Placeholder canvas
Homeচতুর্থ স্তম্ভFourth Pillar | নরেন্দ্র মোদি নিজেই জানালেন বিজেপি ৩৭০-এর বেশি আসন পাবে,...
Fourth Pillar

Fourth Pillar | নরেন্দ্র মোদি নিজেই জানালেন বিজেপি ৩৭০-এর বেশি আসন পাবে, পাবে কি?

দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার ভাষণে তিনি আক্রমণ করলেন কংগ্রেসকে

Follow Us :

রাষ্ট্রপতির ভাষণের পরে আমাদের প্রধানমন্ত্রী লোকসভায় ভাষণ দিয়েছেন। নির্বাচনের আগে এটাই শেষ অধিবেশন, কাজেই আমরা সবাই জানতাম মোদিজি এই সুযোগ ছাড়বেন না। কিন্তু দেড় ঘণ্টা ধরে একটা পুরোদস্তুর নির্বাচনী বক্তৃতা দেবেন, সেটা ভাবা যায়নি। হ্যাঁ, জনসভাতে যেভাবে বক্তৃতা দেন, গলা নামিয়ে, গলা তুলে, জোকস বলে, প্রেক্ষিত ছাড়াই কিছু তথ্য তুলে ধরে, অসংখ্য মিথ্যাচার থাকে সেসব বক্তৃতায়, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কিছু বাক্য থাকে, ব্যঙ্গ থাকে। লোকসভার এই বক্তৃতাতে সব ছিল। এমনিতে উনি সংসদে আসেন না, এলেও নিজের ঘরে বসেই টিভিতে বক্তৃতা শোনেন, অন্যের বক্তৃতা শুনে তাঁর প্রতিক্রিয়া বোঝাও যায় না। কিন্তু মাঝেমধ্যেই তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে আসলে জনসভার বক্তৃতা করেন, টার্গেট যতটা না বিরোধী সদস্যরা, তাঁর লক্ষ্য তার চেয়ে হাজার গুণ ধেয়ে যায় সেই সব অগণিত সমর্থক, ভক্তদের দিকে। কারণ এই বক্তৃতার বিভিন্ন ছোট ছোট অংশ এবার আপনি হোয়াটসঅ্যাপে পাবেন, নেটে ঘুরবে, মহল্লা মহল্লাতে স্ট্রিট কর্নার মিটিংয়ে শুনতে পাবেন। শুনতে পাবেন যে দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহরুজি দেশের মানুষকে অলস, দুর্বল ভাবতেন। শুনতে পাবেন যে কংগ্রেস দল বার বার এক অচল পণ্যকে বারবার বাজারে আনতে গিয়ে ফেল করছে। বলাই বাহুল্য যে উনি রাহুল গান্ধীর নাম করেননি, কিন্তু পাড়ার মোড়ে তা স্পষ্ট করে দেওয়া হবে। আরও বহু চুটকুলা, হাসির কথা এবং তাঁর দেওয়া প্রেক্ষিত ছাড়া কিছু কথাই এবারের নির্বাচনে ঘুরবে মুখে মুখে। সেই অর্থে এই ভাষণ দিয়েই ২০২৪-এর বিউগল বাজালেন নরেন্দ্র মোদি। দেড় ঘণ্টার লম্বা ভাষণে বেকারত্ব নিয়ে একটাও কথা? মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে একটাও কথা? মণিপুর বা উত্তর পূর্বাঞ্চল নিয়ে একটাও কথা? মাত্র গতকালই সুপ্রিম কোর্ট বলেছে গণতন্ত্রকে খুন করা হয়েছে, তো গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ মন্দিরে দাঁড়িয়ে তা নিয়ে একটা শব্দ? না বলেননি। তাঁর ভাষণের ৯৯ শতাংশ খরচ করেছেন কংগ্রেসের সমালোচনা করে। নেহরু, ইন্দিরা, রাহুল, ডাইনিস্টিক পলিসি, কংগ্রেস অটকি, লটকি, ভটকি ইত্যাদি বলেছেন, সেসব নিয়ে আলোচনাতে আসব। কিন্তু এটা একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় যে এই বিশাল নির্বাচনী বক্তৃতায় তিনি একবারের জন্য দেশের কমিউনিস্ট পার্টির নাম উচ্চারণও করেননি, একবারও না। দু’ এক বার লালু যাদব, মুল্লায়ম সিং এবং একবার মমতা ব্যানার্জি নিয়ে কথা বলেছেন, কিন্তু সেসব খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, তিনি প্রায় পুরো ভাষণটাতেই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বলে গেলেন। কেন?

