Placeholder canvas

Placeholder canvas
Homeচতুর্থ স্তম্ভFourth Pillar | বাবা রামদেব কি লোক ঠকাচ্ছেন?
Fourth Pillar

Fourth Pillar | বাবা রামদেব কি লোক ঠকাচ্ছেন?

আমি জানি বাবা রামদেবকে জেলে পোরা হবে না, গ্রেফতার করা হবে না

Follow Us :

যদিও আমাদের আইন ব্যবস্থা খানিকটা গলফ খেলার মতো। বিশাল সবুজ গলফ মাঠ, হাঘরে গরিবদের প্রবেশ নিষেধ, আইনগুলো গলফ বলের মতো রাখা, সাইজ মতোন স্টিক তুলে নিয়ে ধাঁই করে মারা। পয়সা থাকলে, ক্ষমতা থাকলে আইন নিয়ে যা খুশি করা যায়, যা খুশি। কেবল ষড়যন্ত্রের অভিযোগে বছরের পর বছর কবি, সাহিত্যিক, উকিল, সমাজসেবী, সাংবাদিক, লেখককে জেলে ভরে দেওয়া যায়। চোখের সামনে খুন করে জেল হওয়া খুনি অপরাধীকে ছেড়ে দেওয়া যায়। আইন ঠোঁটে লিপস্টিক, গালে রুজ মেখে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বারাঙ্গনা যাকে ইচ্ছে করলেই পয়সা দিয়ে কেনা যায়। তবুও মাঝেমধ্যে আইনের দেবালয় থেকে কিছু রায় আসে যা দেখে মনে হয়, প্রাণ আছে প্রাণ আছে, মনে হয় খানিক ভরসা রাখাই যায় আইনের উপর। আর সত্যি বলতে কী, এখনও মানুষজনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হলে শোনাই যায়, তোকে আদালতে দাঁড় করিয়ে ছাড়ব, শোনা যায় কোর্টে চলো, দুধ কা দুধ পানি কা পানি হো যায়েগা। এসব মানুষ বলে কারণ মনের কোনও কোণায় আইনের উপর এখনও খানিক ভরসা আছে মানুষের। সেই বিচারালয় সাফ জানাল, পতঞ্জলি মানে বাবা রামদেব লোক ঠকানোর ব্যবসা করছে, এখনই ওই সমস্ত বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে হবে যাতে বলা হচ্ছে এই ওষুধগুলো খেলে সব সেরে যায়, সর্বরোগহর দাওয়াইয়ের বিজ্ঞাপন বন্ধ করতে বলেছে সর্বোচ্চ বিচারালয়। কিন্তু বিজ্ঞাপন না হয় বন্ধ হল, জাল ব্যবসা? মাথা নেই মুণ্ডু নেই এমন ওষুধ বিক্রি করা কে বন্ধ করবে? কারণ বাবা রামদেব তো বেড়েছেন এই সরকারের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে। মনে আছে? মার্চ ২৫-এ লকডাউন হল করোনা আটকাতে, মানে আমাদের দেশ টের পেল যে ভয়ঙ্কর কিছু একটা ঘটতে চলেছে। তিন মাসের মাথায় পতঞ্জলির বাবা রামদেব করোনার ওষুধ বের করে সাংবাদিক সম্মেলন করে ফেললেন। এমন একটা সময়ে যখন সারা পৃথিবীতে এক কোটির মতো আক্রান্ত, সারা ভারতে সাড়ে চার লক্ষের মতো আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে। পৃথিবী জুড়ে যত বড় বড় বৈজ্ঞানিকরা আছেন, তাঁরা এই রোগের ওষুধ, ভ্যাক্সিন বার করার জন্য ২৪ ঘণ্টা কাজ করছেন। অনেক জায়গাতেই প্রাথমিক কিছু সাফল্য পাওয়া গেছে, কিন্তু তাঁরা সাংবাদিক সম্মেলন করছেন না, কারণ একটা ওষুধকে বাজারে ছাড়ার আগে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়, তার বিভিন্ন ধাপ আছে, তারপর তাকে ওষুধ বলে ঘোষণা করা যায়। কিন্তু ওই যে পয়সা আর ক্ষমতা থাকলে আইনকে কলা দেখানো তো বাঁয়ে হাত কা খেল। তাই বাবা রামদেব সাংবাদিক ডেকে জানিয়ে দিলেন তাঁরা ওষুধ বের করে ফেলেছেন, কেউ কেউ ৩ দিনে আর বাকিরা ৭ দিনে সুস্থ হয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিক সম্মেলনে দেখালেন সেই ওষুধের প্যাকেট, কোরোনিল। খেলেই সেরে যাবে করোনা। লোকটাকে সেদিনই অ্যারেস্ট করা উচিত ছিল, তখনই জেলে পোরা উচিত ছিল, ওষুধ নিয়ে ওই সময়ে ওই রকম বজ্জাতি করার জন্য। তা না করা আয়ুষ থেকে বলা হয়েছিল ক্লিনিকাল ট্রায়ালের রিপোর্ট পাঠান, বলা হয়েছিল ওই ওষুধ আপাতত বিক্রি করতে পারবেন না। তাতে বয়ে গেছে, কিছুদিন পর থেকেই পতঞ্জলির হাজার একটা দোকানে রাখা হয়েছে এই ওষুধ, মৃত্যুভয়ে মানুষ কিনেছে, মরলে মরবে, বাঁচলে জয় বাবা রামদেবের জয়।

