skip to content
Thursday, June 13, 2024

skip to content
Homeচতুর্থ স্তম্ভFourth Pillar | সত্যি মিথ্যে, মিথ্যে সত্যি
Fourth Pillar

Fourth Pillar | সত্যি মিথ্যে, মিথ্যে সত্যি

বছর ২০ ধরে হঠাৎই শোনা যাচ্ছে হিন্দু খতরে মে হ্যায়, হিন্দু মানে কারা?

Follow Us :

রাষ্ট্র আমায় ভাত দেবে না, ভাতের লড়াই হবে, রাষ্ট্র আমায় ঘর দেবে না, মাথার উপরের ছাদের লড়াই হবে। বেকারের চাকরি দেবে না, মজুরি দেবে না, লড়াই হবে, দাম বাড়বে, লড়াই হবে। কতদিন? যতদিন রাষ্ট্র থাকবে ততদিন, শ্রেণি থাকবে, শ্রেণি শোষণ থাকবে, লড়াইও থাকবে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় কমিউনিস্ট পার্টি, জনতা দল না কংগ্রেস পার্টি থাকবে, সেটা বিবেচ্য নয়, লড়াই থাকবে। এটা ছিল সাধারণ লড়াইয়ের ফর্মুলা, এটা আমরা জানতাম, জানি। যে দল ক্ষমতায় থাকবে, সেই ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে হবে, তার বিরুদ্ধে লড়াই থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজ আমরা এক নতুন সমস্যার মুখোমুখি, এ সমস্যা নতুন, এ সমস্যা এর আগে আমরা দেখিনি, এ সমস্যা ভয়ঙ্কর। বেশ কিছু বছর ধরে দেখছি আমাদের মূল সমস্যাগুলোর থেকে, আমাদেরকে, দেশের মানুষকে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে, এবং কিছু ক্ষেত্রে তো সেই প্রচেষ্টা সফলও বটে। কীভাবে? আসুন তা নিয়েই কিছু আলোচনা করা যাক, বোঝার চেষ্টা করা যাক, কী ভয়ঙ্কর মগজ ধোলাই যন্ত্র তৈরি করা হয়েছে, কী বিশাল তার ব্যাপ্তি, কী অসম্ভব ক্ষমতা সেই যন্ত্রের। এবং বিশেষ করে এক সাধারণ নির্বাচনের আগে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েছেন সেই মিথ্যেগুলোকে ছড়িয়ে দেওয়ার।

বছর ২০ ধরে হঠাৎই শোনা যাচ্ছে হিন্দু খতরে মে হ্যায়, হিন্দু মানে কারা? আমরা যারা জন্মসূত্রে হিন্দু, যারা এই দেশের কমবেশি ৭৮-৭৯ শতাংশ মানুষ, তারা নাকি ভয়ঙ্কর বিপদে। আমার ৭৩ বছর বয়সি মেসোমশাই, ৫৮ বছর বয়সি পিসেমশাই, ৪৩ বছরের দিদি কিংবা ২৩ বছরের ভাগ্নে, হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ পাঠাচ্ছে, হিন্দু খতরে মে হ্যায়। এবার সত্যিই যদি দেশের ৭৮-৭৯ শতাংশ মানুষ বিপদে থাকেন, এমন বিপদ যা নাকি তাদের বেঁচেই থাকতে দেবে না, তাদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করবে, আমাদের চাকরি কোট আনকোট ওরা কেড়ে নিচ্ছে, সেই ওরাই আমাদের ঘরের মহিলাদের ইজ্জত নিয়ে খেলা করছে, বিরোধীরা ক্ষমতায় এলে সেই ওরাই মহিলাদের মঙ্গলসূত্র কেড়ে নেবে, এমনকী গরুও কেড়ে নেবে। তাহলে তেমন বিপদের সময় সত্যিই তো, আমরা কি নিছক পেটের ভাত, মাথার উপরে ছাদ, চাকরি বা মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভাবব? ভাবার কথা নয়, আফটার অল এগজিসটেন্স থাকলে তবে তো পেটের ভাত, চাকরি বা মাথার উপরে ছাদের প্রশ্ন থাকবে, খবর ছড়াচ্ছে হিন্দু খতরে মে হ্যায়। আপনি নাস্তিক হন বা আস্তিক, আপনি শৈব হন বা বৈষ্ণব, আপনি কালীপুজো করেন না নারায়ণ, সেটা তো প্রশ্ন নয়, আপনার টাইটেল ঘোষ, বোস, মুখার্জি, চ্যাটার্জি বা আরও সহজে বলা যাক আপনার নামের আগে মহম্মদ নেই, আপনার নামের শেষে খান নেই, আপনি বিপদে আছেন, আপনার অস্তিত্বই নাকি বিপন্ন। কে বলছে? দেশের প্রধানমন্ত্রী বলছেন, হোয়াটসঅ্যাপ বলছে, দিলু ঘোষ বলছে, হিন্দু ধর্মসভা থেকে বলা হচ্ছে, আপনার মাসি পিসি, আপনার জামাইবাবু ভাগ্নে বলছে, এই যে দেখুন হিন্দু খতরে মে হ্যায়, এখন সময় নয় অন্য কিছু ভাবার, এখন সময় নয় রোটি কপড়া মকানের লড়াই লড়ার, এখন সময় হিন্দুত্বকে বাঁচানোর, হিন্দুদের বাঁচানোর, কারণ হিন্দু খতরে মে হ্যায়।

