একজন তো সেই কবেই জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘বাংলাদেশি ঘুসপেটিয়া দিমক কি তরহ খা রহে হ্যাঁয় হমারি অর্থনীতি’, ‘আমাদের অর্থনীতির ফসল খেয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশি উঁইপোকারা’। হ্যাঁ, অমিত শাহ ঠিক এই কথাই বলেছিলেন। সেই কথা তো রাজা বলেছেন, অতএব পারিষদের মুখে তা শতগুণ হবেই। তিনি এক্কেবারে গন্ধ বিচার করে জানিয়ে দিলেন,’ দেড় কোটি রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশি আছে, এসআইআর করলে সব হু হু করে বেরিয়ে আসবে, সোজা উপায়’। নেচে উঠলেন ভক্তরা, সেই ভক্তরা যাঁরা কদিন আগেও সিপিএম ছিলেন, বর্ডার পার করলে লোকাল কমিটির অফিসে নাম যেত, বিলি বন্দোবস্তের পরে তার রেশন কার্ডটা বানিয়ে দিতেন কমরেডরা, বেচারাদের মুখের ভাত যোগাড়ের বন্দোবস্ত। কেন আসত তাঁরা? (১) কিছু হিন্দু, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু, যাঁরা নিজেদের দুরক্ষিত মনে করতেন না। (২) কিছু মুসলমান মানুষজন, যাঁরা রাজনৈতিক কারণে নিজেদের সুরক্ষিত মনে করতেন না। ঠিক এই সময়ে যেমন আওয়ামি লিগের বেশ কিছু নেতা কর্মী এই বাংলাতে, ত্রিপুরাতে, দিল্লিতে লুকিয়ে আছেন, আওয়ামি লিগ ঘনিষ্ঠ দুই ব্যবসায়ী তো মুম্বাইতে আছেন বলে খবর। হ্যাঁ, বিভিন্ন রেজিমে এমনকি মুসলমান নিপীড়িতরাও সীমান্ত পার করে এদেশে এসেছেন। (৩) গরীব মানুষজন রোজগারের জন্য এসেছেন। এবার আমাদের ‘ছোটা মোটা ভাই’-এর মনে হয়েছে, আমাদের দেশের অর্থনীতির খারাপ অবস্থা তো এই বাংলাদেশি ঘুসপেটিয়াদের জন্য, তাদের ধরতে পারলেই অর্থনীতি বুলেট ট্রেনের গতিতে চলবে। ব্যস, ‘ঘুসপেটিয়া হাটাও’, সানাইয়ের পোঁ ধরার মতো শুভেন্দু অ্যান্ড কোম্পানি আরও জোরে চিল্লিয়েছেন, ‘ঘুসপেটিয়া হাটাও’। এবার রাজা যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ। আমাদের ঠাকুর বলে গিয়েছেন। তো শুভেন্দু সংখ্যাও বলে দিয়েছেন দেড়, দু’কোটি বাংলাদেশি রোহিঙ্গা ঘুসপেটিয়াই কেবল নয়, তাঁরা আবার তৃণমূলের ভোটার, ‘কাজেই বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গা হাটাও, বাংলা বাঁচাও’। কিন্তু সেই ফানুস তো ফুউউউউউউউশ! সেটাই বিষয় আজকে, ও শুভেন্দুদা, আপনার রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশি গেল কোথায়?
