কলকাতা: পয়লা জুলাইয়ের সকাল মানেই এই তিলোত্তমার বুকে এক কিংবদন্তি চিকিৎসকের স্মৃতিচারণ। মহানগরের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা চিকিৎসক তথা পশ্চিমবঙ্গের রূপকার ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের জন্ম ও প্রয়াণ দিবস একই দিনে। আবার এই জুলাই মাসেই বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বণের তালিকায় কড়া নাড়ছে রথযাত্রা। এই দুই বিশেষ ঘটনার এক অভিনব মেলবন্ধনে এবার কলকাতার রাজপথ সাক্ষী থাকল এক সম্পূর্ণ অন্য ধারার উৎসবের। রাস্তায় নামল এক অনন্য রথ, যার নাম দেওয়া হয়েছে জীবন দেবতা রথ। সেরাম থ্যালাসেমিয়া প্রিভেনশন ফেডারেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচি কেবল উৎসবের আনন্দেই সীমাবদ্ধ রইল না, বরং তা হয়ে উঠল মানবসেবার এক জীবন্ত উদাহরণ। যে সেবার মন্ত্রে আজীবন দীক্ষিত ছিলেন স্বয়ং ডাক্তার রায়।
সাধারণত রথযাত্রার দিনে সুসজ্জিত রথে চেপে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা মাসির বাড়ি যাত্রা করেন। কিন্তু এই রথ সাধারণ রথের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এই রথের আরাধ্য কোনো দেবতা নন, বরং মানুষের জীবন। আর সেই জীবনকে সুস্থ ও সুন্দর রাখার মন্ত্র যিনি আজীবন দিয়ে গেছেন, সেই বিধানচন্দ্র রায়ের আদর্শকেই পাথেয় করেছে এই উদ্যোগ। রথের উপরিভাগে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্থাপন করা হয়েছিল ডাক্তার রায়ের আবক্ষ মূর্তি। ফুলের মালায় সুসজ্জিত সেই মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে বহু মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর সেই রথ পরিক্রমা শুরু করে কলকাতার রাজপথে। শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ায় এই চলমান চিকিৎসালয়। পথচলতি সাধারণ মানুষের কাছে এই রথ যেন এক পরম বিস্ময় এবং স্বস্তির বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছিল।
উদ্যোক্তাদের এই অভিনব রথ থেকে কোনো ঐতিহ্যবাহী বাতাস বা মিষ্টি প্রসাদ বিতরণ করা হয়নি। তার বদলে বিলি করা হয়েছে সুস্থ থাকার আশ্বাস। এই রথের ঠিক পেছনেই ছিল একটি সুসজ্জিত আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স। পথচলতি মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের শারীরিক পরীক্ষা করিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। কেউ মেপে নিলেন শরীরের শর্করার পরিমাণ, কারও মাপা হলো রক্তচাপ কিংবা রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা। আবার হৃদযন্ত্রের পরিস্থিতি বুঝতে রথের পেছনের অ্যাম্বুলেন্সে তৎক্ষণাৎ ইসিজি করার ব্যবস্থাও ছিল নিখরচায়।
দৈনন্দিন রুটিরুজির ব্যস্ততার মাঝে আচমকাই পথের ধারে এমন নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার সুযোগ পেয়ে আপ্লুত হয়েছেন বহু সাধারণ মানুষ।
শহরের বিভিন্ন ক্লাব ও জনবহুল এলাকা অতিক্রম করে এগিয়ে চলে এই রথ। তবে উদ্যোক্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে এই রথের কোনো উল্টো রথ নেই। কারণ মানবসেবার এই যে ধারা, তা নিরন্তর এবং প্রবহমান। তার কোনো উল্টো যাত্রা বা সমাপ্তি থাকতে পারে না। ডাক্তার রায়ের জন্ম ও মৃত্যুদিন এবং রথযাত্রা একই মাসে হওয়ায় এই জীবন দেবতা রথ পথে নামানোর পরিকল্পনা করেন সেরাম থ্যালাসেমিয়া প্রিভেনশন ফেডারেশন কর্তৃপক্ষ।
এই অভিনব উদ্যোগ প্রসঙ্গে সংস্থার সম্পাদক সঞ্জীব আচার্য জানান যে তাঁরা সারা বছরই থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে এবং এই রোগ নিয়ে জনমানসে সচেতনতা বাড়াতে নানা ধরনের সামাজিক কাজ করে থাকেন। থ্যালাসেমিয়া সচেতনতার পাশাপাশি সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতেও তাঁরা দায়বদ্ধ। তিনি বলেন যে ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের মতো একজন মহৎ চিকিৎসকের আদর্শকে বুকে রেখেই এই জীবন দেবতা রথের ভাবনা। প্রচলিত রথ থেকে দেবতাকে নিবেদিত প্রসাদ দেওয়া হলেও তাঁদের কাছে মানুষের সেবাই হলো পরম প্রসাদ। সেই কারণে সাধারণ মানুষের অতি প্রয়োজনীয় কিছু মৌলিক স্বাস্থ্য পরিষেবা তাঁদের হাতের নাগালে পৌঁছে দিতেই এই আয়োজন। ডাক্তার রায়ের দেখানো পথেই আগামী দিনেও তাঁরা এগিয়ে চলবেন।