কীভাবে খতরে মে হ্যায়? আরে বাবা বলছি না খতরে মে হ্যায়, ভীষণ খতরে মে হ্যায়। আপনি চেপে ধরলেন, গোল গোল কথা বলা বন্ধ করুন, বোঝান, কীভাবে হিন্দু খতরে মে হ্যায়? এসে গেল রাশি রাশি হোয়াটসঅ্যাপ তথ্য, মুসলমানরা এমনভাবে জনসংখ্যায় বাড়ছে যে আর ক’দিনের মধ্যেই তারা হিন্দুদের ছাপিয়ে যাবে, চারিদিকে কেবল মুসলমান দেখবেন, প্রত্যেকে গরু খায়, প্রত্যেকের ৯-১০-১১-১২টা করে বাচ্চাকাচ্চা, তারা ধরে ধরে হিন্দু মেয়েদের বিয়ে করছে, তাদেরর মুসলমান করে দিচ্ছে। এই যে দেখুন এইখানে লিখেছে, ওই মহারাজ বলেছে, এমনকী এসব কথা কবেই বল্লভভাই প্যাটেল বলে গেছেন, এই জন্যই তো নেতাজি রাশিয়ার সাইবেরিয়া থেকে ভারতবর্ষে এসে হিন্দু বাহিনী তৈরি করার কথা বলেছেন। এই যে দেখুন এত্ত মোটা বই, ইংরিজি বই, অনুজ ধর আর চন্দ্রচূড় লিখেছে, ৬০০ পাতার ইংরিজি বই, পড়ে নিন। আপনার চারধারে বৃষ্টির মতো তথ্য নামছে, আপনাকে বোঝানো হচ্ছে হিন্দু খতরে মে হ্যায়।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | প্রশান্ত কিশোর আসলে ঘোলাজলে মাছ ধরতে নেমেছেন

