Placeholder canvas

Placeholder canvas
Homeচতুর্থ স্তম্ভFourth Pillar | ভয় পেয়েছেন কঙ্কনা, ভয় দেখাচ্ছেন মোদিজি
Fourth Pillar

Fourth Pillar | ভয় পেয়েছেন কঙ্কনা, ভয় দেখাচ্ছেন মোদিজি

আমাদের মাস্টারমশাই সেই কবে নরেন্দ্র মোদির কথাই বলেছিলেন, তা না হলে এত মিল?

Follow Us :

সুজাতা সদনে এক ছবির প্রদর্শনী উপলক্ষে উপচে পড়েছিল ভিড়, দেখানো হচ্ছিল দ্য মিরর নামে ছবিটি, গতকাল মানে বুধবারের অনুষ্ঠান। কঙ্কনা সেনের ছবি, অভিনেত্রী নিজেই হাজির ছিলেন। ছবি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কঙ্কনা জানালেন তাঁর ভয়ের কথা। তিনি ভয় পাচ্ছেন, এই সময়ে অনেকেই ভয় পাচ্ছেন। সামান্য কোনও কথা বলার পরেই কাউকে দেশদ্রোহী বলে দেওয়াটা এক রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বললেন কঙ্কনা। তাঁর কথায় এল ৮০-র দশকের স্মৃতি, সেই মিলে সুর মেরা তুমহারা তো সুর বনে হামারা, এক চিড়িয়া, অনেক চিড়িয়া, সেই যূথবদ্ধ পাখিরা কীভাবে এক ব্যাধকে বোকা বানিয়েছিল, সেই গানের স্মৃতি। কঙ্কনা বলছিলেন, আমরা তো অনায়াসে সেদিন সরকারের বিরোধিতা করেছি। সত্যিই তো সেদিন বলিউড বিভিন্ন বিষয়ে বিরোধিতার সুর তুলত, কিশোর কুমারকে তো ঘাড় ধরে ব্যক্তিগত মনোরঞ্জনের জন্য নামানো যায়নি, বরং ব্যান করা হয়েছিল, অলিখিত ব্যান, দেশদ্রোহী বলা হয়েছিল? জেলে পোরা হয়েছিল? এই তো ক’বছর আগে পেট্রল ডিজেলের দাম বাড়া নিয়ে টুইট করেছেন অমিতাভ বচ্চন নিজে, টুইট করেছেন দিল্লির নির্ভয়া কাণ্ড নিয়ে। তিনিও কি ভয় পেয়েছেন? কই মণিপুর নিয়ে তো তাঁকে টুইট করতে দেখা গেল না, আজকের গ্যাস, ডিজেল, পেট্রলের দাম এত বেড়েছে, কই তিনি তো টুইট করছেন না? ভয় পেয়েছেন? নিশ্চয়ই পেয়েছেন। নাকি বলিউড এখন গোদিউড হয়ে গেছে? বুধবার কলকাতায় এসে কঙ্কনা যা বললেন তা তো অনেকের কথা।

প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে দাঁড়িয়ে জনসভাতে বিরোধী দলের নেতাদের দেশদ্রোহী বলছেন। বলছেন, এরা সব মুসলিম লিগের এজেন্ডা তুলে ধরছে। ওনার এন্টায়ার পলিটিক্যাল সায়েন্স পড়া আছে বলেই শিক্ষাদীক্ষা আছে এমনটা তো কেউ বলে না, তাই হঠাৎ মুসলিম লিগের প্রসঙ্গ তুলে ধরলেন। দেশের প্রত্যেক বিরোধী মানুষ, যারা এই সরকারের, আরএসএস–বিজেপির সাম্প্রদায়িক এজেন্ডার বিরোধিতা করে, যারা বিজেপিকে ভোট দেয় না, তারা সব্বাই দেশদ্রোহী? কত শতাংশ মানুষ বিজেপিকে ভোট দেয়? ৩৮ শতাংশ, তার মানে ৬০ শতাংশ মানুষ, দেশের গরিষ্ঠাংশ মানুষ দেশদ্রোহী। এখন আর এক নতুন খুড়োর কল চালু করেছেন, নির্বাচনী বন্ডের মতো এই খুড়োর কলের আসলি রহস্য একদিন নিশ্চয়ই বের হবে। সেই কল হল ইডি, যাকে খুশি গ্রেফতার করে জেলে পুরে দাও। একজনকে পুরে দিলে আরও হাজার জন ভয় পাবে। একজন ব্যবসায়ীকে জেলে পুরে দিলে আরও হাজার জন ব্যবসায়ী বিরোধী রাজনৈতিক দলকে চাঁদা দেওয়া বন্ধ করবে। একজন সম্পাদক বা সাংবাদিককে জেলে পুরে দাও, বাকিরা চমকে চোদ্দো, ভয়ে কুঁকড়ে রুমাল। এবং এক্ষেত্রে কেবল দেশদ্রোহী নয়, গায়ে লাগবে চোরের ছাপ। চোখে বেঁধেছি ঠুলো আর কানে দিয়েছি তুলো, ছোট্টবেলায় আমাদের স্কুলের একজন মাস্টারমশাই বলতেন। আমি ভাবতাম চোখ আছে, দেখতে পায়, কান আছে শুনতে পায় কিন্তু চোখে ঠুলো বেঁধে বা কানে তুলো দিয়ে লাভটা কী? দেয় কেন? কেই বা দেয়? এই এতদিন পরে বিলকুল পরিষ্কার, আমাদের মাস্টারমশাই সেই কবে নরেন্দ্র মোদির কথাই বলেছিলেন, তা না হলে এত মিল?

