Sunday, February 8, 2026
HomeScrollFourth Pillar | মহম্মদ ইউনুস সাহেব, আপনে ডাহা ফেল করছেন
Fourth Pillar

Fourth Pillar | মহম্মদ ইউনুস সাহেব, আপনে ডাহা ফেল করছেন

বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের চোখে ছিল এক নতুন ও সুন্দর আগামীর স্বপ্ন

২০২৪ সালের আগস্ট মাসে যখন ছাত্র-জনতার উত্তাল গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছিল, তখন বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের চোখে ছিল এক নতুন ও সুন্দর আগামীর স্বপ্ন। দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে ছাত্র-যুব সমাজ যে বিপ্লব এনেছিল, যে অভ্যুথ্বানের জন্য জান বাজী রেখে রাস্তায় নেমেছিল, তার মূল লক্ষ্যই ছিল রাষ্ট্রে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং এক বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়া। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের এই সময়ে এসে পেছনের দিকে তাকালে বুক ফেটে দীর্ঘশ্বাস আসে। যে আশা নিয়ে ডক্টর মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তৈরি হয়েছিল, সেই সরকার আজ দেশ পরিচালনায় এক চরম ব্যর্থতার প্রতিমূর্তিতে পরিণত হয়েছে। আজ বাংলাদেশের দিকে তাকালে যে শব্দটা সবার আগে মাথায় আসে, তা হলো ‘অরাজকতা’। তথাকথিত এই সংস্কারপন্থী সরকার না পেরেছে দেশের অর্থনীতিকে সঠিক পথে আনতে, না পেরেছে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে । চারদিকে শুধু মবোক্রাসি বা ভিড়তন্ত্রের রাজত্ব। আজ মনে হচ্ছে, হাসিনার আমলের স্বৈরাচারকেও হার মানিয়েছে আজকের এই উশৃঙ্খল জনতা আর তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা একটা ক্ষমতাহীন সরকার । একটা বিপ্লব তখনই সার্থক হয় যখন তার পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এক টেকসই পরিবর্তন আসে। কিন্তু বাংলাদেশে যা ঘটছে তাকে কোনোভাবেই পরিবর্তন বলা যায় না, বরং এটা একটা সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার সম্পূর্ণ উবে যাওয়া বললেও কম বলা হয়। ২০২৪ সালের জুলাই চার্টারের মাধ্যমে যে নতুন পথের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, তা আজ ধূসর মরুভূমিতে কোথায় হারিয়ে গেছে, কেউ জানেই না । এক অনির্বাচিত ও মনোনীত সরকার যখন রাষ্ট্রের শাসনভার গ্রহণ করে, তখন তাদের প্রথম দায়িত্ব থাকে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যত তারাতাড়ি সম্ভব এক নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে বিদেয় নেওয়া। কিন্তু ইউনুস সাহেবের এই সরকার শুরু থেকেই রাজপথের উশৃঙ্খল গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনী ও প্রশাসন যেন আজ অকেজো। যেকোনো তুচ্ছ ঘটনায় আজ একদল মানুষ বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। একেই বলে মবোক্রাসি বা ভিড়তন্ত্র, যেখানে আইনের শাসন নয়, বরং গলার জোর আর লাঠিসোটার জোরই শেষ কথা । আর সেই ভিড়তন্ত্রের সবচেয়ে বড় বলি হচ্ছেন দেশের সাধারণ মানুষ ও ছাত্র নেতারা নিজেই। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদি, যিনি ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন, তাকে যেভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হলো, তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে । ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তাকে ঢাকার বিজয়গনর এলাকায় গুলি করা হয় এবং দীর্ঘ কয়েকদিন যন্ত্রণার পর সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে তিনি মারা যান । এই হত্যার পর খুনিরা যেভাবে উধাও হয়ে গেল এবং রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যেভাবে নাকে তেল দিয়ে ঘুমালো, তাতেই বোঝা যায় প্রশাসনের চাকা কতটা জং ধরেছে । হাদির মতো একজন পরিচিত মুখ যদি নিরাপদ না থাকেন, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? সরকার বলছে খুনিরা আওয়ামী লীগের সাথে যুক্ত, কেউ বলছে তারা ভারতে পালিয়েছে—কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না ।

শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তাকে কোনোভাবেই এক সভ্য দেশের চিত্র বলা যায় না। হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সারা দেশে এক ভয়ংকর সহিংসতার দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে । ১৮ থেকে ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত চলা এই সহিংসতায় টার্গেট করা হয়েছে সংবাদমাধ্যম, উদিচী, ছায়ানটের মত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িঘর । দেশ কোন জায়গাতে গেলে লালনের ওপরে ছুরি চালানো হয়? হারমোনিয়াম আছড়ে ভেঙে ফেলা হয়? দেশের সবচেয়ে নামী দুটো সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’ এবং ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর অফিসে উন্মত্ত জনতা যেভাবে হামলা চালালো এবং অগ্নিসংযোগ করলো, তা কেবল অরাজকতাই নয়, বরং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর এক নগ্ন হামলা । সাংবাদিকরা প্রাণ বাঁচাতে অফিসের ছাদে গিয়ে আশ্রয় নিলেন, আর নিচে তখন তথাকথিত বিপ্লবীরা আগুন জ্বালিয়ে উল্লাস করছে। এই পুরো সময়টায় সরকার কী করছিল? ডক্টর ইউনুস টেলিভিশনে ভাষণ দিয়ে শোক প্রকাশ করলেন এবং হাদিকে ‘শহীদ’ উপাধি দিলেন, কিন্তু রাজপথের এই খুনি জনতাকে থামানোর কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিলেন না । যখন সংবাদপত্রের অফিসে আগুন লাগে, তখন রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে ইউনুস সাহেবের দায়িত্ব ছিল সাথে সাথে সেখানে বাহিনী পাঠানো। কিন্তু দেখা গেছে, পুলিশ ও সেনাবাহিনী সেখানে পৌঁছাতে অনেক দেরি করেছে, যার ফলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে । এই অদক্ষতাই প্রমাণ করে যে ইউনুস সাহেব ও তার উপদেষ্টারা গদিতে বসে বড় বড় কথা বলতে পারলেও মাঠপর্যায়ে তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তারা আজ শুধু মনোনীত সরকার নয়, তারা আজ এক ব্যর্থ সরকার। সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার প্রশ্নে এই সরকার যেন আরও বেশি অন্ধ। ময়মনসিংহে দিপু চন্দ্র দাস নামের এক হিন্দু যুবককে যেভাবে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হলো, তা যেকোনো মানুষের বিবেককে নাড়া দেবে । তাকে কারখানা থেকে বের করে উন্মত্ত জনতা পুলিশের চোখের সামনেই মারধর করে এবং পরে তার মৃতদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেয় । পুলিশ বলছে, রাস্তায় জটলা আর যানজটের কারণে তারা সময়মতো পৌঁছাতে পারেনি। এটা যে কতটা খোঁড়া যুক্তি, তা ছোট শিশুও বোঝে। ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে যদি কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে এবং তার মাঝে একজন নিরপরাধ মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয়, তবে সেই পুলিশ প্রশাসনের দরকার কী? এই মব জাস্টিস বা গণপিটুনির সংস্কৃতি বাংলাদেশে ২০২৪ এর বিপ্লবের পর এক মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে । আজ যেকোনো জায়গায় যেকোনো ব্যক্তিকে স্রেফ সন্দেহের বশে বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে ‘ফ্যাসিস্ট’ বা ‘ধর্মদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। চট্টগ্রামের হাজারী লেনে সহিংসতা বা বিভিন্ন ক্যাম্পাসে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে । ইউনুস সাহেব আন্তর্জাতিকভাবে মানবাধিকারের ফেরিওয়ালা হিসেবে পরিচিত হতে চাইলেও নিজ দেশের মানুষের মানবাধিকার রক্ষায় তিনি ডাহা ফেল করেছেন। তার শাসনামলে আজ আইনের শাসনের বদলে ‘রাস্তার বিচার’ কায়েম হয়েছে।