আর কী? আপনাকে বোঝানো হচ্ছে, বলা হচ্ছে কংগ্রেস সমেত সমস্ত বিরোধী রাজনৈতিক দল দেশদ্রোহী, পাকিস্তানের চর। ডাহা মিথ্যে কথা, জওহরলাল নেহরু আসলে মুসলমান, তার বাবার সৎপুত্র হচ্ছে জিন্না, যে নাকি দেশ ভাগ করেছিল। বলা হচ্ছে তার ছেলে রাজীব মুসলমান, তার বউ সোনিয়া খ্রিস্টান, এই সংখ্যালঘুরা, এই মুসলমান খ্রিস্টানরা দেশের ক্ষমতা হাতে নিতে চায়, হিন্দু খতরে মে হ্যায়। দেশের এই অবস্থার জন্য দায়ী জওহরলাল, ইন্দিরা, কংগ্রেস। হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ আসছে গান্ধী হত্যাকারী গডসে আসলে দেশপ্রেমী, জাতির পিতার হত্যাকারী দেশপ্রেমী। সবে হাইকোর্ট ছেড়েছেন, এক বিচারক বলছেন গান্ধী না গডসে তা নিয়ে ভাবতে হবে। আপনার পড়শি, আপনার আত্মীয়স্বজন আপনাকে মেসেজ করছে, হাজার একটা ফেসবুক পেজে এই কথা লেখা হচ্ছে, তাতে বিভিন্ন পণ্ডিতের নাম দেওয়া হচ্ছে, যারা নাকি গবেষক, ঐতিহাসিক, তাঁরা নাকি বলছেন। হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ আসছে দেশ খতরে মে হ্যায়, পাকিস্তান সবচেয়ে বড় শত্রু, তাদের বিরুদ্ধে এর আগে দেশের কোনও নেতা, কোনও দল নাকি কোনও লড়াই করেনি, করেনি বলেই তারা চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালিয়েই যাচ্ছে। এইবার, এতদিনে এক দেশনায়ক এসেছেন, যিনি নাকি ঘর মে ঘুসকর মারার কথা বলছেন, সার্জিকাল স্ট্রাইকের কথা বলছেন, পাকিস্তানকে একঘরে করে দিয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। জঙ্গি জাতীয়তাবাদ, সমরবাদের কথা চলছে, কথায় কথায় সার্জিকাল স্ট্রাইক আর ঘর মে ঘুস কর মারেঙ্গে, কেন? কেন না দেশ খতরে মে হ্যায়। তাহলে দাঁড়াল কী? মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, অর্থনীতির চূড়ান্ত অধঃপতন, রোটি, কপড়া, মকান কোনও সমস্যাই নয়, সমস্যা হল হিন্দু খতরে মে হ্যায়, সমস্যা হল দেশ খতরে মে হ্যায়। ৭১২ খ্রিস্টাব্দে, আরব থেকে এসে মহম্মদ বিন কাশেম ভারতবর্ষের কিছু জায়গা দখল করেন, এরপর গজনি, ঘোরি, আইবক, খিলজি, তুঘলক, লোদি এবং মুঘলরা ভারতবর্ষের বেশ কিছু অংশ, অনেকটা দখল করেন, শাসন করেন, ইসলামিক শাসন চলে ১১০০ বছরের কিছু বেশি সময় ধরে, ১৮৫৭ পর্যন্ত। তারপর ১৮৫৭ থেকে ১৯৪৭, ৯০ বছর ধরে ইংরেজরা ভারতবর্ষ শাসন করে, বহু বিদ্রোহ হয়েছে, বহু লড়াই, একবারও শোনা যায়নি হিন্দু খতরে মে হ্যায়। ২০০০ সালের কাছাকাছি এসে আমরা হঠাৎই শুনছি হিন্দু খতরে মে হ্যায়, এই ১২০০ বছর ধরে পুজো হয়েছে, মন্ত্রপাঠ হয়েছে, রামচরিত মানস লেখা হয়েছে, বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ তাঁদের কথা বলেছেন, চৈতন্য, কবির, নানক তাদের কথা বলেছেন, আজ যখন এক হিন্দু রাষ্ট্রবাদী দল ক্ষমতায় এসেছে, তখন নাকি হিন্দু খতরে মে হ্যায়।

