Placeholder canvas

Placeholder canvas
Homeচতুর্থ স্তম্ভFourth Pillar | এবার কেবল ইডি, সিবিআই, পুলিশ নয়, বিজেপি তৈরি করছে...
Fourth Pillar

Fourth Pillar | এবার কেবল ইডি, সিবিআই, পুলিশ নয়, বিজেপি তৈরি করছে নিজস্ব সৈন্যবাহিনী

ইংরেজরা চায় হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব আরও আরও বাড়ুক, হিন্দু মহাসভা সেই দ্বন্দ্ব বাড়াবে

Follow Us :

১৯৬১ সালে প্রতিরক্ষা দফতরের অধীনেই তৈরি হয়েছিল বেশ কিছু সৈনিক স্কুল, যেখান থেকে পড়ে অনেক ছাত্র প্রতিরক্ষার বিভিন্ন স্তরে যোগ দেবেন। সারা দেশেই এমন অনেক সৈনিক স্কুল আছে। এবার সেই সব স্কুলগুলো পরিচালনার ভার দেওয়া হচ্ছে বেসরকারি মালিকানার হাতে, দায়িত্ব পাচ্ছেন আরএসএস–বিজেপি ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বা লোকজন, উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন, হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন। স্বাধ্বী ঋতাম্ভরা, যিনি গডসেকে দেশপ্রেমিক বলেই মনে করেন, তিনি পেয়েছেন দুটো সৈনিক স্কুলের ভার। এবার গডসের নিশানা যাতে আরও নির্ভুল হয় তার ব্যবস্থা পাকা। রাজস্থানের মহন্ত বালকনাথ যোগীর হাতে দেওয়া হয়েছে একটা সৈনিক স্কুল পরিচালনার ভার। আসলে দেশের গোটা প্রতিরক্ষা দফতরের মাথায় বসছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ। বহু আগেই অগ্নিবীর প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। সেদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তেজস্বী যাদব এবং কর্নাটকের জেডিএস নেতা এইচ ডি কুমারস্বামী, এই তিনজনেই অগ্নিপথ নিয়ে তাঁদের প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সময়ে বলেছিলেন, এটা আরএসএস-এর একটা চক্রান্ত, এর পিছনে অন্য উদ্দেশ্য আছে। অনেকে হেসেছেন, অনেকেই বলেছেন অগ্নিবীরের সঙ্গে আরএসএস-এর সম্পর্কটা কোথায়? এখন ক্রমশ তা পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। আসুন এই আলোচনাটাকে আর একটু বাড়ানো যাক, আরও কিছু তথ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা যাক, কারণ ওনারা যা বলেছেন, তা ১০০-র উপরে ২০০ শতাংশ সত্যি।

খুব সোজা করে বললে, আরএসএস-বিজেপি এক ফ্যাসিস্ট শক্তি, তাদের লক্ষ্য হিন্দুরাষ্ট্র, আর সেই লক্ষ্যতে পৌঁছতে হলে, তাঁরাও জানেন, দরকার এক সুসজ্জিত বাহিনী। কেবল কিছু উদভ্রান্ত যুবক, হাতে ডান্ডা, বোলো জয় শ্রী রাম বোলো, বোলো। না বললেই থাপ্পড়, চড়, কিল ঘুষি, গণধোলাইয়ে কিছু মৃত্যু, বা গৌরি লঙ্কেশ, দাভোলকর, পানসারে, কালবুর্গির মতো কয়েকটা গুপ্তহত্যাই নয়। হাতে ভাগওয়া ঝান্ডা নিয়ে, হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য চাই এক সুসজ্জিত বাহিনী, উদাহরণ হিটলারের গেস্টাপো বাহিনী। রাতে ২০-২৫-৩০ জনের বাহিনী এসে নিঃশব্দে তুলে নিয়ে যাবে বিধর্মীদের, প্রতিবাদীদের, এলাকার প্রত্যেকে জানলার ফাঁক দিয়ে দেখবে, বিধর্মী, বিধর্মীদের আশ্রয়দাতা বা প্রতিবাদীদের হাল। দেখবে ওই গেস্টাপোদের, যারা হিংস্র, রুথলেস, মায়াদয়াহীন। হ্যাঁ তেমন বাহিনী চাই, এমনটা আজ নয়, স্বাধীনতার বহু আগে থেকেই ভেবেছিল হিন্দু মহাসভা, আরএসএস। নেতাজির বাহিনীর সঙ্গে তুলনা করবেন না, আইএনএ লড়ছিল দেশের স্বাধীনতার জন্য, ইংরেজদের বিরুদ্ধে। হিন্দু মহাসভা, আরএসএস-এর বাহিনী তৈরিই হচ্ছিল ইংরেজদের বদান্যতায়।

ডঃ বালকৃষ্ণ শিবরাম মুঞ্জে ১৯৩০-এর শেষের দিকে, নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে গিয়েছিলেন ইটালি, তখন সেখানে মুসোলিনির রাজত্ব। উনি ঘুরে দেখেছিলেন ইটালির কয়েকটা মিলিটারি স্কুল, দেখার পর যাকে বলে ইমপ্রেসড হয়েছিলেন। আচ্ছা কে এই ডঃ বালকৃষ্ণ শিবরাম মুঞ্জে? ইনি সাভারকরের শিষ্য আর আরএসএস প্রতিষ্ঠাতা কেশভ বলিরাম হেডগাওয়ারের মেন্টর, গুরু। ১৯২৭ থেকে ১৯৩৭ পর্যন্ত ইনিই ছিলেন হিন্দু মহসভার রাষ্ট্রীয় সভাপতি, ১৯৩৭-এ সেই আসনে বসেন বিনায়ক দামোদর সাভারকর। এর আগে বলেছিলাম ৮ আগস্ট, ১৯৪৭ একই প্লেনে চেপে দিল্লি গিয়েছিলেন সাভারকর, দুই গান্ধী হত্যাকারী নাথুরাম গডসে আর নারায়ণ আপ্তে। তাঁরা গিয়েছিলেন দিল্লিতে হিন্দু মহাসভার বিশেষ বৈঠকে, যে বৈঠকে হাজির ছিলেন এই ডঃ বি এস মুঞ্জে। যে বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ১৫ অগাস্ট স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করা হবে না, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ত্রিবর্ণ জাতীয় পতাকা তোলার কোনও প্রশ্নই নেই। চিহ্নিত করা হয়েছিল এক ৭২ বছরের বৃদ্ধকে, বলা হয়েছিল অ্যান্টি-ন্যাশনাল, দেশ-বিরোধী, দেশের শত্রু। গান্ধীজির অহিংসা, অহিংস আন্দোলনের বদলে হিন্দুরাষ্ট গঠনের জন্য হিন্দুবাহিনী চাই। এই স্লোগান, এই স্বপ্ন দেখেছিল সাভারকর, সেই স্বপ্নকে সাকার করার দায় নিয়েছিল এই ডঃ বি এস মুঞ্জে। কারা সাহায্য করল? বা একটু উল্টোদিক থেকে দেখা যাক, কাদের কাছে তিনি সাহায্য চাইলেন? ব্রিটিশ আর্মি জেনারেলদের কাছে, ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে, দেশের তথাকথিত স্বাধীন রাজা, রাজপুত্রদের কাছে। কেন দেবেন এরা সাহায্য?

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | ভয় পেয়েছেন কঙ্কনা, ভয় দেখাচ্ছেন মোদিজি

ইংরেজরা চায় হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্ব আরও আরও বাড়ুক, হিন্দু মহাসভা সেই দ্বন্দ্ব বাড়াবে, হিন্দু বাহিনী হলে আরও ভালো কেবল দ্বন্দ্ব নয় খুনোখুনি হবে। অন্যদিকে প্রিন্সলি স্টেট তখন গান্ধী-বিরোধী, গান্ধীজি অবিলম্বে রাজা মহারাজাদেরকে, তাদের ক্ষমতা দেশের আমজনতার হাতে তুলে দিতে বলেছেন, অনুরোধ করেছেন ওই প্রিন্সলি স্টেটের প্রিন্সদের, আপনারা দেশের মানুষের অছি, ট্রাস্টি হিসেবে কাজ করুন, প্রায় আঙুল তুলে বলেছেন, ওই প্রিন্সলি স্টেটের আমলারা সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিরোধী, স্বাধীনতার মূল ধারণার বিরোধী। ইটালি থেকে ঘুরে এসেই ডঃ বি এস মুঞ্জে, ইংরেজদের কাছে, প্রিন্সলি স্টেটের কাছে আবেদন করলেন, চাইলেন এক হিন্দু সেনাবাহিনী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য সাহায্য, কোথায় হবে? নাগপুরের নাসিকে। হ্যাঁ, শিবসেনা, আরএসএস-এর কেন্দ্র, যে নাসিকের থেকে ১৫-১৬ কিলোমিটার দূরে সাভারকরের বাসস্থান, সাভারকর আড্ডা, যে বাড়িতে গান্ধীহত্যার আগে বেশ কয়েকবার গেছে নাথুরাম গডসে, নারায়ণ আপ্তেরা, হত্যার কিছুদিন আগেও গেছে। হ্যাঁ সেই নাসিকে হিন্দু সেনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হবে। ডঃ মুঞ্জে বলেছিলেন, ইটালিতে মানুষজন বলে মুসোলিনি কিছুই ভোলে না, সব মনে রাখে, আমরাও যেন আমাদের প্রকৃত শত্রুদের না ভুলি। হিন্দু খতরে মে হ্যায়। কে টাকা দিল? ব্রিটিশ ফিল্ড মার্শাল ফিলিপ ওয়ালহাউস চেটউড, ১৭ নভেম্বর ১৯৩৫-এ ডঃ মুঞ্জেকে লিখছেন, It gives me great pleasure to support your efforts in endeavouring to start a Public School near Nagpur, in the Central Provinces. I am quite certain that, from an Army point of view, we shall never get that constant supply of young men which is essential for the Army unless more and more Public Schools are started in India; and I can only hope that the one in which you are personally interested will set an example that will be followed all over the country. I have pleasure in enclosing a donation for Rs 100.

সেই পাবলিক স্কুল, যেখানে মিলিটারি ট্রেনিং দেওয়া হবে, তাকে কেবল সমর্থন জানানোই নয়, ব্রিটিশ ফিল্ড মার্শাল ১৯৩৫-এ ১০০ টাকাও দিচ্ছেন। এই ঘটনার ৬ বছরের মাথায়, আর একজন দেশ থেকে ইংরেজদের কঠোর পাহারা এড়িয়ে চলে যাচ্ছেন, ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে, এক সেনাবাহিনী তৈরি করতে, ১৯৪১-এ নেতাজির মহানিষ্ক্রমণ। এদিকে কেবল ফিল্ড মার্শাল? এরপর ২৫০ টাকা এল ভাইসরয় লিনথিনগোর কাছ থেকে, উজাড় করে টাকা দিলেন প্রিন্সলি স্টেটের রাজা, আমলারা। ১৯৩৭-এ জুন ১২, ১৯৩৭-এ ৯০ জন ছাত্র নিয়ে সেই হিন্দু সেনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র উদ্বোধন করতে এলেন গোয়ালিয়রের রাজা, বম্বে প্রভিন্স-এর গভর্নর স্যর রজার লামলে। কলেজ প্রাঙ্গণের নাম হল রামভূমি, ছাত্ররা সবাই রামডান্ডি, মানে রামের ডান্ডা হাতে, হ্যাঁ সেই ১৯৩৫-এ। সেই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এখনও চলছে, যুক্ত আছেন রিটায়ার্ড সেনা অফিসাররা, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মোটো, ঘোষিত উদ্দেশ্য কী? ওম আগ্রতঃ চতুরো ভেদঃ পৃষ্ঠাৎ সশ্রম ধনু, ইদম ব্রাহ্মিণ ইদাম ক্ষত্রম, শাপাদপি, শরাদপি। যে চতুর্বেদ অধ্যয়ন করেছে, যার পিঠে ধনুর্বাণ আছে, সেই ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয় হয় শাপ দিয়ে না হলে শর দিয়ে শত্রুকে বধ করবে। এক্কেবারে পরিষ্কার তাই না? সেই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এখনও চলছে, কেবল চলছে না, এখন তা আরএসএস-এর হাতে। ডঃ মুঞ্জের হাতে এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চলছিল, উনি এক লটারিও চালু করেছিলেন, যেখান থেকে এই কেন্দ্রে জন্য টাকা আসত। কিন্তু গান্ধী হত্যার পরে সাভারকর সমেত হিন্দু মহাসভার বহু নেতাকে গ্রেফতার করা হয়, ডঃ মুঞ্জের এই কেন্দ্রেও পুলিশ আসে, এবং কিছুদিনের মধ্যেই মার্চ মাসে তিনি মারা যান।

এর কিছু বছর পরে আরএসএস এই কেন্দ্র চালানোর দায় নেয়, তখন থেকে তারাই এর দায়িত্বে আছে। এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজনকে মালেগাঁও বোমা বিস্ফোরণ মামলায় গ্রেফতার করা হয়, এখানে বসেই ওই বিস্ফোরণের পরিকল্পনা হয়েছিল, এমন কথা কয়েকজন অভিযুক্ত জানান। বিজেপি সরকার আসার পরে মালেগাঁও বোমা বিস্ফোরণের মামলা ঠান্ডা ঘরে ঢুকে গেছে, অভিযুক্তরা সবাই মুক্ত বা জামিনে। এই একটাই নয়, আরএসএস দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আরও কয়েকটা সেনা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালায়, প্রকাশ্যেই সে সব চলে। ইউপি-র শিখরপুর জেলায় রাজ্জু ভাইয়া সৈনিক বিদ্যামন্দির ক’ বছর আগেই ১৬০ জন ছাত্র নিয়ে শুরু হয়েছে। হ্যাঁ, এগুলোই আগামী দিনের হিন্দু বাহিনীর উৎস, হিন্দুরাষ্ট্রের বাহিনী তৈরি হচ্ছে, প্রকাশ্যে হচ্ছে। দেশের কমিউনিস্ট পার্টি, যারা সশস্ত্র বিপ্লবের কথা বলে, হলফ করে বলতে পারি তাদের সাধারণ সম্পাদক পিস্তলের সেফটি ক্যাচ খোলার সরল নিয়মটিও জানেন না। ওদিকে বিভিন্ন জায়গায় আরএসএস-এর সরাসরি কোথাও সমভাবাপন্ন সংগঠনের সাহায্যে গড়ে উঠছে এরকম সৈনিক স্কুল, প্রশিক্ষণ দিতে আসছেন রিটায়ার্ড সেনা অফিসারেরা, এবার দেশের সৈনিক স্কুলও চলে যাচ্ছে এই হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কাছে। হ্যাঁ, এইখানেই বোঝানো হচ্ছে, বোঝানো হবে হিন্দুত্ব, হিন্দুরাষ্ট্র, হিন্দু খতরে মে হ্যায়, এখান থেকেই তারা যাবে অগ্নিপথে, হয় সেনায় থেকে যাবে, না হলে বেরিয়ে আবার ফিরে আসবে এখানেই। তাদের লক্ষ্য কেবল বেতন পেনশন নয়, তাদের লক্ষ্য হিন্দুরাষ্ট্র, তাদের মন্ত্র শাপাদপি, শরাদপি, হয় শাপ দিয়ে না হলে শর দিয়ে শত্রু মারব, কোন শত্রু? কেন? যারা লুঙ্গি পরে, যাদের দেখেই চেনা যায়, অন্তত নরেন্দ্র ভাই দামোদরদাস মোদি তো চিনতেই পারেন। প্রয়োজনে তিনিই চিনিয়ে দেবেন।

RELATED ARTICLES

Most Popular