আরও পড়ুন:Fourth Pillar | ২০২৬-এ মতুয়া অঞ্চলে বিজেপি গোহারান হারবে

রাজনৈতিক সহিংসতার নতুন মাত্রা: সাত বছরের শিশুর মৃত্যু। আজকের বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা কেবল দলগত রেষারেষিতে সীমাবদ্ধ নেই, লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের বাড়িতে যেভাবে অগ্নিসংযোগ করা হলো, তা শুনলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায় । হামলাকারীরা বাইরে থেকে দরজা তালাবদ্ধ করে দিয়ে ঘরে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। সেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বেলালের সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে আয়েশা আক্তার । আয়েশার মতো এক নিষ্পাপ শিশু কেন এই রাজনৈতিক দহনের শিকার হবে? তার কান্নায় কি ইউনুস সাহেবের সিংহাসন কাঁপছে না? এই হামলাটি এমন এক সময়ে ঘটলো যখন সারা দেশে হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলছে, বিএনপি নেতা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একে একটা কাপুরুষোচিত সন্ত্রাসী হামলা বলে বর্ণনা করেছেন, নিন্দা করছেন, করুন, কিন্তু শুধু নিন্দা জানানোই কি যথেষ্ট? যখন বি এন পি নেতাদের বাড়ি আক্রান্ত হচ্ছে, যখন প্রকাশ্য দিবালোকে খুলনায় আরেক ছাত্রনেতা মোতালেব শিকদারকে মাথায় গুলি করা হচ্ছে, তখন বোঝা যায় যে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসলে কোনো দলকেই নিরাপত্তা দিতে পারছে না । মোতালেব শিকদার অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন ঠিকই, কিন্তু আততায়ীরা তো আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে । এই নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশে কোনো সুস্থ নির্বাচন হওয়া কি সম্ভব? নাকি এই পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে যাতে নির্বাচন না হয়? দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা ভেঙে পড়লে সরকার রাজনৈতিক নেতাদের ঢালাও ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক অদ্ভুত নীতি ঘোষণা করা হয়েছে যে, আসন্ন নির্বাচনের প্রার্থী এবং রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তার জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হবে । এটা কি কোনো রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে? একটা আধুনিক রাষ্ট্রের মূল কথা হলো রাষ্ট্রই হবে শক্তির একক উৎস। সেখানে ইউনুস সরকার বলছে, আপনারা নিজেরাই অস্ত্র কিনুন এবং নিজেদের নিরাপত্তা দিন । এর মানে হলো সরকার পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছে যে তারা পুলিশ দিয়ে জনগণের নিরাপত্তা দিতে অক্ষম। এরপরে সেই অস্ত্র দিয়ে এক গৃহযুদ্ধ শুরু হবে। নেতারা আজ ব্যক্তিগত অস্ত্রের জন্য আবেদন করছেন, কেউ কেউ দেহরক্ষী নিয়োগের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন । যদি প্রতিটা রাজনৈতিক নেতার হাতে অস্ত্র থাকে, তবে নির্বাচনী প্রচারের সময় কী ঘটবে, তা কল্পনা করলেও ভয় লাগে। এটা কি গণতন্ত্রের পথ নাকি গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার পথ? ইউনুস সাহেব এবং তার উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী হয়ত ভাবছেন এতে সহিংসতা কমবে, কিন্তু বাস্তবতা হলো এটা দেশকে এক সশস্ত্র সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যাবে । এই অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে যে ইউনুস সাহেব রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিগুলোই বুঝতে পারছেন না। ইউনুস সাহেব একজন বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ। তার কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশা ছিল তিনি অন্তত দেশের নড়বড়ে অর্থনীতিকে একটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাবেন। কিন্তু গত দেড় বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ আইসিইউ-তে চলে গেছে । জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ২.৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন । মূল্যস্ফীতি আজ আকাশচুম্বী, বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে । সাধারণ মানুষের পাতে আজ ভাত আর ডাল জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। সিন্ডিকেট ভাঙার গল্প শুনিয়ে সরকার ক্ষমতায় এলেও বাজারে সিন্ডিকেট আজও দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজত্ব করছে । পোশাক শিল্প বা আরএমজি সেক্টর, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড, তা আজ ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে । শ্রমিক অসন্তোষ, গ্যাস সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শত শত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং প্রায় দেড় থেকে দুই লক্ষ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন । বৈদেশিক বিনিয়োগ বা এফডিআই ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিনিয়োগকারীরা আজ বাংলাদেশে টাকা ঢালতে ভয় পাচ্ছেন। সরকার আইএমএফ আর বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কোনোমতে দিন পার করছে, কিন্তু দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি স্থবির হয়ে গেছে । ইউনুস সাহেবের মতো একজন মানুষ ক্ষমতায় থাকতেও কেন দেশের এই দশা, তা আজ বড় প্রশ্ন। আসলে গুটিকয়েক এনজিও ব্যক্তিত্ব দিয়ে আর একাডেমিক তাত্ত্বিক কথা দিয়ে যে একটা ১৬ কোটি মানুষের বিশাল দেশ চালানো যায় না, ডক্টর ইউনুস তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিও আজ এক গভীর সংকটে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে সম্পর্কের যে চরম অবনতি হয়েছে, তার মাসুল দিচ্ছে দু দেশেরই সাধারণ মানুষ । হাদি হত্যাকাণ্ডের পর ভারত-বিদ্বেষী স্লোগান আর ভারতীয় হাই কমিশনে হামলার চেষ্টার ফলে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে । ভারত তাদের ভিসা প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে, যার ফলে হাজার হাজার রোগী যারা চিকিৎসার জন্য ভারতে যেতেন, তারা আজ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে। ইউনুস সরকার ভারতের সাথে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্কের কথা বললেও কার্যত তারা ভারত-বিদ্বেষী গোষ্ঠীগুলোকে উস্কে দিয়ে এক সস্তা জনপ্রিয়তা খোঁজার চেষ্টা করছে । কূটনীতিতে যখন আবেগ আর ধর্ম ঢুকে পড়ে, তখন জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত হয়। আজ বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ভারতীয় পর্যটন ও চিকিৎসা সুবিধা বন্ধ হওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। কিন্তু ইউনুস সাহেব ও তার উপদেষ্টারা এই কূটনৈতিক সংকট সমাধানে কোনো দূরদর্শিতা দেখাতে পারছেন না । তারা কেবল একে অপরকে দোষারোপ করে দিন কাটাচ্ছেন। সবথেকে বড় কথা হল, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের কথা বলা হলেও দেশের যে বর্তমান পরিস্থিতি, তাতে এক অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া প্রায় অসম্ভব ।

