Placeholder canvas

Placeholder canvas
HomeআজকেAajke | কীভাবে শাহজাহান তৈরি হয়েছে
Aajke

Aajke | কীভাবে শাহজাহান তৈরি হয়েছে

ক্ষমতা এক অদ্ভুত ব্যাপার, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জড়ো হলেই মাথা ঘুরে যায়

Follow Us :

ওসব বাই দ্য পিপল অফ দ্য পিপল ফর দ্য পিপল বইয়ের কথা, লিঙ্কন সাহেব বলেছিলেন, তাঁর দেশের লোকেরাই কবে তা ভুলে মেরে দিয়েছে, আমাদের দেশে তো সেই কবে থেকেই। যদি সবই পিপল-এর হাতে হত তাহলে পৃথিবীর চেহারা কি এমন হত? মানুষের আঙুল রাঙিয়ে ভোট পর্ব সমাপ্ত হলেই আবার মানুষ মূষিকে পরিণত হয়, পূনর্মুষিক ভবঃ। তারপর হয় আপনাকে হাজিরা দিতে হবে শাহজাহান বা অনুব্রতর দরজায়, অথবা লোকাল কমিটি, জোনাল কমিটি দফতরে, এর ব্যত্যয় হবে কী করে? দুটো অবশ্যই আলাদা, দুটোর চেহারা আলাদা, কিন্তু যে গেছে সেই উঠোনে দরজায় বা দফতরে সে জানে কতটা অপমান সহ্য করে সেখানে দাঁড়াতে হয়। তার নিজের হকের জমিতে লাঙল পড়বে না যদি সেইখান থেকে নির্দেশ না আসে, তার দোকান বন্ধই থাকবে যদি না স্যর, দাদা বলে দেয়, খোলা হোক। তার চোখের সামনে বেড়া ভেঙে তার বাগান তছনছ করবে যদি এতটুকু বেগড়বাই হয়। এ চেহারা তো ছিল জমিদার জোতদারদের আমলে, তারপর সেই মাতব্বরেরা সরে এল এলসি, ডিসি, পার্টি বাবুরা। একসময় তিতিবিরক্ত মানুষ সেই মাতব্বরদের বিরুদ্ধে ভোট দিল, একটানা ৩৪ বছরের মাতব্বরি শেষ হল এবং সেই মাতব্বরদের অধিকাংশ জামা পাল্টে নতুন খাঞ্জা খাঁ হয়ে উঠল। তারাই হর্তা কর্তা বিধাতা। তারাই এলাকাতে শেষ কথা। তারাই নির্বাচনের সময় ভোট এনে দেয়, তারাই জমির দখল নিয়ে নব্য বিধায়কের ৫২ বিঘের ফার্ম হাউস তৈরি করে দেয়। এদের একেক জনের বাড়ি দেখলে ঠাহরই করতে পারবেন না, কত পয়সা এরা জড়ো করেছে। না, এমনটা ওই ৩৪ বছরে ছিল ব্যতিক্রম, কোথাও কোথাও ছিল বটে এই বিলাসী চেহারা, বাকি জায়গাতে বড়জোর সাইকেল ছেড়ে বাইক, বিড়ি ছেড়ে সিগারেট, কলকাতা বা সংলগ্ন এলাকাতে একটা ফ্ল্যাট ইত্যাদির মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু মাতব্বরি? অত্যাচার? অপমান? তাতে কোনও ফারাক ছিল না। এখন সেই মাতব্বরির সঙ্গে জুটেছে উপার্জন, এক আধ টাকা নয়, প্রান্তিক গ্রামের বাড়িতে সুইমিং পুল, ডাইনিং টেবল ঘোরে, রিভলভিং আর এত ক্ষমতা থাকলে নারী হয়ে ওঠে স্বাভাবিক পণ্য। ইন্টেলেকচুয়াল ক্ষমতাবানেরা রাত আড়াইটেয় ফোন করে থ্রি সাম, ফোর সামের প্রোপোজাল পাঠায়। গ্রামে শেখ শাহজাহান, বা উত্তম সর্দারেরা তো এত পালিশ দিয়ে বলে না, তাঁরা পিঠে খেতে ডাকে। কিন্তু কোথা থেকে উদয় হয় এই উত্তম, শিবু, শাহজাহান, অজিত মাইতিরা? সেটাই বিষয় আজকে, কীভাবে শাহজাহান তৈরি হয়েছে।