আমাদের দেশে ড্রাগ কন্ট্রোল অ্যাক্ট আছে আর আছে ম্যাজিক রিমেডিস অ্যাক্ট। আসছি সে কথায়, প্রথমে দেখে নিই আমাদের দেশে আইন অনুযায়ী ওষুধ বাজারে আনতে গেলে কী কী করতে হবে, মানে নিয়মটা কী।
প্রথমে গবেষণার মাধ্যমে ওষুধটা তৈরি করতে হবে। ধরে নিলাম রামদেব সুপার ফাস্ট, তা হলেও মাসখানেক তো লাগবেই। এরপর আপনাকে বসতে হবে আলোচনায়, যাকে বলে pre submission consultation, তারপর আপনাকে ওষুধ, তার components details, তার কার্যকারিতা ইত্যাদির বিবরণ দিতে হবে। এবার তিনটে কাজ করতে হবে, এটা ধাপে ধাপে হয়, একসঙ্গেও করা যায়। প্রথম হল ক্লিনিক্যাল টেস্ট। এটার আবার চারটে ধাপ আছে, পরে সেটা বলছি। দুই হলো, biomedical and health research, রুল ১৭ অনুযায়ী তার অনুমোদন নিতে হবে এথিক্স কমিটির কাছ থেকে। ওষুধ তৈরির আগে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের রিপোর্ট দিতে হবে। সেই ট্রায়ালের ফেজ জিরোতে ১০ থেকে ১৫ জনের উপর সেই ওষুধ প্রয়োগ করে তার কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে হবে। ফেজ জিরোর রিপোর্ট তৈরি করতে হবে। এরপর ফেজ ওয়ান, ১৫ থেকে ৩০ জনকে এই ওষুধ দিতে হবে, একটা গ্রুপকে কম ডোজের, একটা গ্রুপকে বেশি ডোজের ওষুধ দিয়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখতে হবে। এই রিপোর্টের ফলাফল দেখার পর ফেজ টু, এবার এই ওষুধের ডোজ কত হবে তা নির্ধারণ করার পালা, এবার সংখ্যাটা আরও বাড়বে, আবার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা হবে। এর ফলাফল দেখে ফেজ থ্রি-তে যেতে হবে, এবার দুটো গ্রুপ থাকবে, তাদের সিমটম একই হতে হবে। একটা গ্রুপকে সাধারণ বা পুরনো চিকিৎসাই করা হবে, অন্য গ্রুপকে নতুন ওষুধ দেওয়া হবে এবং তার রিপোর্ট তৈরি করা হবে। এই বিরাট লম্বা প্রক্রিয়ার কারণ হল যাতে ওষুধটার কার্যকারিতা বোঝার সঙ্গে সঙ্গে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও বোঝা যায়। যার জন্য একটা ওষুধ আবিষ্কার করে তাকে বাজারে আনতে বছর কেটে যায়। খুব সাধারণভাবেও একটা নতুন ওষুধ আবিষ্কার আর বাজারে আনার মধ্যের সময় ৯ থেকে ১০ মাস। বাবা রামদেব বুলেট ট্রেনে বসে করোনার ওষুধ, নানান ধরনের ওষুধ বার করে বাজারেও এনে ফেলেন কয়েক মাসের মধ্যে, সাংবাদিকদের ডেকে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েও দেন। আমাদের দেশে আয়ুর্বেদিক ওষুধ বা আয়ুর্বেদ পড়ানোর সংস্থা আয়ুষ কেবল জানিয়ে দেয় তাদের কাছে কোনও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের রিপোর্ট নেই। অথচ বাবা রামদেব প্রত্যেক বড় সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে সবার সামনে এই ওষুধে করোনা ৩ দিন কি বড়জোর সাত দিনে সেরে যাবে, ওই ওষুধে ক্যান্সার সেরে যাবে, সেই ওষুধে হাঁপানি সেরে যাবে বলে ঘোষণাও করে দিচ্ছেন।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | দেশের রাজনীতি যে কোনও মুহূর্তে উল্টে যেতে পারে, ৩৭০ নেমে যেতে পারে ২৫০-র তলায়

এবার আসুন THE DRUGS AND MAGIC REMEDIES (OBJECTIONABLE ADVERTISEMENTS) ACT, 1954 এ কী বলা আছে দেখে নেওয়া যাক।

Subject to the provisions of this Act, no person shall take any part in the publication of any advertisement relating to a drug if the advertisement contains any matters which—
(a) directly or indirectly gives a false impression regarding the true character of the drug; or
(b) makes a false claim for the drug; or
(c) is otherwise false or misleading in any material particular.