মঙ্গলবার বাংলায় ‘সার’–এর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। তাতে বাদ পড়েছেন প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটার। কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, বাদ পড়াদের সিংহভাগই মৃত অথবা শিফ্টেড বা নিখোঁজ। মারা গিয়েছেন ২৪ লক্ষ, অনুপস্থিত ১২ লক্ষ, ঠিকানা বদল ১৯ লক্ষ, ডুপ্লিকেট ভোটার ১ লক্ষ ৩৮ হাজার, অন্যান্য কারণে ৫৭ হাজার ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। এবার যদি ওই পুরো অনুপস্থিত সংখ্যাটাকেও ওই রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি বলে ধরে নিই, তাহলেও সংখ্যাটা ওই চিল্লানেসরাসের দাবি অনুযায়ী, দেড়, দু’কোটির ধারে কাছেও নয়। এরপরে নাকি নন-ম্যাপড ভোটার আছেন ৩০ লক্ষ, মানে যাঁদের বাবা-মা’র বা নিজের নাম ২০০২-এর তালিকাতে ছিল না। কিন্তু সেখানে তো আরও কেলো, সে তালিকাতে ৮০ শতাংশ নাম বিহারী, মতুয়া, রাজবংশী হিন্দুদের। গেল কোথায় সেই বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গারা? প্রেস্টিজে গ্যামাক্সিন! কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ। মানে এক্কেবারে আর কিছু করার না থাকলে রাজনৈতিক নেতারা তখন আরেকটা অন্য, এক্কেবারে নতুন ন্যারেটিভ নিয়ে মাঠে নামেন।
আরও পড়ুন: Aajke | রাজধর্ম পালন করলেন মমতা, মন্ত্রীত্ব ছাড়লেন অরূপ, শোকজ পুলিশ কর্তাদের
নির্বাচনের ফলাফল বেরোবার দিন দেখবেন, সকালে ২০০টা আসনের কমে কোনও কথাই নেই, তারপর বেলা বাড়তেই বক্তব্য হল, এই তো সবে গণনা শুরু হয়েছে, দাঁড়ান, শেষ বেলায় কাৎ করে শুইয়ে দেব। তারপর এক্কেবারে ৭৭-এ এসে ঠেকার পরে ন্যারেটিভ হল, জাল ভোট, ঘুসপেটিয়ার ভোট, রোহিঙ্গাদের ভোট। মাত্র ৫ বছর আগে যখন এই কাঁথির মেজ খোকা চেল্লাচ্ছিলেন, ‘অব কি বার ২০০ পার’। তখন এই রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশিরা ছিল না? এই পাঁচ বছরে কার ব্যবস্থাপনায় তারা ঢুকল? ২০২৪-এ স্লোগান মিনিমাম ৩৬টা আসন, ১৮ থেকে কমে ১২। তখন এই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশিরা ছিল না? কাদের ভরসাতে ২০০ পার, ৩৬ পারের বাওয়াল দিচ্ছিলেন খোকাবাবু? এখন বলছেন, দাঁড়াও না এখনও তো সার শেষ হয়নি, শেষ হলে দেখবে ওই দেড় কোটি রোহিঙ্গা সাফাই হয়ে গিয়েছে। অজ মানে ছাগল ভক্তরা সেই কথা বিশ্বাস করছেন। কিন্তু লিখে রাখুন, মিলিয়ে নেবেন, বাদ পড়ার সংখ্যাটা ৪০ লাখে এসে দাঁড়াবে। তখন শান্তিকুঞ্জের খোকা শুভেন্দু, এক বিখ্যাত রাজনৈতিক বিজ্ঞের মতো চিৎকার করবেন, এটা এসআইআর হয়েছে না আমার মাথা? আমরা অপেক্ষাতে রইলাম। আমরা আমাদের দর্শকদের কাছে প্রশ্ন করেছিলাম, গলা ফাটিয়ে চিল্লিয়ে আমাদের শান্তিকুঞ্জের মেজখোকা বলেছিলেন দেড়, দু’কোটি রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের কথা, রিপোর্ট হাতে আসার পরে এখন দেখা যাচ্ছে যে, সে সবের চিহ্নও নেই, এখন তাঁকে কোথাও রাস্তায় ঘাটে দেখতে পেলে মানুষের কী জিজ্ঞেস করা উচিত যে, ও শুভেন্দুদা বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গারা গেল কোথায়?
বিজেপির এই রাজ্যে ক্ষমতা দখলের সমস্যাটা কোথায়? (১) তাঁরা লড়াইটা শুরুই করছেন ৭০ মার্কসের জন্য, ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট তো তাঁদের জুটবেই না। অন্যদিকে তৃণমূল মাঠে নামছে প্লাস থার্টি নিয়ে। (২) ওনাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা। আমি দেখেছি আপনারাও দেখে নিতে পারেন ৭০ শতাংশ বুথে বিজেপির বিএলএ নেই। সিপিএম-এর আছে, বিজেপির নেই! আর বাংলাতে নির্বাচনটা সংগঠন নির্ভর, কেবল গলা ফাটালেই হবে না, মাটিতেও দখল চাই। (৩) বাঙালি বিরোধিতা বিজেপির এমন এক ছবি তৈরি করেছে, যা বাংলাতে বিজেপিকে এমনিতেই পিছিয়ে রাখে। (৪) এ রাজ্যে বিজেপি বাঙালি মধ্যবিত্ত ইনটেলেকচুয়াল, কবি সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কোথাও নেই। হ্যাঁ, এই চারটে কারণেই বিজেপি হারছে, হারবে, এসআইআর করে কোনও লাভ হবে না।








