ওয়েব ডেস্ক: বাংলাদেশের (Bangladesh) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের (Kazi Najrul Islam) সমাধির পাশেই শেষ ঠিকানা হতে চলেছে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও কট্টোরপন্থী তরুণ নেতা, তীব্র ভারতবিদ্বেষী পরিচিত ওসমান হাদির (Osman Hadi)। শুক্রবার গভীর রাতে জরুরি বৈঠকের পর এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (Dhaka University) কর্তৃপক্ষ। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে বাংলাদেশের (Bangladesh) রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে নজরুলের সমাধির পাশাপাশি যেখানে একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রথিতযশা শিক্ষকের সমাধি রয়েছে, সেখানে হাদিকে সমাহিত করা কতটা যুক্তিযুক্ত—তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন। নিরাপত্তা আধিকারিকদের একাংশও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নতুন করে অশান্তি ছড়াতে পারে।
আরও পড়ুন: পাকিস্তানে ফের বড় হামলা তালিবানের! মৃত একাধিক
পড়শি দেশের প্রথম সারির সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, হাদির পরিবার প্রথমে নজরুলের সমাধির পাশে তাঁকে সমাহিত করার আর্জি জানায়। পরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিপরিষদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের তরফ থেকেও একই অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠানো হয়। সেই প্রেক্ষিতেই শুক্রবার রাতে অনলাইন মাধ্যমে জরুরি বৈঠকে বসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট। বৈঠকেই হাদির সমাধিস্থল চূড়ান্ত করা হয়। তবে সমাধিস্থলকে ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেই।
উল্লেখ্য, গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হন ওসমান হাদি। ছ’দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত তিনি মারা যান। সরকারি উদ্যোগে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হলেও বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ্যে আসে। সেই খবর ছড়াতেই বাংলাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। সংগঠিত জনরোষে ভাঙচুর চালানো হয় একাধিক সরকারি ভবন ও আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে। হামলার শিকার হয় সংবাদমাধ্যমও—‘প্রথম আলো’ ও ‘ডেলি স্টার’-এর দফতরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। রেহাই পায়নি ছায়ানট ভবন ও উদীচীর কার্যালয়ের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও।
এই পরিস্থিতিতে শনিবার হাদির শেষকৃত্য ঘিরে ফের অশান্তির আশঙ্কা করছে প্রশাসনের একাংশ। হাদির স্মৃতিতে শনিবার বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূসের প্রেস উইং সূত্রে জানানো হয়েছে, দুপুর দু’টো নাগাদ সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজ়ায় তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। এরপর দেহ নিয়ে যাওয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থলের প্রস্তুতি চলছে।
সমাজমাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, কোন মানদণ্ডে জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে ইনকিলাব মঞ্চের এই কট্টরপন্থী উগ্র ইসলামবাদী নেতাকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল? রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, গত বছর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জামাত-ই-ইসলামির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন হাদি। তাঁর নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে কট্টর ইসলামিক মতাদর্শ প্রচারের সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ। সেই ব্যানারে দেশের নানা প্রান্তে সফর করে তিনি ধারাবাহিকভাবে ভারতবিরোধী প্রচার চালান বলে অভিযোগ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের বড় অংশের মত, এই কারণেই হাদির হত্যাকাণ্ডের পর সরকার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাতে মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ্যে আসার পরই প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনূস শোকজ্ঞাপন করেন। মধ্যরাতে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও রেডিওতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে হাদিকে ‘শহিদ’ আখ্যা দেন তিনি এবং শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা করেন। পাশাপাশি হাদির অন্তেষ্টি রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে সমালোচকদের বক্তব্য, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতা ছাড়া রাজনীতি, সংস্কৃতি বা সমাজজীবনে হাদির উল্লেখযোগ্য কোনও অবদান নেই। জাতীয় কবি নজরুল ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সমাধিস্থলের পাশে তাঁকে সমাহিত করার মতো ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় যোগ্যতা তাঁর ছিল না বলেই মত অনেকের। এই সিদ্ধান্তের পিছনে সরকার ও জামাতি রাজনীতির অঙ্ক কাজ করছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
প্রসঙ্গত, যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ হাদিকে নজরুলের সমাধির পাশে সমাহিত করার দাবি তুলেছে, সেটি বর্তমানে জামাতের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের নিয়ন্ত্রণে। হাদি হত্যার ঘটনার পর থেকেই জামাত ভারতের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলছে। গত পরশু হাদির মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ্যে আসার পর জামাতে ইসলামি বিবৃতি দিয়ে দাবি করে, ভারতকে হাদির খুনিদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতে হবে। যদিও বাংলাদেশ সরকার এখনও পর্যন্ত এমন কোনও তথ্যপ্রমাণ ভারতকে দিতে পারেনি যে হত্যাকারীরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গিয়েছে। বরং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, তাদের কাছে এ ধরনের কোনও তথ্যপ্রমাণ নেই।