মধ্য ষাট থেকে এ রাজ্যে বামপন্থীরা, আরও পরিষ্কার করে বললে সিপিএম সিপিআই ইত্যাদি দল ক্ষমতায় আসা শুরু করে। দুনিয়ার দুই তৃতীয়াংশ সমাজতান্ত্রিক দেশ, ওদিকে রাশিয়া, এদিকে চীন, ভিয়েতনাম কিউবা, কাজেই এক নির্দিষ্ট আদর্শ আর সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য নিয়ে বামপন্থীরা সংসদীয় গণতন্ত্রে পা দিতে শুরু করেছিল, যেখানে একবার বিপ্লবের পরে দলের নেতৃত্বই চূড়ান্ত এমনটাই ছিল চলতি ধারণা। ১৯১৭-তে রাশিয়ার বিপ্লব, তারপর ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার নির্বাচন হতে ৮০-৯০ বছর কেটে গেছে, ১৯৪৮-এ চীনের বিপ্লব, তারপর নির্বাচন?

আরও পড়ুন: Aajke | সন্দেশখালি কি নন্দীগ্রাম হয়ে উঠছে?

ওসব ভুলে যান। সেখানে প্রতি পাঁচ বছর পরপর মানুষের রায়ে জিতে আসা, ক্ষমতায় থাকা ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। কাজেই ৭৭-এ ক্ষমতায় আসার পরেই তাঁদের ধারণা হয় এ সরকার, মানে এক বিপ্লবী সরকারকে ভেঙে দেওয়া হবে, আবার মাঠের লড়াইয়ে ফিরতে হবে, কাজেই মানুষকে সঙ্গে নাও, বর্গা শুরু হল, গরিব মানুষদের সঙ্গে পেল সরকারি বামপন্থীরা। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গাতে, দিল্লির সরকার বাম সরকারকে ভাঙল না, এদিকে সরকারের বিভিন্ন কাজে, বিভিন্ন দাবিদাওয়ার মাঝে সরকারি বামেরা বুঝল, নির্বাচন জেতার একটা মেকানিজম দরকার। সেই তখন থেকেই দল এক ওমনিপোটেন্ট, ওমনিসিয়েন্ট আকার নিতে শুরু করল, সর্বত্র আছে দল, সর্বত্র। রিকশাওলা ইউনিয়ন, রিকশা মালিক ইউনিয়ন এবং রিকশা যাত্রী ইউনিয়ন, তিনটেই একই নেতৃত্বের হাতে। কাজেই যুক্তি হারাল, এল নির্দেশ দেওয়ার প্রবণতা। তা তো এক জায়গাতে থামে না, বাড়তেই থাকল, এধারে মজিদ মাস্টার তো ওধারে সুশান্ত ঘোষ, অন্য ধারে দুলাল ব্যানার্জিদের জন্ম হল। কিন্তু তার প্রায় পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল দলের হাতে। তখনও পার্টি ক্লাস হয়, তখনও পার্টির নতুন ছাত্র যুব সদস্যরা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন। তারপর নেতৃত্ব বুঝল ওসবে হবে না, নির্বাচনে জিততে হলে ওই নির্বাচনী যন্ত্রটা দরকার আর তার সঙ্গে চলতি উন্নয়ন মডেল। একই উন্নয়নের মডেল যা নিয়ে চন্দ্রবাবু নাইডু বা নরেন্দ্র মোদি চলছেন সেই মডেল, বড় বিনিয়োগ, বিদেশি পুঁজি, কারখানা, ফ্লাইওভার, মল ঝলমল। কাজেই ওই বিপ্লব আদর্শ ইত্যাদি ক্রমশ গণশক্তির চারের পাতায় দেবাশিস চক্রবর্তীর ব্যাপার স্যাপার। বাকিটা লক্ষণ শেঠদের দখলে। এবং সর্বোপরি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য অ্যান্ড কোম্পানি যাঁরা সাফ বলেই দিয়েছিলেন, ওসব বিপ্লব ক্ষমতা দখল আর হবে না, ল্যাটিন আমেরিকার দিকে চোখ রাখো। কারা রাখবে? এরই মধ্যে শিল্পায়নের উন্মাদনা, ন্যানো কারখানা, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম পপাত চ, মমার চ। কিন্তু এর মধ্যেই তো গ্রামে গ্রামে মাতব্বররা তৈরি হয়েই গিয়েছিল, তারা টুক করে জার্সি বদলে ফেলল। এতদিন ঝাঁ-চকচকে পার্টি অফিস তৈরি হচ্ছিল এবারে তাদের প্রাসাদ তৈরি শুরু হল, একইভাবে যাঁরা জিতে আসলেন তাঁরা এই মাতব্বরদের উপর নির্ভরশীল, এরাই ভোট জোগাড় করে, ভোট করায়। আগে কোথাও একটু আধটু আদর্শ ইত্যাদির ফলে, দলের নিয়ন্ত্রণের ফলে দুর্নীতি সীমাহীন হয়নি, পঞ্চায়েত প্রধান ভোটে ৭০ লক্ষ খরচ করে সাত কোটি তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করেনি। এবারে লাগামছাড়া দুর্নীতি শুরু হল, মাতব্বরি তো আছেই। দলের উপরের তলার কাছে খবর ছিল না? তাই হয় নাকি, ওই সুইমিং পুলের পাশে বসে মদ্যপান করেছেন, বন্ধুদের নিয়ে তাসের আড্ডা বসেছে, সব জানতেন, কিন্তু মানুষের ধৈর্যের সীমা ভেঙে যায়, সব কিছুই মেনে নেয় না, এটা মাথাতেও আনেননি। এবার বুঝেছেন? হয়তো বুঝেছেন। বুঝলে ভালো, নাহলে কী হতে পারে তা তো জানা। এটা ঘটনা যে সন্দেশখালিকে জ্যান্ত রাখার চেষ্টা চালানো হবেই, কিন্তু তা রাখতে গেলে আরও অনেক ছোট বড় সন্দেশখালি দরকার, সেই জনসমর্থন বা সংগঠন কোনওটাই বিরোধী বাম কংগ্রেস বা বিজেপির নেই। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় নেতাদের দুর্নীতি করার পুরোদস্তুর ছাড় দেওয়ার জন্যই কি এই শাহজাহান, উত্তম, শিবু বা অজিত মাইতিদের জন্ম হচ্ছে না? মানুষের সমর্থন পেতে হলে শাসকদলকে কি অবিলম্বে স্থানীয় স্তরে এই দুর্নীতিবাজদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়াটাই উচিত? শুনুন মানুষজন কী বলছেন।

ক্ষমতা এক অদ্ভুত ব্যাপার, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জড়ো হলেই মাথা ঘুরে যায়। ক্ষমতার সঙ্গে জুড়ে থাকে দুর্নীতি, ক্ষমতার সঙ্গে জুড়ে থাকে অপরাধের প্রবণতা। কাজেই ক্ষমতা কিছুদিন পরে পরেই সর পর চড়কে বোলতা হ্যায়, মাথায় উঠে যায়, তখনই জন্ম হয় শাহজাহানের, উত্তমের, দুলাল ব্যানার্জির, মজিদ মাস্টারের। আর জন্ম হলে তার পতনও আছে। ক্ষমতার পতনের শব্দ শোনা যায়।

RELATED ARTICLES

Most Popular