গত নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিল ৫২টা আসন, বিজেপি ৩০৩, এবং ওই ৫২টা আসনের খুব বেশি হলে ৮-১০টা আসন এসেছিল বিজেপিকে হারিয়ে। কংগ্রেস-বিজেপির লড়াইয়ে কংগ্রেসের স্ট্রাইক রেট ১০ শতাংশ, মানে ১০০টা আসনে লড়াই হলে ১০টা আসন কংগ্রেস জেতে, বাকি ৯০টা আসন জেতে বিজেপি। সেখানে আঞ্চলিক দলের স্ট্রাইক রেট ৫৩ শতাংশ, মানে সেখানে বিজেপিকে লড়তে হয়, সেখানেই বিজেপি হারে। যদি এবারে বিজেপিকে তার আসন সংখ্যা বাড়াতে হয় তাহলে তাকে হারাতে হবে এই সব আঞ্চলিক দলগুলোকে। আমরা সেটা জানি, নরেন্দ্র মোদিও জানেন, কিন্তু এই দীর্ঘ দেড় ঘণ্টার ভাষণে তিনি আক্রমণ করলেন কংগ্রেসকে। কেন? আসছি সে আলোচনাতেও। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল এতদিন যাবৎ নির্বাচনে জিতলে কত আসন জিতবে, সেটা বলতেন অমিত শাহ, বলতেন জগৎপ্রকাশ নাড্ডা। সেটা বলা হত নির্বাচনী ইস্তেহার ঘোষণার সময়ে বা নির্বাচন ঘোষণার পরে, কিন্তু এই প্রথমবার সংখ্যার কথা শোনা গেল নরেন্দ্র মোদির গলায়। সংসদের শেষ অধিবেশনে বিদায়ী সরকারের বহু প্রধানমন্ত্রী সংসদে বহুবারই বলেছেন আমরাই ফিরে আসছি, বলেছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী, যো অধুরা ছোড় কর যা রহে হ্যায়, ওহ হম হি আকর পুরা করেঙ্গে, কিন্তু সংখ্যা বলেননি। এই প্রথমবার একজন বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিলেন, তাঁর দল পাবে ৩৭০-এর বেশি আসন, তাঁদের দলের নেতৃত্বে জোট পাবে ৪০০-র বেশি আসন। কিন্তু এটাই কেবল খবর নয় যে নরেন্দ্র মোদি এই প্রথম নিজেই আসন সংখ্যা ঘোষণা করলেন, খবর এটাও যে তিনি এনডিএ-র শরিক দলের জন্য মাত্র ৩০টা আসনের কথা বললেন। মাথায় রাখুন ২০১৪তে এনডিএ-র শরিক দলগুলো পেয়েছিল ৫৪টা আসন, এমনকী ২০১৯-এও শরিক দলের আসন সংখ্যা ছিল ৫০-এর ওপরে। কিন্তু এবারে প্রধানমন্ত্রী নিজেই জানিয়ে দিলেন তাঁদের আসন বাড়ছে ৬৭-র বেশি, মানে ৩০৩ থেকে ৩৭০, কিন্তু শরিকদের আসন কমছে ২০টার মতো, ছিল ৫০, হবে ৩০। মানে খুব পরিষ্কার যে বিজেপি বেড়ে উঠছে at the cost of their alliance partners, at the cost of regional party. এবং এটা দলে সর্বোচ্চ নেতা সাফ জানিয়ে দিলেন।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | ২০২৪-এ বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে?

এই বলার মানে হল এবারে বিজেপি আগের চেয়ে বেশি আসনে লড়বে, শরিকদের কম আসন দেওয়া হবে। এখন বিজেপি বেশি আসনে লড়লে কোথা থেকে সেই বেশি আসন আসবে, তারা কি মহারাষ্ট্রে অজিত পাওয়ারের দলকে বা শিন্ডের শিবসেনা দলকে বা বিহারে নীতীশ কুমারের দলকে কম আসন দিয়ে নিজেরা বেশি আসন নেবে? কারণ এ ছাড়া তো বাকি জায়গায় বিজেপির কোনও শরিকই নেই। দলে সর্বোচ্চ নেতা যা বললেন তাতে বিহার মহারাষ্ট্রে সমস্যা কতখানি তৈরি করবে, সেটা সময়ই বলবে। খেয়াল করুন ১৯৯৯ সালে অটল বিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে প্রথম এনডিএ-র সরকার যখন তৈরি হয়, তখন বিজেপির আসন ছিল ১৮২, এনডিএ-র আসন ছিল ২৭০। তেলুগু দেশমের বাইরে থেকে সমর্থন নিয়ে সেই সংখ্যা হয়েছিল ২৯৯, মানে ১১৭টা আসন ছিল এনডিএ এবং সহযোগীদের। এবং আগের পরিসংখ্যান এবং এবারে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা সাফ বলে দিচ্ছে যে বিজেপি সেই ১৯৯৯ থেকেই সরকারে এসে তাদের শরিকদের সমর্থন নিয়েই তাদের শক্তি বাড়িয়েছে, এবং স্বাভাবিক কারণেই শরিকদের শক্তি কমেছে, আসনও কমেছে। প্রধানমন্ত্রী সেটা অফিসিয়ালি জানিয়ে দিলেন মাত্র। এবার ওনার এই দীর্ঘ ভাষণের সবচেয়ে বড় ধাঁধাটা নিয়ে আলোচনা করা যাক। দেশের সবাই জানে, বিজেপি নেতৃত্ব জানে, মোদিজিও জানেন যে এই বাজারে কংগ্রেস সবথেকে বড় শত্রু নয়, কংগ্রেস বিজেপির সামনে দাঁড়িয়ে নার্ভাস হয়ে যায়, তার যুক্তি খেই হারিয়ে ফেলে, হেরে যায় বার বার। তবুও এই বক্তৃতার সিংহভাগ জুড়ে কেবল কংগ্রেস কেন?

মোদিজি বললেন ডাইনাস্টিক রুলের কথা, বললেন বংশের দু’ চার দশ জন রাজনীতিতে আসতেই পারে কিন্তু একটাই বংশ যদি এক রাজনৈতিক দলকে চালায়, তাহলে সেটার অবস্থা এমনিই হয়। ধরুন রাহুল গান্ধী, জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া, মিলিন্দ দেওরা, শচীন পাইলট, জিতিন প্রাসাদ, এঁরা প্রত্যেকেই তো তাদের বাবার পরিচয় নিয়েই রাজনীতিতে এসেছেন, কিন্তু কেবল বংশমর্যাদা নিয়েই রাহুল এনাদের নেতা কেন হবেন? তিনি কোন আলাদা গুণের অধিকারী? এই প্রশ্ন তিনি রেখেছেন। কংগ্রেসের কাছে এর জবাব আছে কি? ইন্দিরার মৃত্যুর পরে স্বাভাবিকভাবেই তো প্রণববাবু বা সেরকম কারও দায়িত্ব নেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু সেই উচিত কথাটা কেবল উচ্চারণ করার ফলেও প্রণববাবুকে দল ছাড়তে হয়েছিল, পরে আবার যথাযোগ্য স্থানে মাথা ঠেকিয়েই ফিরতে হয়েছিল, এ তো সত্যিই। সেটাই মোদিজি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, মনে করিয়ে দিয়েছেন। হাসতে হাসতেই বলেছেন, কংগ্রেস সেম প্রডাক্টকে বারে বারে রি-লঞ্চ করার চেষ্টা করছে আর ফেল করছে। না, রাহুলের নাম করেননি, কিন্তু লক্ষ্য তো রাহুলই ছিল, একটা কথায় নয়, সারাক্ষণ। বললেন কংগ্রেস হল অটকি, মানে ওই এক পরিবারেই আটকে আছে, ভটকি, মানে দিশা হারিয়েছে, লটকি মানে ঝুলছে, সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। বললেন এই সিদ্ধান্তহীনতার কারণেই কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইন্ডিয়া অ্যালায়েন্স এখন ছিন্নভিন্ন, প্রত্যেকে একলা চলো রে বলে বেরিয়ে পড়েছে। খুব পরিষ্কার যে উনি তাঁর এই বক্তৃতায় কংগ্রেসকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নাজেহাল করতে চেয়েছেন, আগামী নির্বাচনে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যে ক্যাম্পেন হবে তার মোদ্দা সুরটা বেঁধে দিয়েছেন। কারণ উনি জানেন এ দেশের কমিউনিস্টরা আর কোনও ফ্যাক্টরই নয়, তারা আছেই তো এক রাজ্যে, সেখানে তাদের লড়াই তো কংগ্রেসেরই সঙ্গে। কাজেই সংসদীয় গণতন্ত্রের এই নির্বাচনের প্রেক্ষিতে তাদের নিয়ে ওনার কোনও চিন্তা নেই।

কিন্তু বেশ কিছু আঞ্চলিক দল আছে, আরও অসংখ্য আঞ্চলিক দল তৈরি হচ্ছে, হবেও। তারা নিজেরাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে উঠবে তার সম্ভাবনা নেই বললেই হয়, কারণ এই আঞ্চলিক দলের প্রত্যেকেই এক একজন হনু, প্রত্যেকেই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখে, প্রত্যেকের উচ্চাকাঙ্ক্ষা আছে। কিন্তু এরা যদি কংগ্রেসের মতো এক জাতীয় দলকে ঘিরে একজোট হতে পারে, তাহলে আমাদের দেশের ফেডারেল স্ট্রাকচার, যুক্তরাষ্ট্রীয় আশা আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে সব হিসেব গুলিয়ে যেতে পারে। অসংখ্য সামাজিক সংগঠন আছে যারা ওই রামমন্দির আর ফাইভ ট্রিলিয়ন ইকোনমি ইত্যাদির ভড়কিবাজিতে ভুলবে না। অসংখ্য ইন্ডিভিজুয়াল মানুষজন, বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, কবি শিল্পী আছেন যাঁরা এক গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকেই তাঁদের ভিত্তি, দেশের ভিত্তি বলে মনে করেন। এই বিরাট সংখ্যক সংগঠন, সামাজিক সংস্থা আর বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিকরা এমনিতে খুব কিছু করে উঠতে পারবেন বলে মনে হয় না কিন্তু কংগ্রেসের মতো একটা নিউক্লিয়াস পেলে বড় হয়ে উঠতে পারে। কংগ্রেসকে শেষ করে ফেলতে পারলে এদেরকে সামলানো অনেক সোজা হবে। তাই হিন্দু রাষ্ট্র লক্ষ্যের এক্কেবারে সামনে এসে কংগ্রেসকে শেষ করে দাও, টার্গেট কংগ্রেস মুক্ত ভারত, তারপর বাকিটা এমনিই হাতে এসে যাবে। এই কথা মাথায় রেখেই আপাতত বিজেপির স্ট্র্যাটেজি কংগ্রেসকে মাঠ থেকে বার করে দাও। হতেই পারে, কংগ্রেসের বহু ভুলের ফলে, এমনকী এখনও বহু বিষয়ে দোদুল্যমানতার ফলে কংগ্রেস সত্যিই মুছে যেতেই পারে। কিন্তু তখন আরেকটা সমস্যা চাড়া দিয়ে উঠবেই, যা নরেন্দ্র মোদিদের কল্পনারও বাইরে। এক কেন্দ্রীভূত শাসনের ফলে দেশের বিভিন্ন অংশে যুক্তরাষ্ট্রীয় আশা আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে, এক ভাষা, এক নেতা ইত্যাদির বিরুদ্ধে মতামত উঠে আসছে, সে মতামত সর্বদা খুব সঠিক তাও নয়। কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষাই বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিতে পারে, আজ কংগ্রেস শেষ হলে এখনই বিজেপির লাভ। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবেই কংগ্রেসের অস্তিত্ব আমাদের দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, যুক্তরাষ্ট্রীয় চাহিদা, বৈচিত্র্যময় ভারতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সেই কংগ্রেসের আরও দুর্বল হয়ে পড়া আগামী দিনে আরেক নতুন বিপদ ডেকে আনতেই পারে, ভবিষ্যতের সে সমস্যার কথা আমাদেরই ভাবতে হবে। এই সর্বগ্রাসী রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেই হবে।

RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments