কলকাতা: রবীন্দ্রনাথের গানের(Rabindra Sangeet) অতলস্পর্শী দার্শনিক বোধের উৎস সন্ধানে ভারতীয় জাদুঘরে (Indian Museum)আয়োজিত হলো এক বিশেষ সঙ্গীতানুষ্ঠান—‘টেগোরস জার্নি উইথ দ্য উপনিষদ’(Tagore’s journey with Upanishads)। সম্প্রতি আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের মাধ্যমে উপনিষদের(Upanishads) প্রভাব ও ঈশ্বরচেতনার এক মরমী রূপ ফুটিয়ে তুললেন বিশিষ্ট শিল্পী ডাঃ আনন্দ গুপ্ত(Dr. Ananda Gupta)। দক্ষিণায়ণ ইউকে’র এই পরিবেশনা যেন একাধারে আধ্যাত্মিক আর নান্দনিক ভ্রমণের হাতছানি হয়ে ধরা দিল কলকাতার সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে।
উপনিষদের একেশ্বরবাদ এবং নিরাকার ঈশ্বরের সাধনা রবীন্দ্রনাথের গানের মূল ভিত্তি। রাজা রামমোহন রায়ের ব্রহ্মধর্মের দর্শন কীভাবে গুরুদেবকে প্রভাবিত করেছিল, তাঁর ব্রহ্মসঙ্গীত ও গীতাঞ্জলির কবিতাগুলো তারই সাক্ষ্য বহন করে। অনুষ্ঠানে সেই দর্শনেরই প্রতিফলন ঘটল। শিল্পী ডাঃ আনন্দ গুপ্ত দীর্ঘ সময় বিদেশে থেকেও রবীন্দ্রচর্চার যে ধারা বহমান রেখেছেন, তা এদিন আরও একবার স্পষ্ট হলো। ২০০২ সালে লন্ডনের মাটিতে ‘দক্ষিণায়ণ ইউকে’ প্রতিষ্ঠা করে সুদূর প্রবাসে বাংলার সংস্কৃতিকে তিনি যেভাবে রোপণ করেছেন, তার নেপথ্যে রয়েছে শৈলজানন্দ মজুমদার, মায়া সেন ও সুদেব গুহ ঠাকুরের মতো দিকপালদের তালিম।
এদিনের অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের পূজা পর্যায়ের বেশ কিছু নির্বাচিত গান পরিবেশন করা হয়, যা একসময় ব্রাহ্মসমাজের উপাসনায় গাওয়া হতো। রাজা রামমোহন রায়ের জন্মবার্ষিকীর রেশ কাটতে না কাটতেই আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটির তাৎপর্য ছিল গভীর। ডাঃ আনন্দ গুপ্তের কণ্ঠে ‘চিরসখা ছেড়ো না’, ‘তোমার অসীমে’, ‘শৃণ্বন্ত বিশ্বে’—প্রতিটি গানই যেন শ্রোতাদের এক অন্য লোকে নিয়ে গেল।
প্রযোজনাটির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে ডাঃ আনন্দ গুপ্ত বলেন, “রবীন্দ্রনাথের গানের দার্শনিক, আধ্যাত্মিক ও কাব্যিক ধারার যে মেলবন্ধন, তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। প্রথাগত অনুষ্ঠানের বাইরে গিয়ে একটু আলাদা বিষয়ের ওপর আলোকপাত করতে আমরা বরাবরই আগ্রহী।”
অনুষ্ঠানের মিষ্টতা ও গাম্ভীর্য পূর্ণতা পায় দীক্ষা মঞ্জুরির শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনায়। ‘চিরসখা ছেড়ো না’ গানে রঘুনাথ দাসের নৃত্যশৈলী দর্শকদের মুগ্ধ করে। এ ছাড়াও রণিত কুড়ি, সৌগত শঙ্খ বণিক ও শ্রীধারা গুপ্তের কণ্ঠে গানগুলো ছিল শ্রুতিমধুর। পুরো অনুষ্ঠানের সঙ্গীত আয়োজনে ছিলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়। তালবাদ্যে বিপ্লব মন্ডলের নিপুণ সঙ্গত ও ডোনা গাঙ্গুলি ও রঘুনাথ দাসের নৃত্য পরিচালনা অনুষ্ঠানের আবহকে করে তুলেছিল প্রাণবন্ত।
ভারতীয় জাদুঘরের মতো এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রচর্চার এই নিরন্তর প্রয়াস নতুন প্রজন্মের শিল্পী ও শ্রোতাদের যে নতুন করে ভাবাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রদর্শনের অমোঘ সত্য—‘যিনি জলে, স্থলে, শূন্যে সমানভাবে বিরাজমান’—যেন এদিনের গানের সুরে মূর্ত হয়ে উঠেছিল। এক অনন্য সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান আর গবেষণাধর্মী এই অনুষ্ঠানের সাক্ষী থাকলেন কলকাতার সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ।
উপনিষদের আলোকে রবীন্দ্রসঙ্গীত: ভারতীয় জাদুঘরে এক অনন্য সঙ্গীত-সন্ধ্যা
নিরাকার ঈশ্বরের সাধনা রবীন্দ্রনাথের গানের মূল ভিত্তি







