Sunday, February 8, 2026
HomeScrollAajke | রাজধর্ম পালন করলেন মমতা, মন্ত্রীত্ব ছাড়লেন অরূপ, শোকজ পুলিশ কর্তাদের
Aajke

Aajke | রাজধর্ম পালন করলেন মমতা, মন্ত্রীত্ব ছাড়লেন অরূপ, শোকজ পুলিশ কর্তাদের

যুবভারতী কাণ্ডের ৭২ ঘন্টার মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা দেখিয়ে দিলেন, তাঁর সরকার ‘সক্রিয়’

Written By
অনিকেত চট্টোপাধ্যায়

শনিবার দুপুরে লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল যুবভারতী। তার ৭২ ঘণ্টার মাথায় মঙ্গলবার সরকার এবং পুলিশ প্রশাসনে কার্যত ঝড় বইয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার সকাল থেকে একগুচ্ছ উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে নানান ব্যবস্থা নেওয়া হল, ক্রীড়ামন্ত্রকের থেকে অব্যাহতি দেওয়া হল মুখ্যমন্ত্রীর প্রায় বাঁ হাত অরূপ বিশ্বাসকে। ঘটনা চূড়ান্ত লজ্জার, চূড়ান্ত অপদার্থ ব্যবস্থাপনার। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে, একজনের আহত হওয়ার ঘটনাও সামনে আসেনি। ঘটনার পরেই মূল অভিযুক্ত গ্রেফতার, আর এখন তো এক্কেবারে পুরোদস্তুর রাজ ধর্ম পালন। কাজেই যাঁদের আমলে ইডেনে ১৬ জনের প্রাণ গিয়েছিল, বা যাঁদের আমলে কুম্ভমেলায় ট্রাকে করে লাশ পাচারের অভিযোগ ছিল, সেই বিরোধীরা ব্যাকফুটে। ৭২ ঘন্টার মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা দেখিয়ে দিলেন, তাঁর সরকার ‘সক্রিয়’, যুবভারতী কাণ্ডকে ‘লঘু’ নজরে দেখছে না তাঁর সরকার এবং সরকার কাউকে আড়াল করারও চেষ্টা করছে না। সাধারণভাবে শাসকদল এসব ক্ষেত্রে ‘টাইম উইল হিল এভ্রিথিং’, আর সাত-দশ দিন পরে বিষয়টা এমনিতেই ধামাচাপা পড়ে যাবে, এমনটাই ভাবে, সেই পথেই চলে, কিন্তু মমতা ব্যতিক্রমী পথে হাঁটলেন। রাজ্যের ভাবমূর্তিকে ফেরাতে রাজ্যপুলিশের ডিজি থেকে ক্রীড়ামন্ত্রী— কাউকেই রেয়াত করা হয়নি। আবার একইসঙ্গে যুবভারতীর ঘটনায় গঠিত কমিটির ‘নিরপেক্ষতা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাইকোর্টে জোড়া জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই সেই মামলার শুনানি হবে। আদালতে হলফনামা দিয়ে সরকার বলবে, তারা ব্যবস্থা নিয়েছে, এনকোয়ারি কমিটিকে নিরপেক্ষ তদন্ত করার সুযোগ দিন। ফলে আদালত আলাদা তদন্ত কমিটি না গড়ে, তারও ব্যবস্থা করা হল। হ্যাঁ, এটাই রাজধর্ম। এটাই বিষয় আজকে, রাজধর্ম পালন করলেন মমতা। মন্ত্রীত্ব ছাড়লেন অরূপ, শোকজ পুলিশ কর্তাদের।