স্বাধীন ভারতবর্ষে, কাশ্মীরের দখল নিয়ে তিন তিন বার, ১৯৪৭, ১৯৬৫, ১৯৭১ ভারত-পাক লড়াই হয়েছে, পাকিস্তান হেরেছে। আজ শোনা যাচ্ছে দেশের রাষ্ট্রনায়করা কাপুরুষ ছিলেন, এই প্রথম নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদি, এক যুগপুরুষ জন্ম নিয়েছেন, যাঁর জন্ম আমার আপনার মতো বায়োলজিকালি হয়নি, তিনি অবতীর্ণ হয়েছেন, যিনি এই প্রথম ঘর মে ঘুস কর মারেঙ্গের মতো কথা বলেছেন, অসীম বীরত্বের কাহিনি। এবং এরকম নয় যে কয়েকজন আরএসএস-বিজেপির নেতা এসব বলছেন, কারণ তাহলে তারা প্রশ্নের মুখে পড়ত, তাদের প্রশ্ন করা হত, সত্যিটা বেরিয়ে আসত। এইসব অবান্তর আজগুবি, চূড়ান্ত মিথ্যে ছড়ানো হচ্ছে, তার পিছনে বিরাট পরিকল্পনা আছে, বিশাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার আছে, বিশাল পয়সার জোর আছে। সেই পরিকল্পনার কিছুটা ফাঁস হয়ে গেছে। এই যে রোজ ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপে লক্ষ লক্ষ পোস্ট, ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে কেমন করে আসে, তার কিছুটা জানা গেছে। জানা গেছে এই আরএসএস–বিজেপির মাথায় বসে থাকা কিছু মানুষ, এক সফটওয়্যার তৈরি করেছেন, টেক ফ্রগ, এর সাহায্যে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে এক লহমায় আপনার সামনে এসে হাজির হচ্ছে, এক লহমায় অজস্র মিথ্যে ইনফরমেশন, লক্ষ লক্ষ মিথ্যে তথ্য হাজির হচ্ছে, ঘোর বর্ষার বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছে সেই ইনফরমেশন, সেই মিথ্যে। আপনি ভিজতে বাধ্য, আপনার মনে হতে বাধ্য যে এতজন যে কথা বলছে, তার কিছুটা সত্য বটেই, আপনার মনে হতে বাধ্য যে এক বিরাট পণ্ডিত ঐতিহাসিকের নামে যে তথ্য আপনার সামনে এসে হাজির, সেই তথ্য ভুল হতে পারে না, তাহলে নেহরু নিশ্চয়ই মুসলমানই ছিলেন, তাহলে নেহরু নিশ্চয়ই আইএনএ-র সম্পদ চুরি করেছেন। তাহলে নিশ্চয়ই মুসলমানদের জনসংখ্যার হার এমন প্রবল গতিতে বাড়ছে যে, আর ক’দিন পরেই তারা ভারতবর্ষে সংখ্যাগুরু হয়ে পড়বে, অতএব হিন্দু খতরে মে হ্যায়, দেশ খতরে মে হ্যায়। টেক ফ্রগ তৈরি করছে লক্ষ লক্ষ নকল, ভুয়ো আইডেন্টিটি, ভুয়ো অস্তিত্বের সেসব ভূতের দল লক্ষ কোটি মিথ্যে বলছে, বলেই চলেছে। পিছিয়ে পড়ছে মানুষের রোটি কপড়া মকানের লড়াই, পিছিয়ে পড়ছে বেকারত্বের প্রশ্ন, পিছিয়ে পড়ছে মূল্যবৃদ্ধির প্রশ্ন, আপনি বিভ্রান্ত হচ্ছেন, আপনাকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে, তার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে।

এই কায়দা নতুন নয়, বহু আগে হিটলারের মন্ত্রশিষ্য গোয়েবলস এই কথাই বলেছিলেন, একটা চরম মিথ্যে বলতে হবে, ছোট্ট নয়, বিগ লাই, তারপর তা অনবরত বলে যেতে হবে, যতক্ষণ না সাধারণ মানুষ সে কথা বিশ্বাস করছে, সেই হিটলার গোয়েবলস-এর ফলোয়ার আরএসএস–বিজেপি সেই কাজটাই করছে আরও নিপুণভাবে, আরও পরিকল্পনা করে, লক্ষ কোটি টাকা খরচ করে, আধুনিক টেকনোলজিকে কাজে লাগিয়ে। এই মুহূর্তে আপনার কাজ হল সেই মিথ্যের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা, মানুষকে সেই মিথ্যের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করা, লড়াইটাকে রোটি কপড়া মকানে লড়াইতে নিয়ে যাওয়া, লড়াইটাকে মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্বের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো। নির্বাচন সেই সুযোগ দিয়েছে, তার সদ্ব্যবহার করুন।

RELATED ARTICLES

Most Popular