সরকার যখন নিজ দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে পারে না, তখন তারা কীভাবে এক বিশাল জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করবে? হাদি হত্যাকাণ্ডের পর যেভাবে নির্বাচনী প্রচারণা ব্যাহত হয়েছে এবং যেভাবে প্রার্থীরা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাতে জনগণের মধ্যে এক বিশাল ভীতি তৈরি হয়েছে । এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৫০ শতাংশ ভোটার এখনও জানেন না তারা কাকে ভোট দেবেন বা আদৌ দেবেন কি না । তার মানে এতবড় এক অভ্যুথ্বানও কিন্তু মানুষের কাছে এক নিশ্চিত বিকল্প দাঁড় করাতে পারেনি। যদি এই সরকার এক সম্মানজনক নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে না পারে, তবে বাংলাদেশে আবার এক দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার নেমে আসার আশঙ্কা তো রয়েছেই। জুলাই বিপ্লবের পর ছাত্ররা চেয়েছিল এক ‘নতুন বাংলাদেশ’, কিন্তু ইউনুস সাহেব তাদের উপহার দিলেন এক ‘অনিশ্চিত বাংলাদেশ’ । সব শেষে এটাই বলতে হয় যে, বাংলাদেশের আজকের এই দুরাবস্থার দায় অনেকটাই ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুস এবং তার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের। হাসিনার আমলে মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারতো না, কিন্তু অন্তত রাস্তাঘাটে একটা শৃঙ্খলা ছিল, অর্থনীতি ধুঁকলেও পুরোপুরি মরে যায়নি। আজ মানুষ মুখ খুলতে পারছে ঠিকই, কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর শোনার মতো কেউ নেই। আজ মবোক্রাসি বা ভীড়তন্ত্রের লাঠির আঘাতে মানুষের মাথা ফাটছে, সংবাদপত্রের অফিসে আগুন জ্বলছে, আর নিষ্পাপ শিশুদের জীবন্ত পুড়ে মরতে হচ্ছে । ছায়ানট উদিচীর মত সংস্থাতে ভাঙচুর হচ্ছে, এক কালাপাহাড়ের সংস্কৃতিকে চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে, যেখানে বাঙালির রবীন্দ্র নজরুল ব্রাত্য। এক মনোনীত সরকার যখন জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের মতো ক্ষমতা ভোগ করতে চায় কিন্তু দায়িত্ব পালনে অপারগ হয়, তখন তাকে ‘ব্যর্থ’ বলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। ইউনুস সাহেব শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন, সারা বিশ্বে তার অনেক সম্মান, কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি নিজেকে প্রমাণ করতে পারেননি। তার শাসনামলে অরাজকতা আজ রাষ্ট্র সমাজের প্রতিটা স্তরে। অর্থনীতির পঙ্গু দশা, নিরাপত্তার অভাব এবং ভিড়তন্ত্রের রাজত্ব—সব মিলিয়ে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বাংলাদেশকে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়ার মিশনে ইউনুস সাহেব ডাহা ফেল করেছেন। সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে, আর যদি অচিরেই শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে না আসে, তবে এই ব্যর্থতার ইতিহাস তাঁকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না। জুলাইয়ের বিপ্লব যে সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখিয়েছিল, আজ সেই স্বপ্ন কেবল এক রক্তাক্ত দীর্ঘশ্বাস। হ্যাঁ ইউনুস সাহেব, লক্ষ কোটি মানুষের, আমাদেরও প্রার্থনা দোয়া থাকার পরেও আপনে ডাহা ফেল করছেন।

Read More

Latest News