কিন্তু রাজ্য সরকারের এই এত্তগুলো পদক্ষেপের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে চমকে দেওয়ার মতো ঘটনা হল অরূপ বিশ্বাসের হাতে লেখা চিঠি দিয়ে ক্রীড়া দফতরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাওয়া। এবং মাথায় রাখুন তৃণমূলের এই ১৫ বছরের মেয়াদে মধ্যে অরূপ বিশ্বাসই হলেন এক এবং একমাত্র মন্ত্রী, যিনি কোনও কেলেঙ্কারির পর নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তাঁর সংশ্লিষ্ট দফতরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইলেন। সে চিঠিতে যতই বানান ভুল থাক না কেন, রাজনীতিতে এই বিবেচনাবোধ এই মুহুর্তে বিরল, আর সেটা থেকে যাবে। ২০ থেকে ৩০ থেকে ৫০ বছর পরেও রেফারেন্সে আসবে, কেবল হুজ্জুতি হয়েছিল, অব্যবস্থার দায় নিয়ে মন্ত্রক ছেড়েছিলেন এক মন্ত্রী। তার চেয়েও বড় কথা হল, এরপর থেকে কিছু ঘটলেই অরূপ কার্ড খেলতে হবে তৃণমূলকেও। ১৯৮০ সালের ১৬ অগাস্ট যখন ইডেনে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচে ১৬ জন দর্শক মারা গিয়েছিলেন, তখন জ্যোতি বসু ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্র এবং ক্রীড়া দফতরও ছিল তাঁরই হাতে। কিন্তু তিনি এভাবে তদন্ত চলাকালীন তাঁর দফতর থেকে অব্যাহতি নেননি। ১৯৯৬ সালে ক্রিকেট বিশ্বকাপে ইডেনে ভারত-শ্রীলঙ্কা সেমিফাইনাল ম্যাচ দর্শকের ক্ষোভে বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। তখন রাজ্যের স্বরাষ্ট্র এবং পুলিশমন্ত্রী ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। কিন্তু তিনিও দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেননি। উত্তরপ্রদেশে মহাকুম্ভের মহাবিপর্যয়ে কতজন মানুষ ঠিক মারা গিয়েছেন তাও জানা যায়নি, কিন্তু পদপিষ্ট হয়ে মানুষের মৃত্যুর ঘটনার পরে বিজেপি সরকার এরকম প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেয়নি। কোনও মন্ত্রী দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেননি। তৃণমূল বলতেই পারে, ‘‘ওরা করতে পারেনি। কিন্তু আমরা করে দেখিয়েছি! ওরা পারেনি। কিন্তু মমতা’দি রাজধর্ম পালন করেছেন।’’

আরও পড়ুন: Aajke| শপথ নিন, বাংলার একজন বৈধ ভোটারেরও নাম বা দিতে দেবো না

শনিবার যুবভারতী কেলেঙ্কারির দু-তিন ঘন্টার মধ্যে তার তদন্তের জন্য প্রাক্তন বিচারপতি অসীম কুমার রায়ের কমিটি গড়ে দিয়েছিলেন মমতা। সেই কমিটি কাজ শুরু করে দিয়েছে রবিবার থেকেই। প্রাক্তন বিচারপতি জানিয়ে দেন, কমিটি তাদের প্রাথমিক রিপোর্ট পেশ করেছে। কমিটি সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করার। তারই মধ্যে খবর এল রাজীব কুমার সমেত একগুচ্ছ আইপিএস অফিসারকে শোকজ করা হয়েছে। সত্যি বলতে কী, ইদানিংকালে রাজ্য, ইউনিয়ন গভর্নমেন্ট কোথাও কোনও ঘটনাতে এত তাড়াতাড়ি এরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস দেখাননি। অনেকে বলবেন যে, সামনে নির্বাচন তাই এত কড়া ব্যবস্থা নিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উল্টোদিকের যুক্তি হল, সামনে নির্বাচন তবুও মন্ত্রীসভার অন্যতম একজনকে দফতর থেকে অব্যাহতি দেওয়া বা পুলিশের সর্বোচ্চ মহলে কড়া মেসেজ পাঠানোটাও তো এক বিরাট ব্যাপার, সেটাতেও যথেষ্ট ঝুঁকি তো থেকেই যায়। আমরা আমাদের দর্শকদের প্রশ্ন করেছিলাম, মৃত্যু হয়নি, বিরাট ক্ষয়ক্ষতিও হয়নি, কিন্তু মেসি-কান্ডে মুখ পুড়েছে বাংলার। আর তার পরেই ক্রীড়ামন্ত্রীকে দফতর থেকে অব্যাহতি দিয়ে, সর্বোচ্চ পুলিশ কর্তাদের শোকজ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে দৃষ্টান্ত রাখলেন, তাকেই কি রাজধর্ম বলা হবে?

হ্যাঁ, এরপরেও সমাজ মাধ্যমে অরূপ বিশ্বাসের বানান ভুল নিয়ে খিল্লি চলবে, মিম তৈরি হবে, হাফ ইনটেলেকচুয়ালদের কে কত ব্যাঙ্গাত্মক হতে পারে, কে কত মমতা বিরোধী হতে পারে, তার প্রতিযোগিতা চলবে। আর সেসবের পরে আবার নির্বাচনে জিতে আসবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সম্ভবত আগের চেয়েও বেশি ভোটে। কেন? কারণ তিনি রজধর্ম পালন করেছেন, গরীবস্য গরীবদের সীমিত ক্ষমতার মধ্যেই অন্ন জুগিয়েছেন, আর সাহস করে রুখে দাঁড়িয়েছেন অরাজক অবস্থার বিরুদ্ধে।

দেখুন ভিডিও:

Read More

Latest News