সেই ছেলেবেলাতে মাস্টারমশাই পই পই করে শিখিয়েছিলেন ‘হাতেরটাকে রাখতে হলে ঝোপেরটার দিকে নজর দিস না, দুটোই উড়ে যেতে পারে’। ইংরিজি মাস্টারমশাই পড়াতেন, ‘A bird in the hand is worth two in the bush’। তো কাঁথির স্কুলে এই পাঠের সময়ে সম্ভবত অ্যাবসেন্ট ছিলেন কাঁথির মেজখোকা। তিনি হাতেরটাকে রেখে ঝোপের দিকে নজর দিয়েছিলেন। ২০২১-এর নির্বাচনে যে ক’টা আসন বিজেপি এক্কেবারে কান ঘেঁষে জিতেছে, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ওই নন্দীগ্রাম, মাত্র ১৯৫৬ ভোটে। এমনিতে জিতে গেলে কত ভোটে জিতেছে, সেটা ম্যাটার করে না, মুখ্যমন্ত্রীকে হারিয়ে শুভেন্দু হয়েছিলেন ‘জায়ান্ট কিলার’, আর সব্বাই মিলে গ্যাসবেলুন ফোলানোর মত ফুলিয়েছেন, ইনক্লুডিং শমীক ভট্টাচার্য, বিরোধী দলনেতার লড়া উচিত মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে, শোনা গেল প্রথমে নাম এসেছিল দিলীপ ঘোষের, তো তিনি মাছি তাড়ানোর মতোই হাত নেড়ে বলে দিয়েছেন, ‘ওসব কাঠিবাজি আর চলবে না, ন্যাড়া দু’বার বেলতলাতে যায় না’। কাজেই ঘুরিয়ে গদা পড়েছে শুভেন্দুর ঘাড়ে, কোনওরকমে আবেদন-নিবেদনের পরে নাকি তাঁকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে দু’টো আসনে লড়তে। হ্যাঁ, গোটা খেলাটার একটা এইরকম ন্যারেটিভ যে এবারে হারাব তৃণমূলকে, সেটা সেট করার জন্য ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারীর প্রার্থী হওয়াটা কাজের, কিন্তু এই মুহূর্তের বাস্তব পরিস্থিতি কিন্তু আলাদা কথা বলছে, আর সেটাই বিষয় আজকে, এই মুহূর্তে ভোট হলে শুভেন্দুর আম-ছালা দু’টোই যাবে।
নিজের ক্ষমতা আর মেধা, এই দু’টো নিয়ে মানুষের ওভার এস্টিমেশনের কোনও সীমা পরিসীমা নেই। বিশেষ করে সেই দেশে যে দেশে প্রধানমন্ত্রী দাড়ি বাড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ হবার চেষ্টা করেন। তো আমাদের কাঁথির মেজখোকার ইতিহাসটা খানিক সেই রকম। ধরুন ওনার পিতৃদেব, মানে বায়োলজিক্যাল বাবা, ভাই, সব্বাই তৃণমূল করতেন কেবল নয়, বিভিন্ন পদ, মন্ত্রীত্ব এসব পেয়েছেন, তারপর তাঁরা হঠাৎই বুঝেছেন যে, তাঁদের বঞ্চিত করা হয়েছে, মেজখোকা মনে করেছেন তিনিই তো মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন, কাজেই সেই লক্ষ্যে এগিয়েছেন, বিজেপিতে গিয়েছেন, লোকে বলে আলো নিভিয়ে, যদি সেই আলো নেভানোর কথাগুলো বাদও দিই তাহলেও তিনি সেই প্রবল হাওয়ায়, মানে তার আগের লোকসভায় ১৮টা আসন বিজেপির, দলে দলে তৃণমূল নেতা, টলিউডের ঝিঙ্কু মামণিরা যোগ দিচ্ছেন বিজেপিতে, ‘অব কি বার দোশ পার’ ইত্যাদি মুখে মুখে, সেই বাজারেও নিজের জমিতে উনি মমতা ব্যানার্জিকে হারিয়েছিলেন ১৯৫৬ ভোটে। আলো নেভানোর গল্প আমি জানি না, কিন্তু এক্কেবারে ঘনিষ্ঠ মহল থেকেই যে সাবোটাজ করা হয়েছিল, তা জানি। জানি শুভেন্দু কীভাবে সেখানে হিন্দু ভোটারদের মধ্যে এক ক্যাম্পেইন গড়ে তুলতে পেরেছিলেন।