এ তো রবীন্দ্রনাথ নয়, যে তোরা যে যা বলিস ভাই আমার সোনার হরিণ চাই। এ হল এক অদ্ভুত ব্যাপার, নিজেই কারণে অকারণে মিত্রোঁ বলে হাজির হচ্ছেন মন কি বাত বলতে, নতুন চোগা চাপকান চাপিয়ে, নিত্যনতুন জ্যাকেট আর দাড়ির বাহার নিয়ে, বলছেন সামাজিক দূরত্বের কথা, বলছেন করোনা ভাইরাসকে পরাজিত করার জন্য কী করিতে হইবে, কী কী করিতে হইবে। আর নিজের বেলায় দাঁতকপাটি? মানে যা করার আমরা করব, ওনাদের করোনা হলে আমাদের পয়সায় রাজকীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা তো আছেই, লকডাউন হবে, বেরোলে পুলিশ ঠ্যাঙাবে, ঠেলাতে রাখা শাকসবজি উল্টে দেবে, তাবলিগি জমায়েত খুঁজে খুঁজে চিহ্নিত করে জেলে পোরার হুমকি দেবে। আর একই সময়ে ২২ কেজি রুপোর ইঁট পুঁততে চলে যাবে, এটাই রাজধর্ম? দেশের মানুষের কাছে এই দৃষ্টান্ত তৈরি করছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী? এবং যখন এই প্রশ্ন জনে জনে তখন ওই যে, চোখে বেঁধেছি ঠুলো, কানে দিয়েছি তুলো? এর আগে এরকম একটা দৃষ্টান্ত? না নেই। নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদি এই দেশের সংবিধানের ন্যূনতম তোয়াক্কা করেন না, বুঝিয়ে দিতে চান যে জমানা বদল গয়া, তোমাদের দু’ কড়ির সংবিধান নিয়ে তোমরা থাকো, আমরা আমাদের মতোই চলব। তাঁদের সাংসদ প্রার্থী প্রকাশ্যেই বলেছেন, ৩৭০টা আসন দিন, আমরা সংবিধান বদলে দেব। আসুন আমাদের দেশের এইরকম এক ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে দেখা যাক। সোমনাথ মন্দির, গুজরাতের। আমরা সবাই জানি যে সে মন্দির অন্তত তিনবার লুঠ করা হয়েছে, তিন তিনবার এই মন্দির ভাঙা হয়েছে, প্রচুর সোনা ছিল যা নিয়ে গেছে লুঠেরারা। এবং এই লুঠেরাদের মধ্যে মুঘল, উজবেক পারস্যের মুসলমান শাসকেরা ছিলেন, ছিল ব্রিটিশরাও। প্রাচীন এই মন্দির তৈরি হয়েছিল কাঠ দিয়ে, যে মন্দিরের কণামাত্রও আজ অবশিষ্ট নেই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই এই মন্দির পুনর্নির্মাণের কথা ওঠে। সদ্য দেশভাগ হয়েছে, বিরাট সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়ে গেছে, দাঙ্গার ক্ষত তখনও শুকোয়নি। প্রধানমন্ত্রী নেহরুর কাছে প্রথম কাজ ছিল এই উদ্বাস্তু সমস্যা মিটিয়ে, হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা এবং অবশ্যই দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ ইস্পাত ক্ষেত্রের অগ্রগতি। যে কারণে তাঁর মন্ত্রিসভায় তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকেও রেখেছিলেন, আবার ভি কে কৃষ্ণ মেননের মতো রাশিয়াপন্থী কমিউনিস্ট ছাপমারা নেতাকেও, নিজের সেকুলার চিন্তা ভাবনাকেও গোপন করেননি কোনওদিন।

ঠিক সেরকম সময়ে ক্যাবিনেটে সোমনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব এল, পণ্ডিত নেহরু সাফ বলে দিয়েছিলেন, পাবলিক মানি, মানে সরকারের টাকায় এ কাজ করা যাবে না। গান্ধীজি তখনও বেঁচে। বল্লভভাই প্যাটেল, কে এম মুনসি, যিনি নেহরুর মন্ত্রিসভায় খাদ্য কৃষি দফতরের মন্ত্রী, আরও কয়েকজন মিলে চলে গেলেন গান্ধীজির কাছে। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী গুজরাতেরই মানুষ, সোমনাথ মন্দির গুজরাতের ভারবেলের কাছে, তার উপর তিনি নিষ্ঠাবান হিন্দু। তিনি সব শুনে বলেছিলেন, বললেন সোমনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণ অত্যন্ত ভালো প্রস্তাব কিন্তু, “Let the people and not the Government bear the expenditure.” মানুষ টাকা দিক। সরকার যেন এই খরচের বোঝা না বহন করে, প্যাটেলরা জানতেন গান্ধীজির উপরে কথা বলা অসম্ভব। তাঁরা হিন্দু ধনী, এমনকী বিদেশে থাকেন, তাঁদের কাছ থেকে পয়সা তোলা শুরু করলেন। এরই মধ্যে কাশ্মীরের সমস্যাও চলছিল, সেখানে ব্যস্ত ছিলেন প্যাটেল এবং তিনি মারা যান ডিসেম্বর, ১৯৫০-এ। এবার এই মন্দির পুনর্নির্মাণের দায়িত্ব নেন কে এম মুনসি। জওহরলাল তাঁকে চিঠি লেখে জানান যে এই কাজ তিনি সমর্থন করছেন না। “I do not like your trying to restore Somnath. It is Hindu revivalism.” নেহরু এই কাজকে হিন্দুত্ব জাগরণের চেষ্টা বলে মনে করতেন, এদিকে কে এম মুনসিও ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন, তিনি জবাবে নেহরুকে লিখলেন, যা তাঁরই বই, Pilgrimage To Freedom এ লিখেছেন, “Yesterday you referred to Hindu revivalism. You pointedly referred to me in the Cabinet as connected with Somnath. I am glad you did so; for I do not want to keep back any part of my views or activities… I can assure you that the ‘Collective Subconscious’ of India today is happier with the scheme of reconstruction of Somnath… than with many other things that we have done and are doing.” আপনি একে হিন্দুত্ব জাগরণ বলেছেন, আমি মনে করি যা আমরা করেছি বা করছি তা এক জাতীয় চেতনার জাগরণ, যাতে মানুষ আনন্দিত, এবং আমি আমার মত লুকিয়েও রাখছি না।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | মিথ্যে প্রচারে সত্যি ঢাকার কাজে ব্যস্ত মোদি সরকার

কে এম মুনসির নেতৃত্বে সোমনাথ মন্দিরের পুনর্নির্মাণের কাজ চলল। মজার কথা দেখুন, নেহরুও বিরোধিতা করছেন প্রকাশ্যে, কিন্তু এমনও নয় যে কে এম মুনসিকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হচ্ছে। এই বিরোধিতার জন্য ইনকাম ট্যাক্স বা ইডির মতো কোনও বাহিনী তো তাঁর ঘরে যায়নি, তাঁকে জেলে পোরা হয়নি। নেহরুর গণতান্ত্রিক সেকুলার মূল্যবোধ কোন মাপের ছিল ভাবুন। আর আজ, বিরোধিতা মানেই দেশদ্রোহিতা, বিরোধিতা করলেই মাঝরাতে এনআইএ, বিরোধিতা করলেই ইডি, সিবিআই, ইনকাম ট্যাক্স? বিরোধিতা করলেই জেল? এই পরিবর্তনের ধারাটা শুরু থেকে একটু দেখে নেওয়া যাক। নেহরুর সময় রাষ্ট্র জাতীয়তাবাদী তো ছিলই, সেই জাতীয়তাবাদ ছিল কংগ্রেসের, যারা স্বাধীনতার লড়াই চালিয়েছিল, জেলে গিয়েছিল, মার খেয়েছিল। অবশ্যই নেহরু বাম-মনস্ক ছিলেন কিন্তু তা বলে মূলত আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাসী এমনও নয়, তিনি ধর্ম নিরপেক্ষ ছিলেন, দেশের কাঠামোও ধর্ম-নিরপেক্ষ ছিল, ঘোষিতভাবেই দেশকে গড়ে তোলা হচ্ছিল সমাজতান্ত্রিক ধাঁচে। রাষ্ট্র তার দায়িত্বে শিল্পস্থাপন করছিল, বিদ্যুৎ ইস্পাত, কোর সেক্টরে রাষ্ট্রের ভূমিকাই ছিল বড়। আবার পাশাপাশি বিড়লা-টাটাদের মতো শিল্প গোষ্ঠীও তাদের কাজ করছিলেন। মিক্সড ইকোনমি বললেও তাতে রাষ্ট্রের গুরুত্ব ছিল বেশি, শিক্ষা স্বাস্থ্য সেচ ইত্যাদির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এক ওয়েলফেয়ার স্টেটের ভূমিকা পালন করছিল। এবং গণতন্ত্রকে এক বিরাট পরিসরে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন পশ্চিমি শিক্ষায় শিক্ষিত নেহরু।

এরপর সংক্ষিপ্ত সময় লালবাহাদুর শাস্ত্রীর, রাষ্ট্রের চেহারার বিশেষ কিছু ফেরবদল হয়নি, কেবল কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা শাস্ত্রীজি জয় জওয়ান জয় কিষান ন্যারা দিয়ে কৃষকদের সমস্যাগুলোকে পাদপ্রদীপের আলোয় আনার চেষ্টা করেছিলেন। এরপর ইন্দিরা গান্ধী, জাতীয়তাবাদ তখনও পশ্চিম ঘেঁষা উদার চিন্তা, সমাজতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতাকে তিনিই নিয়ে এলেন সংবিধানের ঘোষণাপত্রে। ব্যাঙ্ক ন্যাশনালাইজেশন, কয়লাখনি ন্যাশনালাইজেশন দিয়ে সেই সমাজতান্ত্রিক চিন্তার বর্হিপ্রকাশ হল। ১৯৭১-এর যুদ্ধ হল, কিন্তু তা উগ্র জাতীয়তাবাদকে প্রশ্রয় দেয়নি, ঘর মে ঘুস কর মারেঙ্গে গোছের নির্বোধ স্লোগান ওঠেনি। কিন্তু গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বেশ পতন হয়েছে, জরুরি অবস্থা জারি তার অন্যতম নিদর্শন। এবং উনি ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধানে আনলে কী হবে, ধর্মকে ব্যবহারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, নিজেও এই স্বামীজি, ওই যোগীজি করে বেড়াতেন, আবার মুসলিম ভোটব্যাঙ্কের দিকেও নজর ছিল। ওনার পরে রাজীব গান্ধী, ওই সমাজতন্ত্র নিয়ে খুব কনভিন্সড নিজেই ছিলেন না, খোলাবাজারের দিকে খানিক এগোনো পিছনো চলছিল, জাতীয়তাবাদ আবার ফিরে গিয়েছিল তার পুরনো জায়গায়, তা নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য ছিল না, গণতন্ত্র মোটের উপর বরকরার কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে বেশ ঘেঁটে গেলেন। রামজন্মভূমির তালা খোলা, মাচান বাবার কাছে যাওয়া, শাহবানো মামলা নিয়ে গড়িমসিতেই বোঝা গেল তিনি ধর্মের তাস খেলতে নেমেছেন বটে কিন্তু সে তাস তাঁর আয়ত্তে নেই। উনি বিজেপির উত্থানের কারণ হয়ে রইলেন। এরপর মূলত সোনিয়া গান্ধীর ব্যাকডোর শাসন। গণতন্ত্র বরকরার, সমাজতন্ত্র না বাজার তাই নিয়ে ঘরে কোন্দল, একদিকে বামেরা অন্য দিকে চিদম্বরম মনমোহন। এর আগে নরসিমহা রাও বাজারের দরজা খুলে দিয়েছেন, মনমোহন সিং তখন পিছন থেকে চালাচ্ছেন, এখন সামনে থেকেই। কিন্তু বামেদের চাপে ১০০ দিনের কাজ, শিক্ষা ইত্যাদি নিয়ে বাম ঘেঁষা প্রকল্প, অন্যদিকে পাবলিক সেক্টর আন্ডারটেকিং বেচে দেওয়া। বলাই যায় যে সোনিয়া গান্ধীর ক’ বছরে প্রতিটা মাসে বাজার অর্থনীতি আর সমাজতান্ত্রিক ধারণার লড়াই চলতে থাকলেও শেষমেশ বাজার জিতে যায়, ধর্মনিরপেক্ষতাও খানিক মুসলিম তুষ্টিকরণকে নিয়ে চললেও মোটামুটি ঠিকঠাক। জাতীয়তাবাদও তখন অ্যায় মেরে বতন কে লোগো ইত্যাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

এবার নরেন্দ্র মোদির প্রথম এবং দ্বিতীয় টার্ম আর চলতি জমানা। প্রথম টার্ম ছিল সিনেমার ট্রেলার, সাংবাদিকরা প্রায়ই খোঁচাতেন, কই? রামমন্দির কী হল? ৩৭০ ধারা? ইউনিফর্ম সিভিল কোড? ওনারা খুব ধীরে ধীরে এগোচ্ছিলেন, জমি তৈরি করছিলেন, এমন একটা জমি যেখানে বিরোধিতার জায়গাও যেন না থাকে। মানে দেশের হিন্দু মেজরিটিকে পোলারাইজড করে এমন একটা জায়গায় নিয়ে আসা যেখানে সেই ভোটেই নির্ধারিত হয়ে যায় সরকারের চেহারা। সেই কাজ শেষ, ৩৭০ ধারা তুলে দিলেন, বাম আর তৃণমূল ছাড়া বিরোধিতা কোথায়? কেজরিওয়াল সেদিনেই সমর্থন জানিয়েছিলেন, কংগ্রেসের গলা ছিল খাদে। একই ব্যাপার তিন তালাক নিয়ে, বামেরা তৃণমূল ছাড়া বাকিরা প্রায় গলাই তোলেনি, এক অভিনেত্রী নুসরত কীসব বলেছিলেন, মমতা সেদিনেই বলেছিলেন, ওটা দলের মত নয়। এবার আসুন রামমন্দিরে, কংগ্রেস ভোট হারিয়ে ফেলার ভয়ে দেশের পুনর্গঠন হাতির দাঁত ব্যাঙের মাথা কীসব বলে যাচ্ছে, কারও গলাতেই এই রামমন্দিরের বিরোধিতার সুর নেই। প্রধান বিরোধী দলের মাথারা যদি মনে করেন এই রামলালার ভূমিপূজন, মন্দির উদ্বোধন দেশের ঐক্য সংহতিকে শক্তিশালী করবে তাহলে অন্যেরা আর কী বলবে? মুলায়ম থেকে লালু চুপ, এসপি, বিএসপি, তেলুগু দেশম, বিজেডি থেকে প্রায় সমস্ত দলের হীরণ্ময় নীরবতা বলে দিচ্ছে তারা হিন্দু ভোট ব্যাঙ্কে ধস নামার ভয়ে চুপ করে আছেন বা মৃদু সমর্থন জানাচ্ছেন। কিছুদিন আগে র‍্যাডিকাল লিবারেলদের চোখের মণি, কেজরিওয়াল দু’ হাত তুলে সমর্থন জানিয়েছেন ভূমিপূজনকে, মন্দির নির্মাণকে। সিপিএম সিপিআই কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে নতুন ভারত নির্মাণের স্বপ্ন দেখছে। রামমন্দির থেকে ৩৭০ ধারা থেকে তিন তালাক, বিজেপি সরকার যাই করছে, দেশের প্রধান প্রধান বিরোধী দলের তার বিরুদ্ধে জোরালো কোনও প্রতিবাদই নেই, প্রায় বিনা বিরোধিতায় চলছে এক প্রবল ক্ষমতাশালী মোদী সরকার। মোদি টু জমানায় ধর্মনিরপেক্ষতাকে গড়ের মাঠেও দেখা যাচ্ছে না, গণতন্ত্রও আরএসএস-বিজেপির মতো করেই, বিরোধিতা করলেই বোলতি বন্ধ জেলে ঢুকিয়ে দেওয়ার হুমকি, গণতান্ত্রিক ধারণাগুলো কবর দেওয়া হচ্ছে একে একে। জাতীয়তাবাদ তার তুঙ্গে, কিছু বললেই দেশ খতরে মে হ্যায়, হিন্দু খতরে মে হ্যায়। এক নতুন হিন্দু জাতীয়তাবাদের জন্ম হচ্ছে, এক নতুন জঙ্গি জাতীয়তাবাদের জন্ম হচ্ছে। প্রশ্ন করলেই অনায়াসে বলা হচ্ছে আপনি দেশদ্রোহী, সে আপনি মোদিজির মার্কশিট নিয়ে প্রশ্ন করলেও, কোনও প্রশ্ন নয়-এর জমানা চলছে। চারিদিকে এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ধন্যবাদ কঙ্কনাকে, উনি সেই ভয়ের কথাটা অন্তত স্পষ্ট করেই জানালেন।

RELATED ARTICLES

Most Popular