Sunday, February 8, 2026
HomeScrollFourth Pillar | আবার খুন করা হল গান্ধিজীকে
Fourth Pillar

Fourth Pillar | আবার খুন করা হল গান্ধিজীকে

আদর্শগতভাবে মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা হল

একবিংশ শতাব্দীর ভারতে গ্রামীণ অর্থনীতির ইতিহাসে সবথেকে বড় এবং সফল সামাজিক সুরক্ষা কবচ হিসেবে যে প্রকল্পটার নাম উঠে আসে, তা হলো মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন বা মনরেগা। ২০০৫ সালে ভারতের সংসদে যখন এই আইনটা পাস হয়, তখন তা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় সরকার যে নতুন ‘বিকশিত ভারত গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন (গ্রামীণ)’ বা সংক্ষেপে ভি বি জি রাম জি বিল নিয়ে এল, তার লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে ভারতের অর্থনীতিবিদ, সমাজকর্মী এবং রাজনৈতিক মহলে এক প্রবল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন যে, এই নতুন প্রকল্পের নাম থেকে গান্ধীর নাম মুছে দেওয়া কেবল একটা রূপক পরিবর্তন নয়, বরং এটা সেই আদর্শ এবং অধিকারের ওপর এক চূড়ান্ত আঘাত যা গান্ধীজি আজীবন লালন করেছিলেন, তাঁর গ্রাম সুরাজের ধারণাকে তৈরি করেছিলেন। আসলে এই মনরেগা কে তুলে দিয়ে, কেবল নাম বদলে নয়, নতুন বিলে যেভাবে গ্রামীন জনগনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হল তা বলে দেয় আরও একবার প্রতীকীভাবে এবং আদর্শগতভাবে মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা হল । মনরেগা কোনও সাধারণ সরকারি অনুদান বা খয়রাতি প্রকল্প ছিল না। এটা ছিল এক আইনি অধিকার। সংবিধানের ৪১ নম্বর অনুচ্ছেদে লেখা কাজের অধিকারকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক সুসংহত চেষ্টা ছিল এই আইন। মানে সংবিধানে অনেক কিছু তো লেখা থাকে, তার বাস্তবায়ন হয় না, এটা ছিল তার এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। ২০০৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ডঃ মনমোহন সিং-এর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় এই বিলটা যখন পাস হয়, তখন তা ছিল দীর্ঘ ১৩ মাসের আলাপ-আলোচনা এবং জনমতের ফসল। এক প্রকল্প যা বিপদের দিনে গ্রামীণ পরিবারগুলোকে ১০০ দিনের নিশ্চিত কাজের আইনি গ্যারান্টি দিয়েছিল । গত দুই দশকে মনরেগা আক্ষরিক অর্থেই গ্রামীণ ভারতের চেহারা বদলে দিয়েছে। তথ্য বলছে যে, এই প্রকল্পের কর্মীদের অর্ধেকই হলেন মহিলা এবং প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি কর্মী তফসিলি জাতি ও জনজাতি সম্প্রদায়ের। আর একটা প্রকল্প দেখাতে পারবেন যা এই ব্যপক সংখ্যক মহিলা আর পিছিয়ে পড়া মানুষজনকে কিছুটা হলেও রিলিফ দিতে পেরেছে? গ্রামীণ মজুরি যে বেড়েছে, তাতে এই প্রকল্পের অবদান অনস্বীকার্য।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মনরেগা চালু হওয়ার পর থেকে গ্রামীণ মজুরি এক অভূতপূর্ব হারে বৃদ্ধি পেয়েছে যা ভূমিহীন কৃষকদের দরকষাকষির ক্ষমতা বার্গেনিং পাওয়ার অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। কেবল তাই নয়, গ্রাম থেকে কাজের সন্ধানে শহরে পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বা পরিযায়ী শ্রমিক হওয়ার কষ্ট থেকেও মনরেগা অনেক মানুষকে মুক্তি দিয়েছিল। বিশেষ করে অতিমারি করোনার সময় যখন গোটা দেশের অর্থনীতি থমকে গিয়েছিল, তখন মনরেগাই ছিল কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষের বাঁচার একমাত্র অবলম্বন । ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে হঠাৎ করেই সংসদীয় রীতিনীতিকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, বিরোধীদের সঙ্গে কোনও আলোচনা না করেই কেন্দ্রীয় সরকার মনরেগাকে বিলুপ্ত করে ভি বি জি রাম জি বিল পাস করল। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, এই নতুন প্রকল্প ভারতের ২০৪৭ সালের মধ্যে ‘বিকশিত ভারত’ হওয়ার স্বপ্নের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এখানে কাজের দিন ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১২৫ দিন করা হয়েছে। কিন্তু এই আপাত আকর্ষণীয় দাবির আড়ালে যে সত্য লুকিয়ে আছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এই নতুন আইনটা আসলে মনরেগার সেই ‘অধিকার-ভিত্তিক’ কাঠামোটাকেই শেকড় সমেত ধ্বংস করে দিয়েছে । মনরেগা ছিল একটা চাহিদা-ভিত্তিক (Demand-driven) প্রকল্প। অর্থাৎ গ্রামের মানুষ যখন কাজ চাইবেন, তখন সরকারকে কাজ দিতেই হবে। যদি ১৫ দিনের মধ্যে কাজ না দেওয়া যায়, তবে সরকারকে বেকারভাতা দিতে হতো। কিন্তু নতুন এই ভি বি জি রাম জি প্রকল্পে সেই আইনি বাধ্যবাধকতাকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এখন থেকে এটা একটা সরবরাহ-ভিত্তিক (Supply-driven) প্রকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে কেন্দ্র ঠিক করবে কোন রাজ্যে কত টাকা বরাদ্দ করা হবে এবং সেই বাজেটের বাইরে এক টাকাও সরকার খরচ করবে না। এর ফলে যদি ১০০ জন মানুষ কাজ চান এবং সরকারের কাছে কেবল ৫০ জনের বাজেট থাকে, তবে বাকি ৫০ জনকে কাজ দেওয়ার কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা সরকারের থাকবে না। এইভাবে এক আইনি স্বীকৃত অধিকারকে কায়দা করে এক সাধারণ সরকারি স্কিমে পরিণত করা হয়েছে । মনরেগার সাফল্যের অন্যতম স্তম্ভ ছিল এর আর্থিক কাঠামো। এতদিন পর্যন্ত অদক্ষ শ্রমিকের মজুরির ১০০ শতাংশ এবং ওই কাজের জন্য জরুরি যন্ত্রপাতি, অন্যান্য জিনিষপত্রের ৭৫ শতাংশ কেন্দ্রীয় সরকার বহন করত। ফলে রাজ্য সরকারগুলির ওপর কোনও বড় আর্থিক চাপ থাকত না। কিন্তু নতুন এই বিলে সেই অনুপাত আমূল বদলে দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে রাজ্য সরকারগুলোকে মোট ব্যয়ের ৪০ শতাংশ টাকা নিজেদের তহবিল থেকে জোগাড় করতে হবে, কেন্দ্র দেবে মাত্র ৬০ শতাংশ।

