৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, শুক্রবার,
1
2
3
4
5
6
7
8
9
10
11
12
K T V Clock
4th Piller: নেতাজী নিয়ে কথা বলা বন্ধ করুন মিঃ প্রাইম মিনিস্টার
কলকাতা টিভি ওয়েব ডেস্ক
কলকাতা টিভি ওয়েব ডেস্ক Edited By: 
  • আপডেট সময় : ১২-০৯-২০২২, ১০:৩৯ অপরাহ্ন
4th Piller: নেতাজী নিয়ে কথা বলা বন্ধ করুন মিঃ প্রাইম মিনিস্টার
চতুর্থ স্তম্ভ

নেতাজী নিয়ে কথা বলছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী, নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদি, যিনি সাভারকার কে বীর বলেন, তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত, যিনি আর এস এস এর প্রচারক, যিনি হিন্দু মহাসভার শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় কে তাঁর আদর্শ বলে মনে করেন, তাঁর মুখে নেতাজীর গুণগান খানিকটা ভুতের মুখে রামনামের মতই শোনাচ্ছে। কেন? তাই নিয়েই আজকের আলোচনা। স্বাধীনতা আন্দোলনের দুটো মুল ধারা ছিল, প্রথমটা হল কংগ্রেস, অন্যটা হল হিন্দু জাতীয়তাবাদী ধারা। কংগ্রেস এর মঞ্চেই কাজ করতেন বেশিরভাগ বিপ্লবীরা, কিন্তু তাদের সহিংস পদ্ধতি ছিল কংগ্রেসের নীতি বিরোধী। সূর্য সেন থেকে অনন্ত সিংহ, এমন কি বিনয় বাদল দীনেশ ও প্রকাশ্যে কংগ্রেসই করতেন। ১৯২০-২২ এর নন কো অপারেশন মুভমেন্ট পর্যন্ত বিপ্লবীদের বড় অংশের আস্থাও ছিল গান্ধিজীর ওপর, কিন্তু চৌরিচৌরার ঘটনার পরে গান্ধিজী অসহযোগ আন্দোলন তুলে নেওয়ার পর থেকে বিপ্লবীরা কংগ্রেস কে তাঁদের ক্যামোফ্ল্যাজ, ছদ্ম সংগঠন হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন, মানে বাইরে সবাই জানল এরা কংগ্রেস করেন, কিন্তু ভেতরের সংগ্রাম ছিল গুলি বন্দুক, বোমা নিয়ে। এবং এই বাংলায় বা ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গার বিপ্লবীরা কংগ্রেসের মধ্যে সুভাষ চন্দ্র বসুর মধ্যে নিজেদের আদর্শ খুঁজে পেয়েছিলেন, তার একটা বড় উদাহরণ হল ১৯২৮ এর কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশন, সূর্য সেন থেকে অম্বিকা সেনগুপ্ত, প্রত্যেকে এসেছিলেন ঐ অধিবেশনে। ঐ অধিবেশনেই নেতাজীর পাশেই ছিলেন বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার্স এর মেজর সত্য গুপ্ত। কংগ্রেসের আরেক ধারাকে নিয়ে এগিয়েছিলেন নেতাজী এবং জহরলাল নেহেরু, দুজনের মাথায় ছিল এক অসাম্প্রদায়িক ভারত, এক সমাজতান্ত্রিক ভারত। কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে সুভাষ চন্দ্র বসু তৈরি করলেন ফরোয়ার্ড ব্লক, পড়ে দেখুন তার প্রস্তুতি পর্বের দলিলগুলো, সেখানে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের কথা বলা আছে, সেখানে প্ল্যানিং কমিশনের কথা বলা আছে যা নিয়ে সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেসের সভাপতি হবার পরেই কাজ শুরু করেছিলেন। অন্যদিকে জহরলাল নেহেরু বরাবরই বলে এসেছেন সয়াজতান্ত্রিক ধাঁচের অর্থনীতির কথা, প্রধানমন্ত্রী হয়েই তিনি রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। এবং এই দুজনেই ছিলেন প্রশ্নাতীতভাবে অসাম্প্রদায়িক। গান্ধী নেহেরু সুভাষ ত্রয়ী হয়ে উঠতেই পারতেন স্বাধীন ভারতবর্ষের কান্ডারি। হয় নি। কেন? রাজনৈতিক মতানৈক্যের জন্য। খেয়াল কএ দেখুন নেতাজী কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে অনায়াসেই বিপ্লবীদের যে কোনো একটা সংগঠনে যোগ দিতে পারতেন, নতুন সংগঠন তৈরি করতে পারতেন, যেখানে বিপ্লবীরা যোগ দিত। করেন নি। কিছু বোমা আর বন্দুক দিয়েই দেশ স্বাধীন করা যাবে তা তিনি মনে করতেন না, যদিও সেই সব বিপ্লবীদের তিনি শ্রদ্ধা করতেন, তাদেরকে সাহায্যো করেছেন। নেতাজী সুভাষ চেয়েছিলেন এক আপোষহীন লড়াই, প্রয়োজনে বাইরের শক্তির সামরিক সাহায্য নিয়েই ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই। গান্ধী নেহেরু মনে করতেন সেই সাহায্য হিটলারের কাছ থেকে তোজোর কাছ থেকে নিলে আরও বড় বিপদ আসতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অক্ষ শক্তি, হিটলার, মুসোলিনি, তোজো কে তাঁরা স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে বিশ্বাস করতে রাজি হন নি। এই রাজনৈতিক মতবিরোধ থেকেই তাঁরা আলাদা হন, নেতাজী দেশ ছাড়েন, আই এন এ পুনর্গঠন করে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু করেন, এদিকে দেশের মধ্যে ইংরেজ ভারত ছাড় শ্লোগান দিয়ে কংগ্রেস রাস্তায়। ওদিকে নেতাজী তাঁর বাহিনী নিয়ে উত্তর পূর্ব রণাঙ্গনে। কিন্তু তিনি সোচ্চারে সমর্থন জানিয়েছিলেন এই ভারত ছাড় আন্দোলন কে। ঠিক এই সময়ে সাভারকার, গোলওয়ালকর, হিন্দু মহাসভা, রাষ্ট্রিয় স্বয়ং সেবক সংঘ কী করছিল? এই বাংলায় তখন কংগ্রেসের বিরোধিতায় মুসলিম লিগ এর সঙ্গে হিন্দু মহাসভার সরকার, নেতা? শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, তিনি কী করছিলেন? ভিনায়ক দামোদরদাস সাভারকার তার আগেই জেল থেকে ৫ টা মুচলেকা লিখে ফেলেছেন। আর সে সব মুচলেকার কী ভাষা। ইংরেজরা ওনাকে ছেড়ে দিলে কেবল উনিই ইংরেজ বিরোধিতা ছেড়ে দেবেন এমন নয়, উনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে ইংরেজদের বিরোধিতা করছিলেন যে কোট আনকোট বিপথগামী যুবকেরা, তাদেরকেও বোঝাবেন যে ইংরেজদের বিরোধিতা করার কোনও মানেই হয় না, কিছুদিন পরে স্বাভাবিক প্রশ্ন এসেছিল, তাহলে বিরোধিতা কাদের বিরুদ্ধে? উনি সেটাও খোলসা করেছিলেন, বলেছিলেন, মুসলমান, যারা আসলে ভারতীয়ই নয়, তাদের বিরোধিতা করতে হবে। করেছিলেন, ছাড়া পাওয়ার পরে সারাটা জীবন ধরে ইংরেজদের তোষামোদ করেছেন, তাঁর শিষ্য মুঞ্জে ইংরেজদের কাছ থেকে হিন্দু রাজাদের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বাহিনী তৈরি করার কাজ করছিলেন। সাভারকরের আর এক ভাব শিষ্য সদাশিব গোলওয়ালকর রীতিমত সার্কুলার দিয়ে আর এস এস কর্মীদের ভারত ছাড় আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করেছিলেন। এই বাংলায় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ইংরেজ বড়লাট কে চিঠি দিয়ে বলেছিলেন তাঁরা এই ভারত ছাড় আন্দোলনকে সমর্থন তো করেনই না, তাঁরা এই আন্দোলনকে ব্যর্থ করার জন্য যা যা করা প্রয়োজন তাই করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কেন? কারণ তাঁদের গুরুদেব সেই প্রতিজ্ঞা করে মুচলেকা দেয়ার পরেই আন্দামান জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। একদিকে নেতাজী, আপোষহীন এক স্বাধীনতা সংগ্রামী, অন্যদিকে একগুচ্ছ বিশ্বাসঘাতক। একদিকে অসাম্প্রদায়িকতার এক নিদর্শন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, যাঁর শ্লোগান, ইত্তেহাদ, ইদমত, কুরবানি বন্ধুত্ব, বিশ্বাস, আত্মত্যাগ। অন্যদিকে আর এস এস যার শ্লোগান হিন্দুরাষ্ট্র। একদিকে নেতাজী তাঁর ইন্ডিয়ান ন্যাশন্যাল আর্মিতে হিন্দু মুসলমান, শিখ, খ্রিস্টান দের এক জায়গায় বসে খাওয়ার ব্যবস্থা শুরু করেছেন অন্যদিকে সাভারকর, গডসে, মুঞ্জে, গোলওয়ালকর, শ্যামাপ্রসাদ যাঁদের রাজনীতির ভিত্তি হল মুসলমান বিরোধিতা। একদিকে গান্ধীর প্রবল বিরোধী শুধু নয়, পরবর্তিতে গান্ধী হত্যার ষড়যন্ত্রে সরাসরি জড়িত সাভারকার, গডসে, আর এস