ওয়েব ডেস্ক : ভারতের মানচিত্রে (Indian Map) এমন কিছু জায়গা রয়েছে, যেগুলির গুরুত্ব শুধুমাত্র আয়তন বা জনবসতির নিরিখে বিচার করা যায় না। শিলিগুড়ি (Siliguri) করিডর, যা ‘চিকেনস নেক’ (Chickens Neck) নামে পরিচিত, তেমনই একটি ভূখণ্ড। দেশের মূল অংশের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান সেতু এই সরু করিডর। স্বাধীনতার ৭৯ বছর পরেও তাই এর গুরুত্ব কমেনি। বরং বদলে যাওয়া আঞ্চলিক রাজনীতি, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তার সমীকরণে শিলিগুড়ি করিডর আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভৌগোলিক অবস্থানই এই করিডরের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং একইসঙ্গে সবচেয়ে বড় সংবেদনশীলতা। দক্ষিণে বাংলাদেশ, পশ্চিমে নেপাল এবং উত্তরে সিকিম ও চিন সীমান্তবর্তী এলাকা। মাত্র একটি সরু ভূখণ্ডের উপর দিয়েই দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে সড়ক ও রেলপথে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পৌঁছতে হয়। ফলে এই যোগাযোগ ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী কোনও সমস্যা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধুমাত্র উত্তরবঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকবে না, পড়বে উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনীতি, জনজীবন এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপরও।
অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় সেনা আধিকারিক কর্নেল রাকেশ বালির মতে, শিলিগুড়ি করিডরের (Siliguri Corridor) গুরুত্ব বুঝতে হলে শুধুমাত্র করিডরটির আয়তন বা অবস্থান দেখলে হবে না। এর চারপাশের দেশ ও সীমান্তগুলির পারস্পরিক সম্পর্কও একইসঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হবে। বাংলাদেশ, নেপাল, সিকিম এবং চিন সীমান্ত—এই চারটি ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার সংযোগস্থলের কাছেই রয়েছে এই করিডর। তাই সামান্য কোনও আঞ্চলিক পরিবর্তনও এই এলাকার কৌশলগত গুরুত্বকে প্রভাবিত করতে পারে।
শান্তিকালেও শিলিগুড়ি করিডরের (Siliguri Corridor) ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্য, জ্বালানি এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী সড়ক ও রেলপথে উত্তর-পূর্ব ভারতে পৌঁছয় এই পথ দিয়ে। পাশাপাশি পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতেও এই করিডরের গুরুত্ব রয়েছে। ফলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এটি শুধু একটি রাস্তা নয়, উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ।
আরও খবর : বিধবা ভাতা পেলে অন্নপূর্ণা যোজনার ৩ হাজার টাকা কি পাবেন? কী জানাল সরকার
তবে কৌশলগত গুরুত্বের জায়গা থেকেই নিরাপত্তার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়। একদিকে চিন সীমান্ত, অন্যদিকে নেপাল ও বাংলাদেশ—তিনটি আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান করায় এই অঞ্চলকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হিমালয় সংলগ্ন সীমান্তে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে তার প্রভাব শিলিগুড়ি করিডরের উপর পড়তে পারে। দেশের সেনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য উত্তর-পূর্বে দ্রুত পৌঁছনোর ক্ষেত্রেও এই করিডরের ভূমিকা রয়েছে।
গত কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতেও বদল এসেছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, প্রতিবেশী দেশগুলির পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বিভিন্ন দেশের কৌশলগত আগ্রহ—সব মিলিয়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা সমীকরণ নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফলে শিলিগুড়ি করিডরকে এখন শুধু উত্তরবঙ্গের একটি যোগাযোগপথ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বৃহত্তর নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবেই এর গুরুত্ব বিচার করা হচ্ছে।
নেপালের ক্ষেত্রেও একইভাবে সীমান্তবর্তী এলাকার পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে নেপালের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও সীমান্ত এলাকার যে কোনও বড় পরিবর্তন বা নতুন পরিকাঠামোগত বিকাশ ভবিষ্যতে করিডরের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান করায় সীমান্ত বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং নিরাপত্তা—তিনটি বিষয়ই শিলিগুড়ির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
এই কারণেই শুধু মূল করিডরের (Siliguri Corridor) নিরাপত্তা বাড়ানো নয়, বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থার উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বড় দুর্ঘটনা বা পরিকাঠামোগত সমস্যায় প্রধান সড়ক বা রেলপথ বন্ধ হয়ে গেলে যাতে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন না হয়, সেই জন্য বিকল্প রুট ও পরিকাঠামো তৈরি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগের যত বেশি বিকল্প থাকবে, একটি নির্দিষ্ট করিডরের উপর নির্ভরতা ততটাই কমবে।
কর্নেল রাকেশ বালির বক্তব্য, সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা চলছে। তাঁর মতে, শুধু সেনা মোতায়েন বা নিরাপত্তা বাড়ালেই হবে না। করিডরকে সচল রাখতে সড়ক, রেল এবং অন্যান্য যোগাযোগ পরিকাঠামোকেও শক্তিশালী করতে হবে। কারণ নিরাপত্তা এবং যোগাযোগ—দুটি বিষয় এখানে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
অবশ্য শিলিগুড়ির গুরুত্ব শুধু জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেই নয়। উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় শহর হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং পর্যটনের ক্ষেত্রেও শিলিগুড়ির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড় ও সমতলের সংযোগস্থলে থাকা এই শহরই একদিকে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার, অন্যদিকে নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ এবং সিকিমের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
স্বাধীনতার ৭৯ বছরে ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থা আমূল বদলেছে। নতুন সড়ক, রেলপথ, সেতু এবং বিকল্প রুট তৈরি হয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতেও পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু এত পরিবর্তনের পরেও দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থল যোগাযোগে শিলিগুড়ি করিডরের কেন্দ্রীয় ভূমিকা অটুট রয়েছে। বরং প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে বদলে যাওয়া সম্পর্ক এবং সীমান্ত পরিস্থিতির কারণে এর গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।
তাই ‘চিকেনস নেক’ নামটি শুধু একটি সরু ভূখণ্ডের পরিচয় নয়। এটি ভারতের মানচিত্রে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল, যার সঙ্গে একসঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে যোগাযোগ, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তা। স্বাধীনতার এত বছর পরেও সেই কারণেই শিলিগুড়ি করিডর ভারতের ভূ-কৌশলগত মানচিত্রে এতটা গুরুত্বপূর্ণ।