জঁ দ্রেজের মতো প্রখ্যাত অর্থনীতির্বিদদের মতে, জিএসটি ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর রাজ্যগুলির আর্থিক অবস্থা এমনিতেই খুব একটা ভালো নেই। এই অবস্থায় হঠাৎ করে এই বিরাট আর্থিক বোঝা রাজ্যগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার মানে এই প্রকল্পটাকে বাস্তবে অকেজো করে দেওয়া । এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। অনেক রাজ্যই তহবিলের অভাবে কাজ করাতেই পারবে না, বিশেষ করে গরিব রাজ্যগুলি যারা সবচেয়ে বেশি এই প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা চরম সংকটে পড়বে। এটা আসলে কেন্দ্র সরকারের দায় ঝেড়ে ফেলার এক চক্রান্ত। রাজ্যগুলি যদি তাদের ৪০ শতাংশ অংশিদারিত্ব দিতে না পারে, তবে কাজ বন্ধ হয়ে যাবে এবং কেন্দ্র খুব সহজেই রাজ্যগুলির ওপর দোষ চাপিয়ে দিতে পারবে। আমরা তো টাকা দিতে রাজিই আছি, এখন ওনারা যদি না কাজ করান আমরা কী করবো? এইভাবে এক জাতীয় গ্যারান্টিকে রাজনৈতিক দড়ি টানাটানির বিষয়ে পরিণত করা হল যা আমাদের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর এক বড় আঘাত । ভি বি জি রাম জি বিলের একটা সবথেকে বিপজ্জনক দিক হলো ‘সুইচ অফ ক্লজ’। এই ধারায় কেন্দ্রীয় সরকার বছরে ৬০ দিন পর্যন্ত এই প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখার ক্ষমতা পেয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো, চাষের মরসুমে যখন শ্রমিকের খুব প্রয়োজন হয়, তখন এই কাজ বন্ধ থাকলে কৃষিকাজে শ্রমিকের অভাব হবে না। মনরেগা আসার পর গ্রামীণ শ্রমিকদের হাতে বিকল্প কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, ফলে তারা কম মজুরিতে জোতদারদের অধীনে কাজ করতে বাধ্য হতো না। এই প্রকল্পের ফলে তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা বেড়েছিল এবং মজুরির হারও বৃদ্ধি পেয়েছিল। এবার তাদের সেই দরকষাকষির শক্তিটা কেড়ে নেওয়া হল। যদি সরকার চাষের সময় জোর করে কাজ বন্ধ করে দেয়, তবে ভূমিহীন কৃষকদের আবার সেই বড়লোকদের দয়ার ওপর নির্ভর করতে হবে। এটা আসলে শ্রমিকদের সেই পুরনো সামন্ততান্ত্রিক দাসত্বের দিকে ঠেলে দেওয়ার এক পরিকল্পনা। এর ফলে গ্রামীণ মজুরি কমে যাবে এবং শ্রমিকরা তাদের আত্মমর্যাদা হারাবে। যে মনরেগা শ্রমিকদের স্বাধীনতা দিয়েছিল, নতুন এই বিল সেই স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে তাদের আবার শোষণের মুখে ফেলে দিল । নতুন এই বিলে স্বচ্ছতার নাম করে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ড্যাশবোর্ড এবং জিপিএস ট্র্যাকিং দিয়ে কাজ তদারকি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু গ্রামীণ ভারতের বাস্তব চেহারাটা যারা জানেন, বোঝেন, তারা বুঝতে পারছেন যে এটা আসলে গরিব মানুষকে কাজ থেকে বঞ্চিত করার এক ডিজিটাল ষড়যন্ত্র। ইতিমধ্যেই আধার-ভিত্তিক পেমেন্ট এবং বায়োমেট্রিক হাজিরা দেওয়ার কড়াকড়ির কারণে কোটি কোটি শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন।

তথ্য বলছে যে, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে নভেম্বরের মধ্যেই প্রায় ২৭ লক্ষ কর্মীর নাম তালিকা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে কেবল এই ডিজিটাল জটজালের কারণে । যেখানে ভারতের অনেক গ্রামে এখনও ঠিকঠাক ইন্টারনেট পরিষেবা নেই, যেখানে অনেক শ্রমিকের স্মার্টফোন নেই বা তারা নিরক্ষর, সেখানে এই ধরণের জটিল প্রযুক্তি চাপিয়ে দেওয়ার মানে হলো তাদের প্রকল্প থেকে সরিয়ে দেওয়া। একজন বৃদ্ধা বা একজন আদিবাসী শ্রমিক নিজের অধিকারের টাকা পাওয়ার জন্য প্রযুক্তির গোলকধাঁধায় ঘুরে বেড়াবেন এবং শেষে ব্যর্থ হবেন, তখন তিনি বাধ্য হয়ে কাজ ছেড়ে দেবেন। এইভাবে ‘স্বচ্ছতা’র নামে আসলে ‘বর্জন’ করা হচ্ছে । মহাত্মা গান্ধীর ‘গ্রাম স্বরাজ’-এর স্বপ্ন ছিল গ্রাম হবে ভারতের প্রাণকেন্দ্র এবং ক্ষমতা থাকবে পঞ্চায়েতের হাতে। মনরেগা সেই আদর্শকেই বহন করত কারণ সেখানে গ্রাম সভা এবং গ্রাম পঞ্চায়েত ঠিক করত গ্রামে কী কাজ হবে। কিন্তু ভি বি জি রাম জি বিলের মূল দর্শনই হলো কেন্দ্রীয়করণ। এখন থেকে দিল্লির অফিস ঠিক করবে ভারতের কোন গ্রামে কী কাজ হবে এবং সেই কাজ আদৌ শুরু হবে কি না। পঞ্চায়েতগুলিকে এখন থেকে দিল্লির অনুমোদনের জন্য তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করতে হবে। এটা আসলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নয়, বরং ক্ষমতার চূড়ান্ত কেন্দ্রীয়করণ যা গান্ধীজির দর্শনের ঠিক উল্টো । মনরেগা কেবল একটি নাম ছিল না, এটি ছিল একটি দর্শন। মহাত্মা গান্ধীর নাম এই প্রকল্পের সঙ্গে জুড়ে থাকা মানে ছিল এই যে, সরকার দেশের দরিদ্রতম মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ। কিন্তু এখন সেই নাম সরিয়ে দেওয়ার অর্থ হলো সেই দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি পাওয়া। যে গান্ধীজি ‘ Hey Ram’ বলে প্রাণ দিয়েছিলেন, তাঁর নামে এতদিন চলতে থাকা প্রকল্পকে ‘রাম জি’ প্রকল্পের নাম দিয়ে আসলে তাঁর মূল আদর্শকেই হত্যা করা হলো বলে বিরোধীরা মনে করছেন । গান্ধীজি আজীবন অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে শোষিতের অধিকার রক্ষার কথা বলেছিলেন। আজ মনরেগাকে বাঁচানোর লড়াই আসলে গান্ধীজির সেই অসমাপ্ত লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। যদি আমরা আজ চুপ থাকি, তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। মনরেগার সফলতার ইতিহাসকে মুছে দেওয়ার এই অপপ্রয়াসকে রুখতে হলে দেশের প্রতিটা সচেতন মানুষকে সোচ্চার হতে হবে। কারণ আবার খুন করা হলো গান্ধিজীকে, কিন্তু তাঁর আদর্শকে কি সত্যিই মারা সম্ভব? না সে আদর্শ এক প্রবাহমান ধারা, তার গতিরোধ সম্ভব নয়।

Read More

Latest News