এস, হিন্দু মহাসভা অন্যদিকে সেই সুদুর প্রবাসে এক হিমালয় প্রমাণ মানুষ যিনি তাঁর ফৌজের নাম রাখছেন গান্ধী ব্রিগেড, নেহেরু ব্রিগেড, সেই মানুষটা যিনি গান্ধীকে বলেছিলেন জাতির পিতা। আজ সেই সাভারকার, গোলওয়ালকার, মুঞ্জে, শ্যামাপ্রসাদের ভাবশিষ্য নরেন্দ্র মোদীর মুখে নেতাজীর নাম? হ্যাঁ স্বাধীন ভারতবর্ষে নেতাজীর যে সন্মান পাওয়া উচিত ছিল তা তিনি পান নি, আমাদের কারেন্সিতে নেতাজির ছবি থাকা উচিত ছিল, সংসদ ভবনের সামনে নেতাজীর মুর্তি থাকা উচিত ছিল। ছিল তো। কিন্তু সে সব কথা বিশ্বাসঘাতকদের মুখে শুনবো কেন? তাদের মুখেই বা শুনবো কেন, যাঁরা নেতাজীর আদরশের ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছেন? সেই নেতা যাঁর সাংসদ সংখ্যা ৩০৩, একজনও মুসলমান বা অন্য কোনও সংখ্যালঘু নেই, যাঁর মন্ত্রী সভায় একজনও সংখ্যালঘু নেই, যখন দেশের প্রতি ৫ জনের একজন সংখ্যালঘু, তিনি বলবেন নেতাজীর কথা? যাঁর মুখ্যমন্ত্রীত্বের আমলেই ঘটেছে গুজরাটের গণহত্যা, তিনি বলবেন নেতাজীর কথা? নেতাজীর একটা মুর্তি বসানো হয়েছে রাজপথে, যে পথের নতুন নাম নাকি কর্তব্য পথ, ব্যস, মুর্তি বসালেই হয়ে গ্যালো? নেতাজীর আদর্শ? তাঁর ধর্ম নিরপেক্ষতা? তাঁর সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনা? সেগুলো জলাঞ্জলি দিয়ে কেবল মুর্তি বসিয়ে আসলে অন্য এক রাজনীতি করা হচ্ছে। ঐ যে আগেই বললাম নেতাজীর কে প্রকৃত মর্যাদা দেওয়ার ব্যাপারের কংগ্রেসের অনেকটাই খামতি ছিল, আর সেটাকেই কংগ্রেস আর নেতাজীর বিরোধিতার জায়গা দেখিয়ে নেতাজীকে পাশে পেতে চাইছেন মোদিজী, কারণ দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে বিশ্বাসঘাতকদের কোনও রাষ্ট্রনায়ক নেই, আছে সাভারকার যাঁকে সেই জায়গা তে বসাতে গেলে সাভারকার ফাইলস খুলে বসবেন অনেকেই, গান্ধী হত্যার ইতালিয় বেরেত্তা পিস্তল কোথা থেকে, কার আদেশে, কার নির্দেশে জোগাড় হয়েছিল সেই ইতিহাস বেরিয়ে আসবে, বেরিয়ে আসবে এয়ার ইন্ডিয়ার সেই ফ্লাইটের কথা যেখানে পাশাপাশি বসে দিল্লি গিয়েছিলেন সাভারকার, পাশে ছিল নাথুরাম গডসে, আর নারায়ণ আপ্তে। বেরিয়ে পড়বে সেই ইতিহাস যখন ২০ ফেব্রুয়ারি গান্ধী হতার বিফল প্রয়াসের পর নাথুরাম গডসে, আর নারায়ণ আপ্তে এসে দেখা করেন সাভারকারের সঙ্গে, যাদের মাথায় হাত রেখে সাভারকার বলেছিলেন যশস্বী ভব। সাভারকার পুজো চলতে থাকলেও এক দেশনায়ক, এক স্বাধীনতা সংগ্রামীর বড্ড অভাব, কাজেই ঝোলা লেকে নিকল পড়ে হ্যাঁয় ফকির, না দেশান্তরে যাবার জন্য নয়, একজন দেশপ্রেমিক ধরার জন্য, একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ধরে নিয়ে আসার জন্য। ভুল করেছেন, ইনি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু। তিনবার অজানা পথে পাড়ি দিয়েছেন, প্রথম বার ব্রিটিশ পুলিশ গোয়েন্দাদের ঘোল খাইয়ে মহানিষ্ক্রমণ, কলকাতা থেকে আফগানিস্তান, রাশিয়া হয়ে জার্মানি। যাত্রাপথের বিরাট অংশে তাঁর নাম ছিল মহম্মদ জিয়াউদ্দিন। দ্বিতীয় যাত্রা ডুবোজাহাজে, জার্মানি থেকে জাপান, সেও ইংরেজ কেবল নয় মিত্র শক্তির নেভির নাকের সামনে দিয়ে, যাত্রাসঙ্গী আবিদ হাসান সাফরানি। তৃতীয় যাত্রা ব্যংককের থেকে সায়গনের পথে, সেখানেও একমাত্র যাত্রা সঙ্গি হাবিবুর রাহমান। নেতাজীর নাম আপনার মুখে মানায় না মিঃ প্রাইম মিনিস্টার। ঐ পুণ্য নাম আপনার মুখে মানায় না।

Tags : 4th piller চতুর্থ স্তম্ভ

0     0
Please login to post your views on this article.LoginRegister as a New User

শেয়ার করুন


© R.P. Techvision India Pvt Ltd, All rights reserved.