আরও পড়ুন: Aajke | মুখোশ খুলে সামনে এলেন অভয়ার বাবা-মা
এবারে? সে ছবি নেই, উলটে তাঁর এক বাঁ-হাত প্রার্থী হলেন, প্রার্থী নাম ঘোষণার দিনে পবিত্র করজোড়ে ঝান্ডা নিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে। যদি মনে করে থাকেন যে, সেই সিদ্ধান্ত সেদিন কি তার ক’দিন আগে হয়েছিল, তাহলে ভুল করবেন, ইনফ্যাক্ট ২০২১-এর হারের পর থেকেই সেখানে খুব ভেবে চিন্তেই তৃণমূলের একটা টিম কাজ করেছে। এবারে এমন একজন দাঁড়ালেন, যাঁর জানা আছে সমস্ত ফাঁক ফোকর, তিনি জি জান লাগিয়ে দেবেন, দিচ্ছেন। কাজেই ১৯৫৬ ভোটের মার্জিন নিয়ে খানিক শঙ্কাই থাকা উচিত ছিল মেজখোকার, কিন্তু তাঁকে বার খাইয়ে পাঠানো হল বাঘ মারতে, মারলে বিজেপি ক্ষমতায়, না মারতে পারলে বাঘে খাবে নিশ্চিত। সেখানে ভোটের ব্যবধান যদি আমি বাই-ইলেকশনের কথা বাদও দিই, তাহলেও ২২ হাজারের মতো। সেই মার্জিন, প্রার্থী মমতা ব্যানার্জি, ভাঙতে পারবেন শুভেন্দু? আমাদের হিসেব বলছে, এই মুহুর্তে ভোট হলে সেটা এক্কেবারেই অসম্ভব। মানে কোনওভাবেই জিততে পারবেন না ভবানীপুর, অন্যদিকে নন্দীগ্রামে অবস্থা খারাপ বললে কম বলা হয়। মানে দু’দিকে লড়তে গিয়ে আম আর ছালা দুটো যাওয়ার অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছেন শুভেন্দু অধিকারী। আমরা আমাদের ভবানীপুর আর নন্দীগ্রামের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, দু’টো আসনে দাঁড়িয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী, দু’টো জায়গাতে দাঁড়িয়েছেন, ওনার জেতার সম্ভাবনা কতটা? শুনুন মানুষজন কী বলছেন?
শোনা গেল, মোদিজি তাঁর পদযাত্রা নাকি শেষ করবেন এই ভবানীপুরেই, স্বাভাবিক। প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি তো তিনি হবেন, কিন্তু সেই স্ট্রাটেজির টোপ হয়ে গিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। গতবারে একটা হাই-প্রোফাইল আসনের লড়াই শুভেন্দু লড়েছিলেন, এবারে দু’টো আসনেই দাঁতে দাঁত দিয়ে লড়তে হবে, একধারে মাত্র ১৯৫৬ মার্জিন যা তাঁকে বাড়াতে হবে; অন্যদিকে ২২ হাজারের মার্জিন, যা তাঁকে কমাতে হবে। দু’ধারেই হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু হল, এমনিতেই গত কয়েকমাস ধরে তিনি মেজাজ হারাচ্ছিলেন, এবার আমরা ঘনঘন সেই মেজাজ হারানোর ছবি দেখতে পাব, আম আর ছালা দু’টো হারানোর ভয় কার না থাকে!
দেখুন আরও খবর:








