। ইরান দক্ষিণ এশিয়া আর পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোতে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ ও গ্যাস রফতানি করে। যুদ্ধের ফলে এই সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে মানবিক বিপর্যয় শুরু হয়েছে। ইরাক তার বিদ্যুতের এক বিশাল অংশের জন্য ইরানের প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। বাসরার রুমাইলা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রায় ১,৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গিয়েছে, ফলে সমগ্র ইরাক এখন ব্ল্যাকআউটের কবলে পড়েছে। পাকিস্তানও তার বেলুচিস্তান অঞ্চলের জন্য ইরানের বিদ্যুতের উপর নির্ভরশীল, যা এখন অনিয়মিত হয়ে পড়ায় সার ও তেলের দাম বাড়ছে। আফগানিস্তান তাদের মোট চাহিদার ৭২০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ আমদানি করে ইরান আর প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে; এবারে সেই গ্রিড ধসে পড়লে সেখানে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হবে। এমনকি তুরস্কেও জ্বালানি খরচ ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছে।
আর ঠিক এই সময়েই অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এই যুদ্ধ কি সত্যিই একটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে? বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বিশ্ব এখন আর ১৯৪০-এর দশকের মতো নয়, তবে আজকের যুদ্ধের চেইন রিঅ্যাকশন বা শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া অনেক বেশি শক্তিশালী। একটা ছোট যুদ্ধও সারা পৃথিবীতে বিশাল প্রভাব ফেলতে শুরু করে। রাশিয়া ইতোমধ্যেই ইরানকে মার্কিন বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে গোপন গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে। চীন এই সংকটে নিরপেক্ষ সাজার চেষ্টা করলেও ইরান থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে আর তাদের জাহাজগুলো নিরাপদে যাতায়াত করছে। সে তো এমনি এমনি নয়, বলা হচ্ছে চীন সরাসরি যুদ্ধের জন্যই বহু সাহায্য পাঠাচ্ছে। অন্যদিকে ন্যাটো-র অভ্যন্তরীণ কোন্দলও সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প তাঁর বন্ধুদের জাহাজ পাহারার অনুরোধ করেছিলেন, ফ্রান্স, জার্মানি কানাডা তা প্রত্যাখ্যান করেছে, যার ফলে ট্রাম্প খেপে গিয়েছেন, ন্যাটোকে ‘কাগুজে বাঘ’ (paper tiger) বলে দিয়েছেন। ২০ মার্চ ২০২৬ তারিখে ইজরায়েল ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলা চালায় বলে ইরান দাবি করে। এর প্রতিশোধ হিসেবে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে ইজরায়েলের দিমোনা শহরের কাছে, যেখানে তাদের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র আছে। যদিও বড় ধরণের তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়নি, অন্তত ইজরায়েল সেটাই জানাচ্ছে, তবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ৪,০০০ কিলোমিটার পাল্লা ইউরোপের রাজধানীগুলোকেও এখন হুমকির মুখে ফেলেছে। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে দেখলে এই যুদ্ধ কেবল তেলেই সীমাবদ্ধ নেই। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ ইউরিয়া আর অ্যামোনিয়া সার সরবরাহ করে, যা বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে সারের দাম ৩০-৩৫ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। কাতার বিশ্বের ৪০ শতাংশ হিলিয়াম উৎপাদন করে, যা সেমি-কন্ডাক্টর তৈরিতে ব্যবহৃত হয়; এর সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় স্মার্টফোন ও ল্যাপটপের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম দ্বিগুণ হয়েছে আর এশিয়া অস্ট্রেলিয়ার শেয়ার বাজারে শত শত কোটি ডলার লোকসান হয়েই চলেছে। বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে রুট পরিবর্তন আর জ্বালানি সারচার্জের কারণে খরচ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছে।
২০২৬ সালের এই সংকট সাফ জানিয়ে দিচ্ছে যে, পৃথিবী আজ একটা সুতোয় বাঁধা। ইরানের একটা গ্রিড ধসে পড়লে ইরাক অন্ধকারে ডুবে যায়, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে আমেরিকার পাম্পে তেলের দাম বাড়ে, আর সারের অভাবে ভারত বাংলাদেশের কৃষকের থালা আরও দামি হয়ে ওঠে। ট্রাম্পের ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম এক চরম উস্কানি যা হয়তো ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনবে, অথবা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক আগুনের কুণ্ডলীতে ফেলবে যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ থাকবে না। যদি ২৩ মার্চ ২০২৬ সোমবার সন্ধ্যা ৭:৪৪ মিনিটে ট্রাম্প তার হুমকি কার্যকর করেন, তাহলে হয়তো আমরা একবিংশ শতাব্দীর প্রথম প্রকৃত বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষী হব। কিন্তু এসব লেখার মধ্যেই ট্রাম্প সাহেবের টুইট চলে এল, যেখানে তিনি বলেছেন যে, ইরানের সঙ্গে নাকি গত দু’দিন ধরে আলোচনা চলছিল, তাই ইরানকে আরও ৫ দিন সময় দেওয়া হয়েছে, এই সময় তিনি নিলেন কি আরও গিছিয়ে আক্রমণ করা জন্য, নাকি এটা সেই গ্লোরিয়াস রিট্রিট, মানে মানে পিছু হটা, তা বুঝতে আমাদের আরও পাঁচদিন অপেক্ষা করতে হবে।
দেখুন আরও খবর:








