শিশির বাবু, হ্যাঁ শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) এই নামেই তাঁর বাবাকে সম্বোধন করেন, প্রকাশ্যেই। তো সেই শিশিরবাবু শুরু থেকেই বিরাট ধনী ছিলেন, পেট্রল পাম্প থেকে নানাবিধ ব্যবসা ছিল এমন তো নয়, সেসব তো রাজনীতিতে এলে হয়ে থাকে, হয়েছে। কিন্তু এমনও নয় যে তিনি খুব দরিদ্র ছিলেন, তাঁর শুরুয়াতটা একজন স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত হিসেবেই ছিল। তো বাংলার স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত ঘরে ইদের সময়ে সেমাই হয়, বড়দিনে কেক আসে, নবমীতে পাঁঠার মাংস। হিন্দু বাঙালি চার্চে গেছে, মসজিদে গেছে এমন নয় কিন্তু তারা উৎসবে থেকেছে চিরটাকাল। অনেকের জানাই আছে এক বাগদাদী ইহুদি নাহুম ইস্রায়েল মের্দেকাই এর নাহুমস কেক তোইরি করেন যে শ্রমিকেরা তাঁদের ৮০% মুসলমান আর সেই কেক এর ৮০% খায় কিন্তু হিন্দু বাঙালি মানুষজন। হ্যাঁ এটাই বাংলা, এটাই আমাদের নবজাগরণের ছবি, এটাই আমাদের রবিঠাকুর, নজরুল মাইকেল এর ঐতিহ্য। স্বচ্ছল বাঙালির অনেকের ছোটবেলায় গভীর রাতে ঘুমের অচেতনে সান্তাক্লজ আসতো, সেই ছোটরা জানতেও পারতো না কিন্তু সকালে উঠে দেখতো কেক, লজেন্স এর সঙ্গে জয়ঙ্গরের মোয়া রেখে গেছে সান্তা। কিন্তু আজ? বড়দিনে সান্তা সাজলে ধোলাই দেওয়া হচ্ছে, চিকেন প্যাটিস ওলাকে মারার পরে বীরের সম্বর্ধনা দেওয়া হচ্ছে, চার্চের বাইরে খ্রিসমাস সেলিব্রেশনে এসে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা করার বাড়িতে, প্রকাশ্যে এসব করা মানে সনাতনীদের ভাবাবেগে আঘাত করা, কাজেই বাড়ি যান। না এসব এখনও আমাদের এই বাংলাতে হয় নি, এক ঐ প্যাটিস ওলাকে দে দনাদ্দন দেওয়া ছাড়া। কিন্তু হচ্ছে, দিল্লি, ছত্তিশগড় উড়িষ্যাতে হচ্ছে, কারা করছেন? কেন? সনাতনীরা। হ্যাঁ তাঁরাই মাথায় ফেটি বেঁধে এসে সনাতন ধর্মের কথা বলছেন, কোন সনাতন ধর্ম? যে সনাতন ধর্মের কথা বলেন শুভেন্দু অধিকারি। তো মাদের জানতে মুঞ্চায়, আমাদের খোকাবাবুর ঘরে বড়দিনে কেক ঢুকতো না? সান্তা আসতো না রাতে? আরও বড় প্রশ্ন হল, উনি তো জানিয়েই দিয়েছেন যে ওনারাই আসছেন ২০২৬ এ পিসি তো গনগনাগনগন, বেশ তো। তো আগামী বড়দিনে বাঙালির ঘরে কেক ঢুকবেনা? সান্তা আসবে না? সেটাই বিষয় আজকে, শুভেন্দুর ঘরে কেক ঢোকেনা, যায় না সান্তাক্লজ।
রাত পোহালেই বড়দিন। তার আগে রাজধানী দিল্লি-সমেত ওড়িশা, উত্তরাখণ্ড, মধ্যপ্রদেশের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে বড়দিন পালন করা আর সান্তা ক্লজের টুপি বিক্রি আর সেটা পরা নিয়ে ফতোয়া জারি করা হয়েছে। সোশাল মিডিয়ায় খুলে দেখুন সেসব ভিডিও রীতিমত ভাইরাল, সাফ হুমকি, এসব চলবে না, যিশুর পুজো বাড়িতে গিয়ে করুন। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে বড়দিন উদযাপন করা এখন সনাতনীদের ভাবাবেগে আঘাত করা, আর তাই সেটা এক জঘন্য অপরাধ। সেসব ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে দিল্লির লাজপত নগরে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিছু শিশুদের কেক খাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ্সেখানে হামলা চালায় বিজেপির সনাতনীরা। বিজেপির জবলপুর শাখার সহ-সভাপতি অঞ্জু ভার্গবকে এক দিব্যাঙ্গ মহিলার সাথে দুর্ব্যবহার করতে দেখা গেছে, আর ঘটনা আসার পরে তাঁরা বলতে শুরু করেন এখানে ধর্মান্তরণের ঘটনা ঘটছিল, যদিও পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে জোর করে ধর্মান্তরের কোনও প্রমাণ মেলেনি। সান্তা ক্লজের টুপি পরা কিছু মহিলা ও গির্জায় প্রায় ৭০ জন দিব্যাঙ্গ ও বিশেষ শিশু একটা গির্জায় বড়দিনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণপত্র বিলি করেছিলেন। সেখানেই কিছু মানুষ এসে তাঁদের বাধা দেয় এবং বলে, ‘বড়দিন পালন করতে হলে নিজের বাড়িতে গিয়ে করুন’। রীতিমতো শাসানি দিয়ে দলটাকে রাস্তা থেকে সরিয়েও দেওয়ার এই ছবিও ধরা পড়েছে ভিডিওতে। রাজধানীর বুকেই এহেন কাণ্ডের এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই স্বাভাবিকভাবেই নিন্দার ঝড় উঠেছে সোশাল মিডিয়াতে। অন্যদিকে, হরিদ্বারে সনাতন সংগঠনগুলো ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন উদযাপনের বিরোধিতা করে গঙ্গার ঘাটে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। উড়িশাই বা পিছিয়ে থাকে কেন? এই সেই উড়িশা যেখানে গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টেইন কে তাঁর দুই সন্তান সমেত জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। সেই উড়িষ্যাতে এখন তো বিজেপিই ক্ষমতায়। সেখানেও হিন্দু বিক্রেতারা কেন সান্তার টুপি, মুখোশ, লাল পোশাক বিক্রি করছেন, তার জন্যও তাঁদের বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়। তাঁদের হুমকি দিয়ে সেই টুপি দাড়ি খোলানো হয়। আরেক বিজেপি শাসিত রাজ্য মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরে বড়দিন পালন কেন্দ্র করে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। সেখানে বড়দিন পালনের আড়ালে ধর্মান্তরণ করানো হচ্ছে এই অভিযোগে বিজেপি নেতাদের সঙ্গে নিয়ে হিন্দু সংগঠনগুলো একটি গির্জায় পৌঁছে বিক্ষোভ দেখাতে থাকে। হ্যাঁ বিজেপির শাসনের বাস্তবতা এটাই — ভয় দেখানো, মরাল পোলিসিং, আর সেগুলোও বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে বাংলার দিকে তাকান, যেখানে রাস্তাঘাট উৎসবের আলোয় ঝলমল করছে। আমাদের প্রশ্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যে বড়দিন পালন, সান্তাক্লজের টুপি পরা নিয়ে ক্ষুব্ধ সনাতনীরা, তারা ধমকে চমকে, পিটিয়ে সেই সব অনুষ্ঠান বন্ধ করার ফতোয়া দিয়েছে। আমাদের বাংলাতে বিজেপি ক্ষমতায় আসলে কি বড়দিন উদযাপন উঠে যাবে? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন?
আরও পড়ুন:Aajke | কেরালায় তৃণমূল এখন ইউ ডি এফ শরিক, যোগ দিল কংগ্রেস জোটে
সনাতন সনাতন বলে যাঁরা চেল্লায়, আমি নিশ্চিত তাঁরা এর মানেই জানেন না। হিন্দু ধর্মের বা বলা ভাল ব্রাহ্মণ্যবাদের বিভিন্ন কুপ্রথাগুলোর বিরোধিতা শুরু হয়েছিল, আর তার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রামমোহন বিদ্যাসাগর ইত্যাদিরা। যাঁরা তার বিরোধিতা করছিলেন, যাঁরা সেই বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে ছিলেন, সতী দাহের পক্ষে ছিলেন, যাঁরা চতুর্বর্ণ প্রথার ঘোর সমর্থক ছিলেন, যাঁরা মনে করতেন শুদ্রদের জন্ম হয়েছে ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রীয়দের সেবা করার জন্য, তাঁরা নিজেদের সনাতন বলতেন। হ্যাঁ তাঁরাই সেই অর্থে সনাতনী ছিলেন। আজ যাঁরা সনাতনী বলে দাবী করেন, তাঁদের বাবা মারা গেলে মা কে চিতায় তুলবেন তো? আর নাহলে ঐ সনাতনী সনাতনী বলাতা বন্ধ করুন। সমাজবিজ্ঞানে অত্যন্ত কুৎসিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষজনেরাই ছিলেন সনাতনী। আর হ্যাঁ আজ সেই সনাতনীদের মাথা হলেন এ রাজ্যের খোকাবাবু শুভেন্দু অধিকারী।