কোনও রোগ সেরে যাবে এমন ওষুধের বিজ্ঞাপন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ফাঁক আছে, তার সুযোগ বাবা রামদেব এতদিন নিয়েছেন, ইমিউনিটি বুস্টার, শরীরে রোগ আটকাতে চেষ্টা করে এরকম বলে হাজার একটা ওষুধ উনি বিক্রি করেন, যার গুণাগুণ কেউই জানে না। ঠাকুর দালানে চন্নোমেত্ত বা মাজারে জলপড়ার মতোই প্রমাণবিহীন ওষুধ, কিন্তু এতদিন সেগুলোকে ওষুধ বলা হয়নি, আমলা রস, খেলে চোখ ভালো হবে, কিন্তু আইন বাঁচিয়ে ওষুধ বলা হয়নি। কিন্তু ইদানিং তাও নয়, বাবা রামদেব সাংবাদিক সম্মেলনে পরিষ্কার বলে দিচ্ছেন এই এই ওষুধে করোনা থেকে হার্ট অ্যাটাক থেকে হাঁপানি সব সেরে যাবে।

আমি জানি বাবা রামদেবকে জেলে পোরা হবে না, গ্রেফতার করা হবে না, দেশসুদ্ধু মানুষের করোনা আতঙ্ককে, বিভিন্ন অসুখের আতঙ্ক আর তার সঙ্গে বাড়তে থাকা ডাক্তার ওষুধের খরচকে ব্যবহার করে তিনি কোটি কোটি টাকা ব্যবসা করবেন। আইন তাঁর কাছে গলফ বল, তিনি সপাটে মারবেন, তাঁর ইচ্ছে মতো। মানুষ মরলে মরবে, বাঁচলে বাঁচবে। ওনার উপার্জিত কোটি কোটি টাকার কিছু অংশ নিশ্চয়ই বিতরণ হবে, আইন পুজোর অঙ্গ হিসেবেই।

যাঁর নিজের চোখ পিটপিট করা, যা সাধারণ এমবিবিএস ডাক্তারও জানে স্নায়বিক দুর্বলতা, তার চিকিৎসা যিনি এতদিনেও করে উঠতে পারেননি, তাঁর দোকান থেকে সারা ভারতে হাজার একটা ওষুধ বের হচ্ছে, মানুষের বিশ্বাস নিয়ে খোলা বাজারে তামাশা হচ্ছে, কেউ কিচ্ছুটি বলবে না। এতদিন পরে আদালত জানাল যে এই বিজ্ঞাপন আর দেওয়া চলবে না। বিক্রি? চলবে, ওষুধ তৈরি চলবে, ওনার শিবিরের উপর কোনও রাশ টানা হয়নি, সেগুলোও চলবে। আইন আদালত রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের মন্ত্রী সান্ত্রী পাত্র মিত্র অমাত্য দেশটাকে কোথায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন? ঠিক তখন যখন মানুষের পেটে ভাত নেই, মাথার উপরে ছাদ নেই, চাকরি নেই, যাদের ছিল, তাদেরও চলে যাচ্ছে। কোথায় ভগবান? কোথায় তিরুপতি, জগন্নাথ, সাঁইবাবা, কৃষ্ণ, শিব? তাঁরা কোথায়? যদি থাকেন, মানুষের এই চরম দুর্দিনে তাদের দফতরে তালা লাগানো কেন? আর যদি বা খোলা হচ্ছে সেটাও এরকম আইনের আড়াল নিয়ে কেন?

রাষ্ট্র তৈরিই হয় একদল মানুষকে অন্য আর একদল মানুষের উপর অবাধ শোষণের, অত্যাচারের, সীমাহীন দারিদ্রের মধ্যে রেখে দেওয়ার জন্য। তাই কিছু মানুষের হাতে জমা হয় সম্পদের ৯০ শতাংশ, অসীম ক্ষমতা। সেই ক্ষমতা আর অর্থই ব্যবহার হয় তাদের সম্পদকে বাড়াতে, টিকিয়ে রাখতে, তারজন্যই বানানো হয় আইন কানুন। সে আইন ভুখা মানুষের জন্য নয়, সে আইন না খেতে পাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ায় না। তারা দাঁড়ায় কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়ী বাবা রামদেব কিংবা সেই সব মহান্তদের পাশে, যারা আসলে রাসপুটিন, যারা এই শোষণের ব্যবস্থাটাকে টিকিয়ে রাখতে চায়। ব্যবস্থাটাকে ভাঙতে হবে, এই কাঠামো টিকিয়ে রেখে খেটে খাওয়া মানুষ বড়জোর পেতে পারে তালি দেওয়া জামা, জল চুঁইয়ে পড়া ছাদ আর আধখানা রুটি। অস্বীকার করুন এই ব্যবস্থাকে, এই দ্রোহকালে এই রাসপুটিনদের চিহ্নিত করুন।

RELATED ARTICLES

Most Popular